আটই মার্চ। আমাদের গতি অব্যাহতই রইল। সাদা একটা জানোয়ারকে শালতির পাশ দিয়ে ভেসে যেতে দেখলাম। আমরা মালান্টের সাগরের প্রায় কূল ঘেঁষে ঠিক এরকমই একটা জানোয়ারকে ভেসে যেতে দেখেছিলাম। যেটাকে নিয়ে জংলিদের মধ্যে রীতিমত আলোড়ন জেগে গিয়েছিল।
আমি অত্যুগ্র আগ্রহের সঙ্গে জানোয়ারটাকে শালতিতে তুলে নেবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু হঠাৎ কেমন একটা অসাড়তা আমাকে পেয়ে বসল। ইচ্ছা পূর্ণ হলো না।
ইতিমধ্যে পানির তাপমাত্রা আরও অনেকগুণ বেড়ে গেছে। হাত ছোঁয়ানোই সম্ভব নয়।
ডার্ক পিটার্স মুখে কলুপ এঁটে বসে। সে যে কেন হঠাৎ ক্রমশ গম্ভীর ও উদাসিন হয়ে পড়েছে, আমার মাথায় এলো না। এদিকে শাতির তলায় পড়ে নুনু কেবল শ্বাসক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। ব্যস, এর বেশি কোনো সাড়াশব্দই তার দিক থেকে পাওয়া যাচ্ছে না।
মার্চের নয় তারিখ। মিহি ছাইয়ের মতো আস্তরণটা এখন চারদিকেই প্রচুর পরিমাণে পড়তে লাগল। পড়ছে তো পড়ছেই, এর বিরাম নেই। আবার বারে অন্তরালটা ওপরে উঠতে উঠতে সুবিশাল ও সীমা পরিসীমাহীন জলপ্রপাত আকাশচুম্বী কোনো প্রাচীর ডিঙিয়ে চুপিচুপি সমুদ্রে আছড়ে পড়ছে। এ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে এর তুলনা করা অন্তত আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। একেবারেই নিঃশব্দে। সুবিশাল একটা পর্দা পুরো দক্ষিণ দিগন্তে ছড়িয়ে পড়েছে। সম্পূর্ণ নিঃশব্দে সবকিছুই ঘটে চলেছে।
মার্চের একুশ তারিখের কথা বলছি–আজ আমাদের মাথার ওপরে বিষণ্ণ অন্ধকারের পর্দা চাঁদোয়ার মতো অবস্থান করছে। দুধের মতো সাদা সমুদ্রের জলরাশির ভেতর থেকে একটা লকলকে আগুনের শিখা যেন আমাদের শাতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে চলেছে। একটা ব্যাপার আমাদের যারপরনাই বিস্ময়ে অভিভূত করছে, ছাইয়ের মতো মিহি গুঁড়োগুলো বাতাসে ভেসে শাতির ওপর আর আমাদের গায়ে পড়ে পড়ে অনবরত জমা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের বিস্ময় উৎপাদনকারী ব্যাপারটা হচ্ছে, সে গুঁড়োগুলোই পানি পড়ামাত্র গলে একাকার হয়ে যাচ্ছে।
যতই অবাক হই না কেন, আমরা কিন্তু খুবই দ্রুত গতিতে অনবরত সেদিকে ছুটে চলেছি।
রাতের অন্ধকার মিলিয়ে গিয়ে ক্রমে ভোরের আলো ফুটে উঠল। বাইশে মার্চের সকাল। রাতের অন্ধকার মিলিয়ে গেলেও আগেকার সে অন্ধকার পর্দাটা যেন ক্রমে গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে পড়তে লাগল। তবে পানির স্বচ্ছ উজ্জ্বলতার ছোঁয়া লাগায় সে অন্ধকারটাকে আমাদের চোখ দুটো এখন অনেকাংশে বরদাস্ত করে নিয়েছে।
সে পর্দার আড়াল থেকে সাদা পাখির ঝাঁক অনবরত উড়ে আসছে। আর সেই অনাদি অনন্ত কালের ‘টুকেলি-লি! টুকেলি-লি!’ বলে ডাকাডাকি করতে করতে আমাদের চোখের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেছে।
