ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে বলছি, কী তীব্র আপনার গতিবেগ! কী অত্যাশ্চর্য ক্ষমতার অধিকারী। রাজা, আরও তীব্র গতিতে পা চালান, দৌড়ে চলুন! বলিহারি! বাহাদুর বটে এপিকোনিস! বাহবা! কী সুন্দর বাঘুট!
গৌরবান্বিত এন্টিকোয়াস! তিনি দ্রুতদৌড়ে পথ পাড়ি দিয়ে বলেছেন। ক্রমাগত দৌড়াচ্ছেন, লাফাচ্ছেন আর পথ পাড়ি দিচ্ছেন। ঠিক যেন পাখা মেলে উড়ে চলেছেন।
তীরবেগে হিপোড্রোমের দিকে এগিয়ে চলেছেন।
তিনি সজোরে লম্বা একটা লাফ দিলেন। আর্তস্বরে চিৎকার করে উঠলেন। ব্যস, এবার নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে গেলেন।
ওহে প্রাচ্যদেশের গৌরব জব্বর বাঁচা বেঁচে গেছেন। আমি হলফ করে বলতে পারি, নাট্যশালায় পৌঁছাতে আপনি যদি আর আধ সেকেন্ড দেরি করতেন, তবে এপিডাফন নগরে সামান্য একটা ভালুক ছানারও হদিস মিলত না যে, আপনার শবদেহ খুবলে খুবলে খায়নি।
যাক, অনেক হয়েছে, এবার ফিরে যাওয়ার চিন্তা করা দরকার। এখান থেকেই আমরা ফিরে যাই, কেমন?
আর আমাদের নিয়ে যাওয়ার কারণও যথেষ্টই রয়েছে। কারণ, রাজার অন্তর্ধানকে কেন্দ্র করে একটু পরেই যে ভয়ঙ্কর জয়োল্লাস আরম্ভ হয়ে যাবে আমাদের আধুনিক অসভ্য কান দুটো তা মোটেই বরদাস্ত করতে পারবে না। তা শুনে আমরা চমকে উঠব, আতঙ্কিত হয়ে পড়ব।
আরে ওই তো! এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। ওই যে, শুনুন হৈ হল্লা আরম্ভ হয়ে গেছে! নগর জুড়ে কেমন হাঙ্গামা হজ্জতি আরম্ভ হয়ে গেছে, রীতিমত তুলকালাম কাণ্ড বেঁধে গেছে।
হ্যাঁ অবশ্যই–এটাই প্রাচ্যের সর্বাধিক জনবহুল নগর।
নানা স্তরের, নানা বর্ণের, নানা মর্যাদাসম্পন্ন আর নানা বয়সের মানুষের কী অদ্ভুত সমারোহ ঘটেছে। হরেক রং আর হরেক ঢঙের পোশাকে বিচিত্র সমাবেশ ঘটেছে আর নানা ভাষার এমন এক অত্যাশ্চর্য সমাবেশ সচরাচর নজরে পড়ে না। আর জন্তু জানোয়ারদের চমৎকারিত্বের তো তুলনাই মেলে না! আর কত আকৃতি ও প্রকৃতির বাদ্যযন্ত্রই যে দেখা যাচ্ছে, তা বলে শেষ করা যাবে না। আর দার্শনিক? গণনা করে তাদের সংখ্যা নিরুপণ করা যাবে না। সব মিলে এক অত্যান্ড্রুত পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে।
আরে করছেন কি! এখনও দাঁড়িয়ে ভাবছেন, কি করবেন? আসুন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে সড়ে পড়া যাক। আর এক মুহূর্তও দেরি করলে ফাঁদে আটকে পড়ে যেতে হবে। আসুন, তাড়াতাড়ি এ-নগরের সীমানার বাইরে, নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাই।
‘সে না হয় যাব। কিন্তু একটু অপেক্ষা করুন।
‘অপেক্ষা? কিন্তু কেন, কারণ কী?
‘ওই যে, ওটার কথা জানা দরকার। ওটা কি, মানে হিপোডড্রামে দারুণ হৈ হল্লা বেঁধে গেছে মনে হচ্ছে না? ব্যাপার কী, বলুন তো?
