জানোয়ারটা কর্কশ অথচ নিচু গলায় বলল–‘খবরদার! কেউ যেন শুনতে না পায়, ঘুণাক্ষরেও কিছু জানতে না পারে।’
আপনি লক্ষ্য করছেন না, জানোয়ারটার মানুষেরই আকৃতি বিশিষ্ট? আরে ভাই,, চিতাবাঘ আর উটের মিলনে উদ্ভুত বাঘুটটা তো আর সাধারণ কোনো ব্যক্তি নন, তিনিই তো স্বয়ং এন্টিকোয়ার্স এপিফেনিস, সিরিয়ার অধিপতি বিখ্যাত এন্টিকোয়াশ। প্রাচ্যের সবচেয়ে বড় স্বেচ্ছাকারী রাজা! আর এও সত্য, তাঁকে কখনও বা এন্টিকোয়াস এপিসেনেস পাগলা-পাগলা এন্টিয়োকাস এপিমেনেস।
‘কেন? পাগলা বলার পিছনে এমনকি যুক্তি রয়েছে?
‘যুক্তি? যুক্তি তো অবশ্যই রয়েছে। এর সবচেয়ে বড় যুক্তি হচ্ছে, তাঁর ভালো ভালো গুণগুলো অনুকরণ করার মতো ক্ষমতা সবার মধ্যে থাকে না। আর এও সত্য যে, এখন তিনি পশুর চামড়ায় নিজেকে আচ্ছাদিত করে, আত্মগোপন করে যথাসাধ্য সে বাঘুটটার ভূমিকায়নিখুঁত অভিনয় করতে ব্রতী হয়েছেন।
‘কারণ? এমন একটা প্রয়াস চালাব কারণ কী?’
‘কারণ একটাই, নরপতি হিসেবেনিজ মর্যাদাকে অধিকতর সুপ্রতিষ্ঠিত করা। আর একটা কথা রাজার বস্তুটা যেমন পেল্লাই, পোশাক পরিচ্ছদও তো তেমনই হতে হবে, ঠিক কিনা? তবে আমরা এমনই মনে করে নিতে পারি, তেমন জরুরি দরকার ছাড়া তিনি কিছুতেই এরূপ পরিগ্রহ করতেন না। মানে আনুষ্ঠানিক প্রয়োজনের কথা বলতে চাচ্ছি।
‘আনুষ্ঠানিক প্রয়োজন? অনুষ্ঠানটা কী?
‘এক হাজার ইহুদির গর্দান নেওয়া। কী অদ্ভুত মর্যাদার সঙ্গেই রাজা চার পায়ে হাঁটাচলা করছেন। আশা করি, নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছেন, রাজার দুই প্রধান উপপত্নী আর্গেলেস এবং এলিন তার ইয়া লম্বা লেজটাকে কী সুন্দরভাবে উঁচু করে ধরে রেখেছেন। আহা! কী চমৎকার ভঙ্গি! আসুন না, আমরা তাকে হিপোড্রোম পর্যন্ত অনুসরণ করতে করতে যাই।’
‘আর?’
‘আর সে বিজয়-সংগীতটা এ-মুহূর্তেই শুরু করবেন, সেটা উৎকর্ণ হয়ে মনোযোগ সহকারে শুনি। শোনাই যাক না, তাঁর গানের বক্তব্য কি?
এপিফানেস ছাড়া রাজার মতো রাজা আর কে-ই বা আছে? তোমরা কেউ কী জানো, বল? সবাস রাজা! না, এফিফানেস ছাড়া আর কেউ নেই, কেউ রাজা নেই। তবে এক কাজ কর, মন্দিরটাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দাও। আর দাও সূর্যটাকেনিভিয়ে।
উফ! কী চমৎকার! কী চমৎকার সুরেলা গান!
জনসাধারণ চেঁচিয়ে বলছে রাজা, কবির রাজা, প্রাচ্য দেশের গৌরব, বাঘুট-এর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি, কম কথা!
