হ্যাঁ, যা ভেবেছি, ঠিক তা-ই। ওই ওই তো ঘোষক গলা ছেড়ে চিৎকার করছে। প্রাচ্য দেশে চমৎকার শ্রুতিমধুর ভাষায় সে গলা ছেড়ে রাজা মশাইয়ের আগমনবার্তা ঘোষণা করে চলেছে।
ঘোষকের কথামত আমরা এ-আশায় বুক বেঁধেইনিদারুণ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম। কারণ শুনেছি, তার মিছিল আশিসহ মন্দিরের লাগোয়া পথ ধরে এগিয়ে যাবে। সে মুহূর্ত এক পলকে তাঁকে দেখতে পাব, এটাই আমাদের এ মুহূর্তের প্রত্যাশা।
এবার চলুন ভজনালয়ের বারান্দায় গিয়ে আশ্রয় নেওয়া যাক। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজা-মশাই সেখানে উপস্থিত হবেন।
রাজা মশাই ভজনালয়ে পৌঁছাবার আগে আমরা বরং গর্ভগৃহে রক্ষিত মূর্তিটাকে দেখেনিই।
চমৎকার মূর্তি। কিন্তু কীসের মূর্তি এটা, বুঝতে পারছি না তো? আরে এটাই অশিমহাদেবের প্রকৃত রূপ। অথচ আপনাদের চোখে ধরা পড়ছে তা না ছাগল, না ভেড়া, না অর্ধ-নর, এমনকি অর্ধ-নরও তো নয় তবে? কিন্তু আর্কিভিয়দের আরাধ্য। দেবতা প্যাম-এর মূর্তির সঙ্গেও তো এর তেমন সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তা সত্ত্বেও ভবিষ্যৎ বিজ্ঞজনরা সিরীয়দের উপাস্য দেবতা অশিসাহ-র মূর্তির গায়ে এসব রূপই এক এক করে চাপিয়ে দেবেন।
ঠিক আছে, এবার না হয় চোখে চশমা লাগিয়েনিন। ব্যস, এবার ভালো করে পরখ করে নিয়ে বলুন তো, এটা কীসের মূর্তি?–‘আরে বাবা। কী কেলেঙ্কারি কাণ্ড রে বাবা! এ যে দেখছি একটা বানরের মূর্তি।
হ্যাঁ, প্রায় ঠিকই বলেছেন ভাই। এটা একটা বেবুনের মূর্তি। বেবুন হলে হবে কি, দেবতা হিসেবে কিন্তু কোনো দিক থেকে কমতি নয়।
‘এর নামকরণ–‘
‘নামকরণ হয়েছে সিসিয়া থেকে। সিসিয়া একটি গ্রীক শব্দ। ব্যাপারটা ভেবে দেখলেই বুঝতে পারবেন পুরাতত্ত্ববিদরা কি আহাম্মকই না হতে পারেন। আর ওই, ওই দিকে একবারটি তাকিয়ে দেখুন–একটা লোমশ বাচ্চা কেমন ধেই ধেই করে হরদম লাফাচ্ছে। সে এমন লাফাতে লাফাতে কোথায় চলেছে, বলতে পারেন? আবার চেঁচিয়ে কি যেন সব বলছে–কি বলছে। আরে, সে গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে বলছে–রাজা মশাই বিজয়-যাত্রায় বেরিয়েছেন। তার গায়ে রাজপোশাক ঝলমল করছে। এই তো সবেমাত্র নিজের হাতে এক সহস্র ইসরাইলী কয়েদির ভবলীলা সাঙ্গ করেছেন। তাঁর অন্তরের অন্তঃস্থলে খুশির জোয়ার বয়ে চলেছে। তার মনের আনন্দোল্লাস, তার মুখের ভাষায়, হাসির মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে।
রাজা মশাই এরকম একটা সুমহান কর্ম সম্পাদন করায় দুর্জনরা তার জয়গানে আকাশ-বাতাস মথিত করে তুলছে। ওই ওই যে, তাদের সমবেত জয়ধ্বনি বাতাসবাহিত হয়ে কানে আসছে।
ওই, ওই যে একই ধরনের একদল সৈন্য এদিকে আসছে। শুনুন, উকৰ্ণ হয়ে শুনুন–একটু লক্ষ্য করলেই ব্যাপারটা সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হতে পারবেন।
‘কিন্তু তারা গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে কী বলছে?
