তবে রক্ষা যে, স্তম্ভগুলোর ঝুলিয়ে দেওয়া আলোগুলো দিনভর জ্বলে, আলো দেয়। তা না হলে মিশরের ধ্বংসসানুখ মুহূর্তে সে অন্ধকার কালো ঘোমটার আড়ালে চলে যাচ্ছিল সে রকম অন্ধকারে আমরা চাপা পড়ে যেতাম, খুবই সত্যি কথা। সত্যি, স্থানটা অভাবনীয় রকমের অদ্ভুত। ওই যে, বাড়িটা দেখা যাচ্ছে, তার মানে কি? আশপাশের অন্য বাড়িগুলোকে ছাড়িয়ে ওটা যেন আকাশে মাথা ঠেকাতে তৎপর। তা-ও আবার রাজপ্রাসাদটার পূবদিকটাকে আড়ালে ফেলে দাঁড়িয়ে আছে-আশ্চর্য!
ওটা কি? আরে, ওটাই তো নতুন গড়ে তোলা সূর্যমন্দির। এলাহ গাবনাহ’ নামে সিরিয়াবাসীরা তাঁর পূজার্চনা করে।
পরবর্তী সময়ে কুখ্যাত এক রোমক সম্রাট নতুন একটা পূজার প্রবর্তন করবেন। আর তা থেকেই তিনি ‘হোলিও গাবালুস’ নামে নতুন একটা উপাধি গ্রহণ করবেন। আশা করি সে মন্দিরটার গর্ভগৃহে রক্ষিত ও পুজিত হচ্ছেন যে দেবতা তাকে একবারটি চোখের দেখা দেখার জন্য আপনারা উৎসাহি হবেন, ঠিক বলিনি? এর জন্য আপনাদের আকাশ পানে তাকাবার কোনো দরকারই নেই। কারণ? সূর্য-দেবতা সেখানে অনুষ্ঠান করছেন না। আর যাই হোক, অন্তত সিরিয়াবাসীরা সে সূর্যদেবতার পূজাপাঠ করে তিনি তো অবশ্যই নেই। তবে কোথায় তিনি অধিষ্ঠান করছেন, দূরবর্তী ওই দেবালয়ে। বড়-সড় একটা প্রস্তরখণ্ডের মূর্তিরূপে তিনি পূজিত হচ্ছেন। প্রস্তরখণ্ডটার শীর্ষে একটা শঙ্কু অবস্থান করছে, অগ্নিদেবের প্রতীক ওটা।
আমি এবার আপনাদের অনুরোধ করছি, দেখুন! সবকিছু শুনুন, জানুন! হাসির উদ্রেককারী ওই মানুষগুলো কে, কি-ই বা তাদের প্রকৃত পরিচয়?
অর্ধ-নগ্ন, মুখে রং-কালির প্রলেপ দিয়ে যারা ওই মানুষগুলোর দিকে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে চিল্লাচিল্লি করছে তারা কারা, কি-ই বা তাদের প্রকৃত পরিচয়।
তাদের মধ্যে কিছুসংখ্যক লোক ভেকধারী, ভণ্ডামি যাদের রক্তের সঙ্গে মিশে রয়েছে, আর অবশিষ্টরা দার্শনিক শ্রেণিভুক্ত।
তবে তাদের মধ্যে যারা জনসাধারণের ওপর নির্মমভাবে লাঠি চালিয়েছে, তারা সবাই রাজসভার প্রধান পরিষদ। সর্বদা রাজার সন্তোষ উৎপাদনকেই যারা জীবনের প্রধান ও একমাত্র কাজ বিবেচনা করেন।
কিন্তু এখানে চোখের সামনে আমরা কি দেখতে পাচ্ছি? হায় ভগবান! সারা নগরটা যে বুনো জন্তু-জানোয়ারে হেঁয়ে ফেলেছে। কী ভয়ঙ্কর! কী মারাত্মক সঙ্কটজনক পরিস্থিতি।
যদি ভয়ঙ্কর বলতে উৎসাহি হন, আপত্তি করব না–তাই বলুন। তবে সঙ্কটজনক এমন কথা মোটেই বলবেন না। একটু কষ্ট স্বীকার করে যদি অনুসন্ধিৎসু নজরে ভালোভাবে লক্ষ্য করেন, তবেই বুঝতে পারবেন, প্রতিটি জানোয়ার কেমন অনুগত ভৃত্যের মতো মুখ বুজে তার প্রভুকে অনুসরণ করে চলেছে। তবে এও সত্য যে, কারো গলায় দড়ি বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা প্রত্যেকে এমন নিরীহ ও ভীতু প্রকৃতির তা আর বলার নয়।
