পাহাড়টা থর থর করে কেঁপে উঠল। মনে হলো যেন মূল থেকে শিখর দেশ পর্যন্ত সম্পূর্ণ পাহাড়টাই থেকে থেকে দারুণভাবে কেঁপে উঠছে। সে যে কী ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির উদ্ভব হলো তা ভাষার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। পাথরগুলো রীতিমত দুলতে শুরু করল।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আমি আতঙ্কে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লাম। আমার স্নায়ুবিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছে গেল। সে উত্তেজনাকে সামাল দিতে না পেরে আমি হাতের নাগালের মধ্যে ঝোঁপঝাড় লতাপাতা যা পেলাম তাকেই আঁকড়ে ধলাম। মনে হলো আমার সামনের দৃশ্যগুলো অনবরত ঘুরছে তো ঘুরছেই। আমার আরও মনে হলো, যে কোনো সময় পাহাড় থেকে পা-হড়কে সুগভীর খাদের মধ্যে পড়ে যাব।
আমি শেষমেশ নিতান্ত অনন্যোপায় হয়েই বুড়ো ভদ্রলোকটিকে বললাম দেখুন, আমি কিন্তু ঘূর্ণাবর্তটা সম্বন্ধে একটা ধারণা করে নিয়েছি।
বুড়ো ভদ্রলোক বলেন–কী? কী সে ধারণা, জানতে পারি কী?
আমার বিশ্বাস, এটা মালস্ট্রামের ভয়ঙ্কর ঘূর্ণাবর্ত ছাড়া অন্য কিছুই নয়।
হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। অনেকেই এটাকে এ নামেই সম্বোধন করে থাকে। আমরা, নরওয়ের অধিবাসীরা একে কী বলি জান?
কী? আপনারা একে কী বলেন?
আমরা একে বলি মত্সকো-স্ট্রাম।
দেখুন, এ ঘূর্ণাবর্ত সম্বন্ধে যে বিবরণ শোনা যায়, তা জানা থাকলেও এখন যা চাক্ষুষ করলাম, আমি কিন্তু এমন ভয়ঙ্কর কোনো দৃশ্য দেখার জন্য মনের দিক থেকে মোটেই তৈরি ছিলাম না।
হুম!
দেখুন, জোনাস র্যামাসের বিবরণ আমি পড়েছি। সে বিবরণ পাঠ করে এ ঘটনার যে মহত্ব অথবা তার আতঙ্ক বা স্তম্ভিত হবার মতো নতুনত্ব দর্শকের মনে যারপরনাই ভীত-সন্ত্রস্ত এবং বুদ্ধিভ্রষ্ট করে তোলে, তার সামান্যতম ধারণাও পাওয়া যায় না।
আমার পক্ষে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। আসলে আমার জানাই নেই যে, লেখক কোথা থেকে এবং কিভাবে আলোচ্য ঘটনাটাকে চাক্ষুষ করেছিলেন। তবে সেটা হেলসেগেনের ওপর থেকে নয় বা প্রলয়ঙ্কর ঝড়ের সময় নয়, এ বিষয়ে তিলমাত্রও সন্দেহের অবকাশ নেই। তা সত্ত্বেও সে দৃশ্যটার ধরণ খুবই কমভাবে প্রকাশ করা হয়ে থাকলেও তার লিখিত বিবরণীর অংশবিশেষ নিচে উল্লেখ করছি
সে বিবরণীতে তিনি উল্লেখ করেছেন–মকো এবং লকডেনের মধ্যবর্তী স্থানের পানির গভীরতা ৩৬-৪০ ফ্যাদমের ভেতরে।
কিন্তু অন্যদিকে, ভুরুখের দিকে পানির গভীরতা খুবই কম। আর তা এতই কম যে, পাথরের গায়ে আছড়ে পড়ে বা ধাক্কা লেগে ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে কোনো জাহাজের পক্ষেই স্বাভাবিকভাবে সেখান দিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কেবলমাত্র ঝড়ের সময় বা অশান্ত আবহাওয়াতেই নয়, নিতান্ত শান্ত আবহাওয়াতেও সে রকম দুর্ঘটনার মুখোমুখি হতে পারে।