হৈ হল্লা? আরে ধৎ! ওটা কিছু না। ব্যাপারটা খুবই মামুলি। এপিডাফেনের স্বাধীন ও মহান অধিবাসীরা তাদের অধিপতির মহত্ব, জ্ঞান-বুদ্ধি, সত্তা আর দেবত্ব সম্পর্কে পুরোপুরি নিঃসন্দেহ ও প্রীত হয়ে আর তার বর্তমান অতিমানবিক পদচারণা চাক্ষুষ করে তার পুরোপুরি নিঃসন্দেহ হয়েছে যে, দৌড়ের পাল্লায় তিনি যে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন, তা চোখের সামনে দেখে এত মুগ্ধ হয়েছে যে, তারা ভাবছে তার কপালে জয়-তিলক পরিয়ে দেওয়া কর্তব্য, তা ছাড়া আগামী অলিম্পিয়াডে তিনি যখন জয়-তিলকের অধিকারী হবেনই, তবে তো তারা এখনই পরিয়ে দিতে পারে, আপত্তির কি থাকতে পারে।
ফোর বীস্টস ইন ওয়ান
ঈশ্বর যীশু পৃথিবীতে আবির্ভূত হওয়ার ১৭১ বছর আগেকার কথা। তখন সিরিয়ার অন্তর্গত এপিফানেস নামধারী এক নরাধম রাজাকে নিয়ে ইতিহাসবিদরা অনেক বড় বড় কথা লিখে পাতা ভরেছেন। রাজার কম কথা! রাজার সম্বন্ধে কিছু লিখতে বসলেই কলমের ডগা দিয়ে সবার আগে তার সম্বন্ধে কিছু প্রশস্তি তো গাইতেই হয়। রাজার স্তবস্তুতি না করলে ঐতিহাসিককে আর চাকরি করে খেতে হবে না।
কিন্তু ইতিহাস তো আর একজায়গায় থমকে থাকে না। বরং চক্রাকারে আবর্তিত হয়। ব্যাপারটা সত্যি অত্যাশ্চর্য। রীতিমত অবাক হবার মতোই বটে! কারো সম্বন্ধে সত্য গোপন করে যতভাবেই প্রশস্তি গাওয়া হোক না কেন, প্রকৃত ঘটনা চেপে রেখে যতই মিথ্যার ফুলঝুড়ি ছাড়া হোক, হাজার হাজার বছর পরে দেখা যায়, কবর খুঁড়ে প্রকৃত ঘটনাটাকে টেনে হিঁচড়ে বের করে আনা হচ্ছে, ব্যাপারটা যেন নতুন করে ঘটে চলেছে।
সত্যি, ব্যাপারটা অত্যাশ্চর্যই বটে। সত্য চিরদিন গোপন থাকে না। আজ না হোক কাল তা প্রকাশ পাবেই পাবে।
যদি তাই সত্যি হয়ে থাকে পাঠক-পাঠিকা তবে চলুন হাজার দুই বছরের পুরনো ইতিহাসের পাতা ঘাঁটাঘাঁটি করা যাক। খোঁজখবর নিয়ে দেখাই যাক না, কেন নরাধম এপিফানেস আর কতরকম পশুসুলভ কাজে লিপ্ত হতে পেরেছে। ভুলে যাবেন না, এ কল্পকাহিনীটা কিন্তু ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে বসে লিখছি। আমরা বিপরতি ইতিহাসের ভাবী চেহারাটা দেখতে চাচ্ছি। তা যদি না হয় তবে তো সত্যিটা জানা সম্ভব হবে না।
বিশ্রি শহরটার নাম অ্যান্টিয়েক। একই নাম কাহিনীতেও উল্লেখ করা হচ্ছে।
মিনিট কয়েকের অদ্ভুত চরিত্রের শহরটার অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা দেখার জন্য মনটাকে শক্ত করে বেঁধে নিজেকে তৈরি করে নিন।
ওই যে, চোখের সামনেই যে নদীটাকে দেখতে পাচ্ছেন, সেটার নাম আরস্টেম। অগণিত ঝর্ণা এসে নদীটাকে অধিকতর পুষ্ট করে তুলেছে। আর সেটার জলপ্রপাতের সংখ্যাও কিন্তু নেহাত কম নয়। সব মিলিয়ে নদীটার রূপ-সৌন্দর্য মনোলোভা হয়ে উঠেছে।
