আবার বড় বা ছোট কার্পেট ব্যবহার করতে গিয়েও আমাদের ঘরের মাপের দিকে নজর দেওয়া অবশ্যই দরকার। স্বাভাবিকভাবেই ঘর যদি বড়সড় হয় তবে বড় মাপের কার্পেট ব্যবহার করতে হবে আর ঘরের মাপ ছোট হলে কার্পেটও ছোটই লাগবে। আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব কথা বিচার-বিবেচনা না করেই বাজার থেকে কার্পেট কিনে নিয়ে চলে আসি। সব তথ্য জানা থাকা সত্ত্বেও প্রায় সবাই-ই ভুল করে বসে। আবার এমন ঘটনাও বহু দেখা যায়, আমরা চোখের বিচারের পরিবর্তে দামের বিচারকেই বেশি কদর দিয়ে থাকি, আর দাম মিটিয়ে দিয়ে কার্পেট এনে ঘরে তুলি।
আরও আছে, আমাদের মধ্যে অনেকেরই দৃঢ়বিশ্বাস রয়েছে, দূরবর্তী কোনো দেশের ঝকমকে কার্পেট হলেই বুঝি তা অবশ্যই উন্নতমানের হবে এবং ঘরের সৌন্দর্য অনেকাংশে বেড়ে যাবে।
একটা কথা তো আর মিথ্যা নয়, সাধারণ মানুষ মামুলি ব্যাপার-স্যাপারের দিক বিচার করেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। এর জন্য দক্ষতা আর অভিজ্ঞতার ধার তারা ধারে না। কিন্তু উন্নতমানের অর্থাৎ যথাযথ কার্পেটনির্বাচনের ক্ষেত্রে ধীশক্তির প্রয়োজন অবশ্যই আছে।
ঘরদোর সাজাতে গিয়ে আমেরিকাবাসীরা ঘরে অত্যুজ্জ্বল আলোকচ্ছটাসম্পন্ন বাতি ঝুলিয়ে দিয়ে বিকৃত রুচির পরিচয় দিয়ে থাকে। সে আলো যত তীব্র দ্যুতিসম্পন্ন হবে, আলো-ঘরে যত বেশি কাঁচ-গ্লাসের শেড থাকবে মনে করা হবে ঘরটার কদর যেন ততই বেড়ে গেল।
কাঁচ-গ্লাসের ব্যাপারটা নিয়ে মুহূর্তের জন্যও ভাবে না যে, শত্রু-দেশ এ বস্তুটার আবিষ্কর্তা।
কাট-গ্লাসের ভূমিকা কী? আলোকরশ্মিকে অসম, ভাঙা-ভাঙা আর বিষণ্ণতায় পরিপূর্ণ করতে কাঁচ-গ্লাসের মতো অন্য কারোরই সাধ্য নেই।
তবে কাঁচ-গ্লাস কেনার জন্য মানুষ এমন হন্যে হয়ে ছুটাছুটি শুরু করে? শেড। চোখ ধাধিয়ে দেবার ক্ষমতা রাখে বলে নয়। তবে? দামে বেশি হওয়াই এর সবচেয়ে বড় কারণ, স্বীকার করতেই হবে। এরকম আলো ব্যবহারের মাধ্যমে ঘরের সৌন্দর্য তো বরবাদ হয়ই আর সেই সঙ্গে ঘরের অর্ধেক লালিত্যও নষ্ট হয়ে যায়।
আলোর চরিত্র হওয়া দরকার চাঁদের আলোর মতোই ফুটফুটে। ইথারের আলোর মতোই ঘষা কাঁচের সাদামাটা শেড দিয়ে ঘেরা থাকবে। এরকম আলোর প্রভাবে ঘরের প্রতিটা আসবাবপত্র তখন চোখ আর মনকে আকর্ষণ করবে। এখন দেখা যাবে, সম্পূর্ণ ঘরটাই দেহ আর মনের ওপর শান্তির প্রলেপ দিয়ে দেবে। এজন্যই তো তীব্র গ্যাসের আলো ঘরে ব্যবহার না করাই ভালো।
সুসজ্জিত অধিকাংশ বৈঠকখানায়ই প্রিজম-কাঠ কাঁচের সুবিশাল ঝাড়লণ্ডন ঝুলতে দেখা যায়। এটা যে কেবলমাত্র বেমানান তাই নয়, কুরুচির পরিচায়কও বটে। অর্থকড়ির অহঙ্কার প্রকাশের এর চেয়ে আহাম্মকের কাজ আর কিছুই হতে পারে না।
ঝাড়লণ্ঠন যখন গ্লাসের আলোয় জ্বলতে আরম্ভ করে তখন তা দেখে কেবলমাত্র বোকা-হাঁদারাই খুশিতে ডগমগ হয়ে ওঠে।
কাঁপা কাঁপা অস্থির অত্যুজ্জ্বল আলোকচ্ছটা চোখে রীতিমত ধাঁধা লাগিয়ে দেয়। মালিক কিন্তু তখন আত্মপ্রসাদই লাভ করে। সে মনে মনে ভাবে, কী চমৎকার জিনিসই না আমি কিনে এনেছি!