আর জোয়ারের সময়? তখন তো মসকো আর লকডেনের ভেতর দিয়ে এমন উত্তাল উদ্দাম গতিতে স্রোত প্রবাহিত হতে শুরু হয় যে, সবচেয়ে বেশি গর্জনকারী এবং ভয়ঙ্করতম জলপ্রপাতের শব্দও তার মতো বুক কাঁপানো হতে পারে না। আর তা এত দূর থেকে শোনা যায় যে, বেশ কয়েক লীগ [এক লীগ=প্রায় তিন মাইল] দূর থেকে শোনা যায় বললেও কম করেই বলা হবে। আর তার গর্ত এতই গভীর ও আয়তনে বড়সড় যে, কোনো জাহাজ হঠাৎ করে তার চক্করের মধ্যে পড়ে গেলে যে একেবারে অতলে পৌঁছে যাবে, তাতে কোনো সন্দেহই নেই। আর গর্তের তলদেশে গিয়ে পাথরের গায়ে ধাক্কা লেগে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
পরে ক্রমে পানির স্রোত কমতে কমতে শান্ত-স্বাভাবিক হয়ে এলে সে ভাঙা টুকরোগুলো দুম্ দাম করে ছিটকে পানির ওপর পড়ে।
তবে এরকম পরিস্থিতি সর্বদা নয়, কেবলমাত্র জোয়ার-ভাটার আগে চোখে পড়ে। আবার আবহাওয়া শান্ত থাকলেও এরকম অবস্থা নজরে পড়ে। আর এ পরিস্থিতি কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হয় না। মাত্র মিনিট পনেরো এ অবস্থা স্থায়ী হয়।
পানির স্রোত যখন সবচেয়ে বেশি শব্দ সৃষ্টি করে আর ঝড়ের জন্য তার তীব্রতা আরও অনেকাংশে বেড়ে যায় তখন তার থেকে এক নরওয়ে মাইলের মধ্যে আসা বড়ই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
অসাবধানতাবশত সতর্কতা অবলম্বন না করার জন্য কত ছোট-বড় নৌকা, ইয়ট আর ছোট-বড় জাহাজ যে-পানির টানে এগিয়ে গিয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে, তার ইয়ত্তা নেই।
কেবলমাত্র নৌকা বা জাহাজের কথাই বা বলি কেন? অতিকায় কোনো তিমিও যখন পথ চলতি সে ভয়ঙ্কর স্থানটার কাছাকাছি চলে আসে, ভয়ঙ্কর সে ফাঁদটায় মাথা গলিয়ে দেয়, তখন তার আত্মরক্ষার সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে যায়, নিজেকে অদৃষ্টের হাতে সঁপে দেওয়া ছাড়া তার আর কোনো গত্যন্তরই থাকে না। অনন্যোপায় হয়ে অদৃষ্ট বিড়ম্বিত জানোয়ারটা তখন যেভাবে ভয়ঙ্কর আর্তনাদের মাধ্যমে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তুলতে থাকে, তা কাউকে বলে বুঝানো সম্ভব নয়।
একটা ভালুক এক সময় সাঁতরে লকডেন থেকে মসকো যাবার চেষ্টা করছিল। ভয়ঙ্কর সে স্রোতটার কাছাকাছি অঞ্চল দিয়ে সাঁতরে পথ পাড়ি দিতে গিয়ে স্রোতের টানে সে নির্দিষ্ট স্থানটায় চলে গিয়ে যেভাবে বিকট স্বরে আর্তনাদ জুড়ে দিয়েছিল, তা তীর থেকে পরিষ্কার শোনা গিয়েছিল।
আছে, আরও আছে, পাইন ও ফারগাছের অতিকায় বহুঁকাণ্ড ভয়ঙ্কর সে ঘূর্ণাবর্তে তলিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কিছুক্ষণ বাদে সে গুঁড়িগুলো এক এক করে ওপরে উঠে আসে তখন পরিষ্কার মনে হয়েছিল, সেগুলোর গায়ে বুঝি ছোট ছোট লোম গজিয়েছে।
