রাশিয়ানরা কিন্তু ঘরদোর সাজগোজের ধার ধাওে না। সত্যিকথা বলতে কী ঘর সাজাবার যে কোনো দরকার আছে, তাদের জানাই নেই। তাদের মতে ঘরের ভেতরে যেটা যেখানে আছে, সেটাকে সেখানে থাকতে দেওয়াই তো বুদ্ধিমানের কাজ। এ নিয়ে মিছে মাথা ঘামাবার দরকারই বা কি? শুধু শুধু সুস্থশরীর ব্যস্ত করা।
এবার কিকাপু আর হাটেনটটদের ঘরের ভেতরে একবার উঁকি দিয়ে দেখা যাক। এরা ঘরদোর সাজিয়ে গুছিয়ে কেমন টিপটপ করে রাখে। এরা কিন্তু নিজেদের কায়দা কৌশল নিয়ে মহাসুখেই আছে।
আর ইয়াঙ্কিদের কথা যদি জানতে চান তবে বলতেই হয়–এরা মন-মাতানো আর চোখ ধাঁধানো জৌলসেই বিশ্বাসী। বিশেষ কায়দায় ঘরদোর সর্বদা সাজিয়ে গুছিয়ে এরা রীতিমত চমক সৃষ্টি করে রাখে।
এটা কিভাবে সম্ভব, এ-ব্যাপারে আমার ধারণা স্বচ্ছ নয়–বরং নিতান্তই ঝাপসা। এটা তো আর মিথ্যে নয়, আমাদের রক্তে আভিজাত্যের বড়ই অভাব। তাই তো যেখানে আজও রাজতন্ত্রের প্রতাপ আজও অব্যহিত রয়েছে) রাজবংশীয়রাই একের পর এক সিংহাসন অলংকৃত করেন, বিশেষ করে এসব দেশে আমরা ডলারের প্রাচুর্যের ঝঙ্কার শুনিয়ে থাকি, চোখ দুটোকে ধাধিয়ে দেই, তাদের ওপর নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে আমরা আদাজল খেয়ে লেগে পড়ি। আর এ-থেকেই আন্তরিকতার পরিবর্তে লোক দেখানোর ব্যাপারটাই বেশি গুরুত্ব পেয়ে থাকে। আর এটাই আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লাগাম টেনে ধরে, অস্পষ্ট-ঝাপসা-ঝাপসাভাবে না বলে খোলাখুলিভাবেই আলোচনা করা যাক। কোনো ব্যাপারেই ঢাক ঢাক গুর গুর করা আমার ধাতে সয় না। ইংল্যান্ডের মানুষের ট্র্যাকের জোর নেই বললেই চলে। কিন্তু একটা ব্যাপার খুবই লক্ষ্যণীয়, বংশমর্যাদার কথা বলতে চাইছি। আর এ-ব্যাপারে তারা খুবই সজাগই বটে।
সমাজের অন্য পাঁচজন সাধারণ মানুষের কথাই বলছি, তারা আদর্শ খুঁজতে গিয়ে–ওপরের দিকেই দৃষ্টিপাত করে থাকে। ওপর তলার মানুষের ক্রিয়াকাণ্ডকে অন্ধের মতো অনুকরণ করতে উৎসাহি হয়ে পড়ে, শেষপর্যন্ত করেও তা-ই। তারা চালচলন, হাভভাব আর কথাবার্তায় রাজা-রাজরাদের ভাবকেই আঁকড়ে ধরে। তাদের। সবকিছুতে এ-ভাবই প্রকাশ পায়।
কেবলমাত্র আচার-আচরণের কথাই বা বলি কেন? আসবাবপত্র আর ঘরদোর সাজাবার উপকরণের মধ্যেও আভিজাত্যের ছোঁয়া স্পষ্টই নজরে পড়ে। কাথাবার্তা আর আচার আচরণের মতোই আসবাবপত্রেও সুরুচির পরিচয় মেলে।
এ তো গেল ইংল্যান্ডের মানুষের ব্যাপার-স্যাপার। এবার দেখা যাক, আমেরিকার মানুষ সাজগোজের কাজে কোন পথ বেছে নেয়। তারা ওপর তলার মানুষের দিকে তাকিয়ে পথ খুঁজতে হাপিয়ে যায়। কিন্তু ওপর তলার মানুষের আচার-আচরণ দেখে তারা হতভম্ব হয়ে যায়। তারা ভেবেই পায় না কোনটাকে আঁকড়ে ধরবে, আর কোনটাকে বিতৃষ্ণার সঙ্গে বাতিল করে দেবে। তাদের সমাজে দুটো জিনিসের প্রভাব খুব বেশি। একটা ঐশ্বর্যের জৌলুস আর দ্বিতীয়টা হচ্ছে ধাপ্পাবাজী।