‘আরে ভাই, বলছে না–বলছে না, রীতিমত গানে মাতোয়ারা।
‘গান! আপনি তবে বলতে চাইছেন, এটা তাদের গান?
‘অবশ্যই গান–সমবেতকণ্ঠে গান গাইছে।
‘কিন্তু গান কেন? কীসের গান, জানতে পারে কী?
‘রাজার প্রশস্তি। ল্যাটিন ভাষায় একটা গান বেঁধে সেটাই সোল্লাসে গাইতে গাইতে তারা এগিয়ে চলেছে।
গানটার বক্তব্য হচ্ছে–
হাজার! এক হাজার! একটা মাত্র যোদ্ধা নিয়ে আমরা এক হাজার নরাধমকে হত্যা করেছি। এসো, আমরা মহানন্দে গান গাই, আমাদের রাজা মশাইয়ের দীর্ঘ জীবন কামনা করছি। যে মহান রাজা একটামাত্র হাত সম্বল করে হাজারজনকে হত্যা করেছেন। এসো, আমরা ধ্বনি তুলি, গান গাই–রাজা মশাই টকটকে লাল রক্ত দিয়ে আমাদের মুঠোগুলো ভিজিয়ে দিয়েছেন, যা সমগ্র সিরিয়া নগর ঘুরেও তোমার দ্বারা কিছুতেই সম্ভব হবার নয়।
গানের বক্তব্য বলা শেষ করে সে মুহূর্তের জন্য কান খাড়া করে বলল–ওই ওই যে, শুনতে পাচ্ছেন কী? শুনতে পাচ্ছেন না? ওই ভেরীর আওয়াজটা শুনতে পাচ্ছেন না?’
‘হ্যাঁ পাচ্ছি, শুনতে পাচ্ছি। রাজা মশাই আসছেন। একটু লক্ষ্য করুন স্পষ্ট বুঝতে পারবেন, জনগণের মুখ টকটকে লাল হয়ে গেছে।’
‘কেন?’
‘আরে ভাই,, তারা যে পঞ্চমুখে রাজার প্রশংসা করছে, লাল হবে না! আর ওই দেখুন, অন্তহীন শ্রদ্ধায় তারা বার বার মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাচ্ছে। তিনি যে আসছেন।
‘তিনি যে আসছেন এতে কিছুমাত্রও ভুল নেই।
‘আরে, আর আসছেন নয়, এসে গেছেন! ওই, ওই তো তিনি আমাদের মুখোমুখি অবস্থান করছেন।
‘কিন্তু কোথায়? কোথায় তিনি? আমি যে দেখতে পাচ্ছি না।
‘দেখতে পাচ্ছেন না। রাজা মশাইকে দেখতে পাচ্ছেন না!’
‘সত্যি বলছি–বিশ্বাস করুন, রাজা মশাইকে আমি তো মোটেই দেখতে পাচ্ছি না!’
‘আরে ধৎ! মশাই, আপনি তবে অন্ধ।‘
‘হ্যাঁ, তবে হয় তো আপনার কথাই সত্যি হবে।‘
‘অবশ্যই। আমার কথা সত্যি হতে বাধ্য।‘
‘আমি আবারও বলছি, রাজা মশাইকে আমি মোটেই দেখতে পাচ্ছি না। তবে হয়তো আপনার কথাই ঠিক। আমি তবে অন্ধই বটে। আমি তো একদল আহাম্মক উন্মাদের চিল্লাচিল্লি ছাড়া কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। অতিকায় একটা বাঘুট-এর সামনে আবেগাপ্লুত হয়ে তার চরণে চুমু খাবার জন্য তারা নিজেদের মধ্যে গুঁতোগুতি ধাক্কাধাক্কি শুরু করে দিয়েছে।
আরে বাবা কী সাংঘাতিক ব্যাপার! জানোয়ারটা এক ভক্তকে এবার লাথি মারল তারপর আর এক ভক্তকে। একটা কথা না বলে আমি পারছি না, জানোয়ারটা যেভাবে দমাদম লাথি মেরে চলেছে তাতে তাকে বাহাদুর মানতেই হয়। হ্যাঁ, ভক্ত তো অবশ্যই। এরাই তো এপিডাফন নগরের মার্জিত রুচিসম্পন্ন স্বাধীন নাগরিক।
