আর এ কারণেই যেসব কাপুরুষসুলভ নির্মম-নিষ্ঠুর অপবিত্র ও হুজুকে কাজকর্মের মধ্য দিয়ে তার ব্যক্তিগত জীবন পরিচালিত হয়েছে আর যশ, তাদের বদলে পূর্ব কথিত ঘটনাগুলোই ঐতিহাসিকদের মনে বেশি মাত্রায় দাগ কেটেছে। আর এরই ফলে তারা সেগুলোকেই লেখার উপকরণ হিসেবে উপযুক্ত বিবেচনা করেছেন।
আমরা মনে করি না কেন, এখন সময়টা তিন হাজার আট শো ত্রিশ। আর কয়েক মুহূর্তের জন্য ভেবে নেওয়া যাক, আমরা এ মুহূর্তে মানুষের এক অদ্ভুত বাসস্থল এন্টিয়োক নগরে অবস্থান করছি।
অবশ্য এ-কথাও সত্য যে, যে বিশেষ নগরটা সম্বন্ধে আমি বলছি সেটা ছাড়াও সিরিয়া আর অন্য বেশ কয়েকটি দেশে এ একই নামে আরও ষোলটা নগরের অস্তিত্ব বর্তমান।
তবে আমাদের আলোচ্য নগরটাকে সবাই এন্টিয়োকিয়া এপিডাফ নগর নামেই জানত যে গ্রামে একটা দেবমন্দির রয়েছে, সে ডাফ গ্রামের লাগোয়া এ নগরটার অবস্থান হওয়ার জন্যই এর এ নামকরণ করা হয়েছে।
শোনা যায়, দিগ্বিজয়ী বীর মহান আলেকজান্ডারের ঠিক পরেই এ দেশের সিংহাসনে বসেন সেলুকাস নিকানর। তিনি তার পিতা এন্টিকোয়াসের স্মৃতি রক্ষার উদ্দেশ্যে এ মন্দির নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠা করেন। ব্যস, এবার থেকেই এ স্থানটা সিরীয় রাজাদের বাসস্থানরূপে ব্যবহৃত হতে থাকে।
রোমক সাম্রাজ্যের সুবর্ণযুগের আমলে প্রাচ্য প্রদেশগুলোর প্রধান কর্মচারীর কর্মস্থল এ নগরেই গড়ে তোলা হয়।
শ্রেষ্ঠ সম্রাটদের অনেকেই, ভ্যালেন্স আর ডেবার্সের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য জীবনের অধিকাংশ সময় তারা এখানেই অতিবাহিত করেছিলেন।
ধরে নেওয়া যাক, আমরা এখন সে নগরেই অবস্থান করছি। তবে এবার শহর এবং প্রতিবেশী দেশের দিকে চোখ বুলিয়ে দেখি তাদের পরিস্থিতি কেমন।
ওই যে আমাদের চোখের সামনে, অদূরবর্তী অঞ্চলের ওপর দিয়ে প্রশস্ত ও স্রোতস্বিনী কল্লোলিনী নদীটা অগণিত ঝর্ণার পানিকে বুকে নিয়ে নির্জন-নিরালা পার্বত্য অঞ্চলের ওপর দিয়ে নেচে নেচে হেলে দুলে অগ্রসর হয়ে হয়ে এক সময় প্রাসাদোপম অট্টালিকা সারির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, এটা কোন নদী, নামই বা কী?
এ নদীটাই অরন্টেস নামে পরিচিত। এটা দক্ষিণে প্রায় বারো মাইল এগিয়ে গেছে। কাকের চোখের মতো, এবং এর পানি কাঁচের মতো স্বচ্ছ। ভূমধ্যসাগর আর এ নদীটা ছাড়া অন্য কোনো নদীর পানিই এমন টলটলে নয়।
একটা কথা, অনেকেই ভূমধ্যসাগরকে চাক্ষুষ করেছেন। আমি কিন্তু বলব, এন্টিয়োক নদীকে খুব কম লোকই মুহূর্তের জন্য চোখে দেখার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। কম লোক বলতে আমি আপনার আর আমার মতো আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষদের কথাই বুঝাচ্ছি। তাই বলছি কি, সমুদ্রের আলোচনা এখন দেওয়া যাক। আমরা বরং আলোচনাকে নিচের ওই বাড়িগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখি।
খেয়াল থাকে যেন, এখন তিন হাজার আটশ ত্রিশ। এ না হয়ে এটা যদি আরও পরবর্তী কাল হত তবে? যেমন ধরা যাক, এটা যদি তিন হাজার আটশ’ ত্রিশের পরিবর্তে আঠারো শশা পয়তাল্লিশ যদি হত? তবে তো আমরা এ অসাধারণ দৃশ্যটা স্বচক্ষে চাক্ষুষ করতে পারতাম না, তাই না?