আমেরিকানদের কথা যদি আলোচনা করা যায় তবে দেখব, চাকচিক্যের প্রতি মানুষের প্রবণতা খুবই বেশি। এ প্রবণতা কীসের? আয়না দিয়ে ঘর সাজাবার ঝোঁক থেকেই এ-উদ্ভট প্রবণতা এসেছে।
এবার ব্রিটিশদের সুবিশাল আয়নার কথাই আলোচনা করা যাক। কেটামাত্র বিশাল আয়নায় তারা তুষ্ট হতে পারে না, আবার একাধিক আয়না না হলে তাদের মন কিছুতেই ভরে না। অন্তত গোটা চারেক আয়না না টাঙালে তারা যেন স্বস্তিই পায় না, ঘরটা যেন সাজানোই হলো না।
আয়না প্রতিফলন ঘটায়। একই প্রতিফলন বার-বার ঘটার ফলে একঘেয়ে বোধ হয়। আর এতেই বৈচিত্র্য যেটুকু ছিল তা-ও বরবাদ হয়ে যায়।
একেবারে অজপাড়াগাঁয়ের মানুষও চার-পাঁচটা আয়না ঝোলানো চোখ ধাঁধানো ঘরে ঢুকেই ধরে নিতে পাওে, কোথায় যেন কিছু একটা গড়বড় হয়েছে। আবার এই একই অজপাড়াগাঁয়ের মানুষটা যদি রুচিসম্মতভাবে সাজানো-গোছানো ঘরে ঢোকে। তবে সে কিন্তু আনন্দিতই হবে না, বিস্ময় বোধও করবে।
গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে এভাবেই মহাঅমঙ্গল ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফল কি দাঁড়িয়েছে? ডলার উৎপাদকদের রুচি আর স্বাভাবিক রইল না। তাতে প্রচুর খাদ ঢুকে গেছে। তারা রুচির মধ্যে দুনীর্তিকে পুরোদস্তুর আশ্রয় দিয়েছে। বরং বলা চলে, দুর্নীতি আঁকিয়েই বসেছে।
এবার মূলকথা বলছি, যে যত বেশি ডলারের মালিক, তার আত্মা তত ছোট। মানুষের অর্থকড়ি যত বাড়তে থাকে তার ধ্যান-ধারণাও ততই ভোতা হয়ে পড়তে থাকে। তাই তো মোটামুটি ধনবান আমেরিকানদের ঘরদোরে সুরুচির ছোঁয়া লক্ষ্যিত হয়।
আমেরিকানরা রুচির দিক থেকে আমাদের সাগর পাড়ের বন্ধুদের সঙ্গে পাল্লা তো দিতে পারেই, এমনকি টেক্কাও দিতে পারে অনায়াসেই।
এবার সে রকমই একটা ঘরকে কেন্দ্র করে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া যাক। কেমন সে ঘরটার পরিস্থিতি, তাই না? মনে করা যাক, গৃহকর্তা যে ঘরে সুখেনিদ্রা যাচ্ছে, দেহ-মনে রোমাঞ্চ জাগানো ঝিরঝিরে বাতাস বইছে, আকাশের গায়ে আলতোভাবে ঝুলছে রূপালি চাঁদ–তখন সময় মাঝরাত।
ঘরটার আকৃতি কেমন, তাই না? বলছি–আয়তাকার, লম্বা ত্রিশ ফুট আর প্রায় পঁচিশ ফুট চওড়া।