ব্যস, তারপরই শাতির তলায় পড়ে-থাকা জংলি নুনু দেহটা বার-কয়েক তির তির করে নড়েচড়ে উঠল। আমি ব্যস্ত হাতে তার গা স্পর্শ করলাম। চমকে উঠলাম। তার আত্মাও দেহ-খাঁচাটা ছেড়ে উড়ে গেছে।
মুহূর্তের মধ্যেই সে জলপ্রপাতটা দ্বিধা বিভক্ত হয়ে একটা ফাটলের সৃষ্টি করে আমার দিকে ধেয়ে এলো। আর আমরাও দ্রুত ছুটে গিয়ে জলপ্রপাতটার ফাটলটার আশ্রয় নিলাম। কিন্তু ঠিক সে মুহূর্তেই আচ্ছাদিতদেহ একটা মনুষ্যমূর্তি হঠাৎ আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠল। কে সে? কার মুর্তি? সত্যলোকের যে কোনো অধিবাসীর তুলনায় তার আকৃতি অনেক, অনেক বড়। আর তার গায়ের রং বরফের মতো ধবধবে সাদা।
ফিলজফি অব ফার্নিচার
গৃহসজ্জার ব্যাপার-স্যাপারে ইংরেজদের পারদর্শিতার জুড়ি নেই। কেবলমাত্র গৃহসজ্জার কথাই বা বলি কেন? বাড়ির বাইরের দিককার স্থাপত্য শিল্পের ক্ষেত্রেও তাদের রুচিবোধ বাস্তবিকই তুলনাবিহীন। তাদের স্থাপত্যকীর্তি বিস্ময় উৎপাদনের ক্ষমতা রাখে, সন্দেহের তিলমাত্রও অবকাশ নেই।
ইতালিয়ানরা বাড়িঘর সাজানোর ব্যাপারে রঙের বাহারও শ্বেতপাথরের কারুকার্যকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে। এ কাজে রঙ আর শ্বেতপাথর ছাড়া অন্য কোনো কিছুর গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে বলে তারা বিশ্বাসই করে না।
ফরাসিদের শিল্পরুচি কিন্তু সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র প্রকৃতির। প্রকৃত ভালো জিনিস কোনটি এ-সম্বন্ধে সম্যক ধ্যান-ধারণা তাদের আছে। আর ভালো জিনিসের দাম দিতেও তারা। জানে। অতএব তারা সেভাবেই ঘরদোর সাজিয়ে-গুছিয়ে মনলোভা করে তোলে। মাত্রাতিরিক্ত কোনোকিছু করতে তারা অভ্যস্ত নয়, জানেও না।
চাষারা এবং অধিকাংশ প্রাচ্যজাতি, ঘরদোর সাজাবার ব্যাপারে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাত্রা বজায় রাখতে পারে না। কাজে নেমে তারা প্রায়ই এমনকিছু অতিরিক্ত কাজ করে ফেলে, যার মধ্যে বাড়াবাড়িই নজরে পড়ে।
আর স্কটল্যান্ডবাসীরা? ঘরদোর সাজাবার যে একটা ব্যাপার থাকতে পারে, এ সম্বন্ধে কোনো ধারণাই তাদের নেই। মোদ্দাকথা, অগোছালো ঘরেই তারা হাসিমুখে জীবন কাটিয়ে দেয়।
এবার ওলন্দাজদের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক। তারা অনিশ্চয়তা রোগের শিকার হয়ে প্রতিনিয়ত ধুকছে। তাদের মতে, বাঁধাকপি আর দরজা-জানালার পর্দার মধ্যে কোনো ফারাক আছে কিনা, সে সিদ্ধান্তে পৌঁছতেই তারা হিমসিম খেয়ে যায়। শেষপর্যন্ত হতাশ হয়ে তারা হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
আর স্পেনের মানুষরা? তারা ঝোলাঝুলিতেই বেশি অভ্যস্ত। ঘরদোরের ভেতরে এখানে-ওখানে তারা পর্দা ঝুলিয়েই যারপরনাই তৃপ্তি পায়।