শুনতে পাচ্ছেন? শুনতে পাচ্ছেন কী? সবাই সমবেত কণ্ঠে চেঁচিয়ে তাকে আবার গান গাওয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছে। অনুরোধ উপেক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব হলো না। আবার তিনি গান শুরু করেছেন।
হিপোড্রামে উপস্থিত হওয়ামাত্রই আগামী অলিম্পিকে তার বাঞ্ছিত বিজয়ের জন্য কবির জয়মাল্য দানের মাধ্যমে তাঁকে সম্মানীত করা হবে। আনন্দ-উল্লাসের মধ্যে দিয়ে জয়মাল্য তার গলায় পড়িয়ে দেওয়া হবে।
‘ভালো কথা, কিন্তু জুপিটারের দিব্যি! আমাদের পিছনে ওই ভিড়ের মধ্যে কি সব হচ্ছে, বুঝছি না তো?
‘উফ! বুঝেছি, বুঝেছি। পিছনের কথা জানতে চাইছেন তো? হ্যাঁ, একেবারে মোক্ষম সময়েই আপনি কথাটা পেয়েছেন।
‘তা নাহয় হল, কিন্তু ব্যাপারটা কি, তা-তো বলবেন?
‘এক কাজ করা যাক, আগে একটা নিরাপদ স্থানে গিয়ে আত্মগোপন করা যাক।
ঠিক আছে, এখানেই থাকা যাক। এ ফোয়ারার খিলানটির নিচে গা-ঢাকা দিয়ে থাকা যাক। এবার আগে বলছি, ওখানকার গোলমালের সুত্রপাতের কাহিনী
সত্যি কথা বলতে কি, আমি যেমনটা চেয়েছিলাম, ঘটেছেও ঠিক একই ঘটনা।
গর্দানে মানুষের মাথা বসালে এ-বাঘুঁটের আর্বিভাবের ফলে নগরের যাবতীয় গৃহপালিত জন্তু-জানোয়ারদের আত্মসম্মানে ঘা লেগেছে। তারা মর্মাহত হয়েছে। মনে বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটেছে। শেষপর্যন্ত মরিয়া হয়ে তারা বিদ্রোহে মেতেছে। আর। এরকম পরিস্থিতিতে সাধারণত যা ঘটে থাকে, এ-ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। বিদ্রোহ দমন করতে মানুষের সব রকম প্রয়াস দারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে কিছু মনুষ্য-সন্তান নির্মমভাবে তাদের পেটে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
চার পেয়ে দেশহিতৈষীরা কিন্তু সমস্বরে বলেছে, সদ্য উদ্ভূত হতচ্ছাড়া বাঘুঁটেটাকে চিবিয়ে খেয়ে না ফেলতে পারলে আর শান্তি নেই। স্বস্তি নেই।
তাই উপায়ান্তর না দেখে কবিদের রাজা মশাই এখন চাচা আপন প্রাণ বাঁচা সিদ্ধান্ত নিয়ে পড়ি কি মরি করে পালিয়ে যাচ্ছেন। আর সংসদরাও পরিস্থিতি খারাপ দেখে প্রাণভয়ে কেটে পড়েছে।
এক্ষেত্রে উপপত্নীরা কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন এক নজির স্থাপন করেছে। পৃথিবীর আনন্দদাতা নিজেই আজ বিপন্ন কবিদের ম্রাট প্রাচ্যের গৌরব তো এবার আপনাকে ছেড়ে কথা বলবে না, হাড়মাস চিবিয়ে খাবে। অতএব বিষণ্ণ মুখে, সকরুণ দৃষ্টিতে লেজের দিকে ভুলেও যেন তাকাবেন না। ওই লম্বাটে বস্তুটা মাটিতে লুটোপুটি খেলেও অসহায়ভাবে সহ্য করা ছাড়া গতি কিছু নেই। সাহস অবলম্বন করুন, মনকে শক্ত করে বাঁধুন, পা দুটোকেও শক্ত করুন, দৌড়ে হেপোড্রামে চলে যান। ভাবুন, এন্টিয়োকাস এপিসেনিস আপনি নিজেই। আপনিই সর্বজন পরিচিত এন্টিয়োকাস! আপনিই কবিকুল সম্রাট, আর প্রাচ্যদেশের গৌরব–পৃথিবীবাসীর আনন্দদাতাও বটে। আপনিই সর্বজনমান্য সর্বশ্রেষ্ঠ বাঘুট!