তবে বাঘ, সিংহ আর চিতাবাঘগুলো কিন্তু পুরোপুরি ছাড়াই রয়েছে। অল্প সময়ে এবং অল্পয়াসেই তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে হরেকরকম কাজকর্ম শিখিয়ে নেওয়া রয়েছে। আর যার মনিবের খানসামার কাজে তারা নিযুক্ত।
অবশ্য এ-কথাও সত্য যে, প্রকৃতিদেবী কখনও কখনও নিজেকে প্রকাশ করে থাকেন, কিন্তু ঠিক সে পরিস্থিতিতে কোনো সশস্ত্র যোদ্ধা যদি কোনো জানোয়ারের পেটে আশ্রয় নেয়, বা কোনো বড়সড় অমিত শক্তিধর কোনো ষাড়কে কুপোকাৎ করে দেয়া হয় তবে এ-ব্যাপার স্যাপার নিয়ে এফিডফ নগরের অধিবাসীরা কোনোরকম
ফো-ফা করে না। ব্যাপারটাকে নিয়ে তারা মাথা ঘামানোর দরকারই মনে করে না।
কিন্তু ওই, ওই যে কীসের ভীষণ হৈ হট্টগোল শোনা যাচ্ছে না। হ্যাঁ, এই অনুমান অভ্রান্তই তো বটে। মনে ত হচ্ছে, এটা নির্ঘাৎ অ্যান্টিয়োকের একটু বেশি রকমই ভাব শব্দ। ভাবগতিক লক্ষ্য করে মনে হচ্ছে, গোলমালের কারণটা অসাধারণই বটে। হ্যাঁ, এরকমই তো মনে হচ্ছে।
অনুমান অভ্রান্ত। রাজা মশাই কোনো অদ্ভুত দৃশ্যের নির্দেশ দিয়েছেন। এমনও হতে পারে হিপোড্রামে কোনো মল্লযুদ্ধের খেলা শুরু হয়েছে। আর তা যদি না-ই হয় তবে হয়তো সিদিয়ান বন্দিদের গণহত্যা-পর্ব চলছে। নতুবা নতুন রাজপ্রাসাদে আগুন কাসের ভীষ নির্ঘাৎ অ্যাম্ভিকারণটা অসাধা জ্বেলে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দেওয়া হচ্ছে অথবা মনোলোভা কারুকার্য মণ্ডিত মন্দিরকে ভেঙে চুড়ে ধুলিস্যাৎ করে দেওয়া হচ্ছে বা একদল ইহুদিকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হচ্ছে।
গলাছাড়া বিকট হাসির শব্দে আকাশ কাঁপিয়ে তোলা হচ্ছে। তাল-লয়হীন বাজনার শব্দে বাতাস ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছে, লক্ষ মানুষের ক্ষুব্ধ কণ্ঠের হৈ হট্টগোলে পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে।
আপনারা আমাকে সঙ্গদান করুন, পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে দেখেই আসা যাক না, ওখানে কোনো তামাশা শুরু হয়েছে দেখেই আসি চলুন।
এই যে, এদিকে-এদিকে। সাবধান! আমরা কিন্তু নগরের বুকে পৌঁছে গেছি। আর এমন প্রধান রাজপথে দাঁড়িয়ে রয়েছি–‘টাইমার্স পথ’ নামে একে সবাই জানে।
টাইমার্স পথটা ধরে উদ্বেলিত জনতার মিছিল দুর্বার এগিয়ে চলেছে। বানের পানির মতো এমন উদ্দাম-দুর্বার গতিতে তারা পথ পাড়ি দিচ্ছে যে, তাদের পথ রোধ করা খুবই কঠিন সমস্যা।
তারা হেরাক্লিডেস গলি-পথ ধরে উন্মাদের মতো ছুটতে ছুটতে বেরিয়ে আসছে। আর এ-গলিটা রাজপথ থেকে বেরিয়ে সোজা চলে এসেছে। অতএব রাজাও হয়তো বা। এসব হুল্লাবারীদের সঙ্গে রাজা মশাইও রয়েছেন।