উনিশ শতকে পা দিয়ে আমাদের আলোচ্য নদী এন্টিয়োক একটি হৃদয় বিদারক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে যাবে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন সময়ে তিন-তিনটি ভয়ঙ্কর ভূ আলোড়নের ফলে শহরটা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস-শ্মশানে পরিণত হয়ে যাবে।
খুবই সত্য যে, তিন-তিনটি ভু-আলোড়নের পর নগরটা যে সামান্য অংশটুকু টিকে থাকবে, তা এমনই জনমানবশূন্য ধ্বংসাবশেষ ভূখণ্ডে পরিণত হয়ে পড়বে যার ফলে রাজ্যের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা রাজা মশাই দামাস্কাসে তার বাসস্থল স্থানান্তরিত করবেন।
চমৎকার! আমার পরামর্শে লাভ ছাড়া তিলমাত্র লোকসান হয়নি।
নগরের ঘর-বাড়ি দেখে দেখে আমাদের সময় খুব ভালোভাবেই কেটে যাচ্ছে, ঠিক কিনা? এ ন্যায়ের স্মৃতিসৌধ আর বিখ্যাত সবকিছু দেখে দেখে আপনাদের চোখ দুটো জুড়িয়ে গেছে, মিথ্যা বলেছি?
আমি মার্জনা ভিক্ষা করে নিচ্ছি, আমার স্মরণই ছিল না, আরও সতেরশো বছর আগেকার কথা, মনেই ছিল না যখন মহাকবি সেক্সপীয়ারের জন্মই হবে না। তবে এপিডাফন নগরের এ রূপকে কিন্তু আমার পক্ষে গদগদ স্বরে অত্যাশ্চর্য সুন্দর আখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়, কিছুতেই নয়।
হ্যাঁ, এটা অবশ্য খুবই সত্য যে, এপিদাফল নগরটা সুরক্ষিত। আর এর জন্য যে প্রকৃতিদেশি আর শিল্পনৈপুণ্যে উভয়ের কাছেই ঋণী, খুবই সত্য বটে।
নগরটায় অগণিত রাজপ্রাসাদের মতো ঘর-বাড়ি বর্তমান।
হ্যাঁ, খুবই সত্য–তা আছে বটে।
এ-ছাড়া এখানকার অগণিত মনোলোভা জাঁকজমকে ভরপুর চমৎকার সব মন্দিরকে যে কোনো ভূয়সীপ্রসংশিত পুরাকীর্তির সঙ্গেই অনায়াসে তুলনা করা যেতে পারে।
এসব কথাই আমি অকপটে স্বীকার করে নিচ্ছি। তা সত্ত্বেও এখনো ওখানে তো চোখে পড়ে অগণিত কাঁচা মাটির বাড়ি আর জঘন্য সব বস্তির ছড়াছড়ি। এখানে ওখানে সর্বত্র প্রত্যেকটা নালা-নর্দমা ময়লা আবর্জনায় বোঝাই। মূর্তিপূজারীদের ধূপ ধূনায় চাপা না পড়ে গেলে দুর্গন্ধে বসবাস করাই সমস্যা হয়ে দাঁড়াত।
শুধু কি এ-ই? এমন অসহ্য-বিরক্তিকর সরু পথ-ঘাট, আর অত্যুদ্ভুত রকমের লম্বা লম্বা বাড়ি কি কেউ কোনোদিন দেখেছেন–কারো চোখে পড়েছে। সত্যি করে বলুন তো? ধরনীর ওপর তারা কী বিষণ্ণ ছায়াপাতই না করে।