আরে ভাই, ধন-দৌলতের ভার তো সব যুগে সব কালেই বেশি। তাই স্বাভাবিকভাবেই ডলারের ঝনঝনানির কথা উঠে যায়। ঘরদোর সাজসজ্জার ব্যাপারে ডলার প্রভাব বিস্তার করে থাকে। পরিণাম হিসেবে দেশজোড়া দোষ-ক্রটি নজরে পড়ার মতোই বটে।
ঘরদোর নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার যে দরকার হয়, তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ছবি যেমন নিয়মিত ঝেড়ে-মুছে পরিষ্কার করতে হয় ঠিক তেমনই ঘরও পরিষ্কার ও গোছগাছ করা দরকার। নিয়মিত পরিচর্যা মানে নিয়মিত ঝাড়ামোছা না করলে একটা তৈলচিত্র কিছুতেই ভালো থাকতে পারে না।
একটা কথা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একটা আসবাবপত্রের রঙ যেমন চোখের পক্ষে পীড়ার কারণ হয় ঠিক তেমনই আসবাবপত্রে অবস্থানও চোখকে রীতিমত পীড়া দেয়।
ঘর সাজাতে গিয়ে আসবাবপত্রকে কেউ অবিন্যাস্ত, মানে আঁকাবাঁকা রাখে, কেউবা সারিবদ্ধভাবে রাখে আবার কেউবা কোনো নিয়ম-না-মেনে এলোমেলোভাবেই রেখে দেয়। আর এ সবের জন্যই বহু ঘরের শোভা নষ্ট হয়ে যায়। আসবাবপত্র বহুমূল্য হওয়া সত্ত্বেও অর্থ ও ঘর সাজাবার পরিশ্রম সবই বিফলে যায়।
আবার দরজা-জানালার পর্দার কথা যদি আলোচনা করা যায় তবে বলতেই হয়, খুব কম ক্ষেত্রেইনির্বাচন যথাযথ অর্থাৎ সুনির্বাচন করা হয়ে থাকে। আর সেগুলোকে ঠিকঠিক জায়গায় ঝোলানোও হয় না। মোদ্দা কথা হচ্ছে, দরজা-জানালার পর্দার কোনো দামই নেই। তবুও কার্যক্ষেত্রে দেখা যায়, অসঙ্গতি সৃষ্টি করে প্রচুর সংখ্যক পর্দা আর অহেতুক মূল্যবান পর্দা এলোমেলোভাবে যেখানে-সেখানে ঝুলিয়ে ব্যবস্থাপক কুরুচির স্বাক্ষর রাখে। ঘর আর দরজা-জানালা অনুযায়ী পর্দানির্বাচন করার ক্ষমতা খুব কম লোকেরই আছে।
সুদূর অতীতে কার্পেটের ব্যবহার যতটা দেখা যেত, ইদানিং তা অনেকাংশে বেড়েছে ছাড়া কমেনি। কিন্তু একটু লক্ষ্য করলেই একটা ব্যাপার আমাদের চোখ দুটোকে পীড়া দেবেই দেবে। ব্যাপারটা হচ্ছে, আমরা কার্পেটের রঙ, ডিজাইননির্বাচন করতে গিয়ে প্রায়ই দারুণ ভুল করে বসি।
প্রকৃত সৌন্দর্যবোধ যাদের আছে, তারা অবশ্যই স্বীকার করবেন, কার্পেটকে ঘরের আত্মা মনে করলেও এতটুকুও বাড়িয়ে বলা হবে না। যেসব জিনিস দিয়ে ঘর সাজানো হবে এবং যেসব অত্যাবশ্যক জিনিসপত্রকে ঘরে স্থান দেওয়া হবে, তাদের আকার ও রঙের সঙ্গে কার্পেটের রঙের সামঞ্জস্য রাখা চাই-ই চাই।
