শালতিটার অবস্থা খারাপ দেখে আমরা চলতি অবস্থাতেই সেটাকে তাপ্লিতুপ্পি। দিয়ে একটু পোক্ত করে নিতে গেলাম। ব্যস্ত-হাতে কাজ চালিয়ে মাস্তুল বসিয়ে দেওয়া হল। এবার তাতে বেঁধে দিলাম ছোট একটা পাল।
দক্ষিণ-পূর্বদিকে পৎপৎ করে পতাকা উড়তে লাগল। অনুকুল বাতাস লাগায় আমাদের শাতিটা এবার উল্কার বেগে ধেয়ে চলল।
সমুদ্র শান্ত। কুয়াশার চিহ্নও নেই। এমনকি নিকট বা কাছে বরফের চিহ্নও নজরে পড়ছে না।
আমাদের সমুদ্র কচ্ছপ তিনটির মধ্যে বড় কচ্ছপটাকে কাটাকাটি করে তার ভেতর থেকে প্রচুর মাংসই কেবল নয়, পানিও পাওয়া গেল।
কচ্ছপের মাংস দিয়ে পেটের জ্বালানিভিয়ে আমরা আবার দক্ষিণ দিকে শাতি চালিয়ে দিলাম।
পয়লা মার্চের সকাল। ঝকমকে সকাল। বহু সাধারণ ঘটনা থেকে আমাদের মনে হতে লাগল, আমরা নতুনতর ও বিস্ময়কর এক জগতে হাজির হয়েছি।
দক্ষিণ দিগন্তে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে প্রতিনিয়ত একটা হালকা বাষ্পের উঁচু স্তর দেখা যেতে লাগল। আর থেকে থেকে একটা আলোকচ্ছটা পূর্ব থেকে পশ্চিমে ধেয়ে চলে যেতে লাগল। আবার কখনও বা সেটা বিপরীতমুখি অর্থাৎ পশ্চিম থেকে পূর্বে ছুটে চলল।
আমার বুঝতে দেরি হলো না। আলোকচ্ছটার ব্যাপারটা আরোরা বেরিয়ালিস এর খেলা ছাড়া কিছু নয়। আর একটা ব্যাপার আমার দৃষ্টিতে ধরা পড়ল, সমুদ্রজলের তাপমাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। আর পানির রঙেরও পরিবর্তন ঘটছে। দুটো ব্যাপারই আমার মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করল।
২ মার্চ। বন্দি-জংলিটাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার মুখ থেকে ছেড়ে আসা মরণফাঁদ দ্বীপটা সম্বন্ধে বহু তথ্যই আদায় করতে পারলাম। তবে এখন আর সে পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে ফয়দাই বা কি? কেবলমাত্র এটুকু বললেই চলবে, দ্বীপখণ্ডটা আটটা দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। আর সব কটাই একই রাজার দ্বারা শাসিত হচ্ছে। সালেমন তার নাম।
সে সব দ্বীপের বাসিন্দারা চামড়ার ডোঙা ছাড়া অন্য কোনোকিছু দিয়ে ডোঙা তৈরির কৌশল জানে না। আর বড় যানের মধ্যে সম্বল ছিল এ শালতি চারটি। দক্ষিণ পশ্চিমের কোনো বড় দ্বীপ থেকে হঠাৎ ভাসতে ভাসতে এদিকে চলে এসেছিল। এখানকার দ্বীপবাসীদের চোখে পড়ে যাওয়ায়, তারা সেগুলোকে ধরে নিজেদের কাজে লাগাতে থাকে।
বন্দি জংলিটাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আর যা-কিছু জানতে পারলাম তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য তথ্য হচ্ছে–আমরা সে দ্বীপটাকে ছেড়ে এসেছি সেটার নাম ‘সালাল’। আর বন্দির নিজের নাম নু-নু। না, থাক, ওসব কথা বলে মিছে সময় নষ্ট করতে চাই না।
মার্চের তিন তারিখ। আজ লক্ষ্য করলাম, পানির তাপমাত্রা সত্যি বেশ বেড়ে গেছে। তার রঙও ক্রমেই বদলে যাচ্ছে। অবাক হবার মতো ঘটনাই বটে।
আরও অবাক হলাম সামান্য এগিয়ে লক্ষ্য করলাম, শান্ত সমুদ্রের বুকে হঠাৎ কিছুটা জায়গা জুড়ে ঘূর্ণি পাক–উত্তাল উদ্দাম অবস্থা।
মার্চের চার তারিখ। আজ হঠাৎ উত্তরের বাতাস বয়ে গেল। ফুল প্যান্টটাকে গুটাবার সময় জ্যাকেটের পকেট থেকে সাদা একটা রুমাল বার করি। আমার প্রায় গা ঘেঁষে নুনু বসে। বাতাসে উড়ে হঠাৎ রুমালের কোণটা তার নাকে লেগে যাওয়া মাত্র রীতিমত স্তম্ভিত হয়ে যাবার মতো ব্যাপার ঘটে গেল। নুনু মুখে বার কয়েক বিশি রকম গোঁ-গোঁ আওয়াজ করল। পরমুহূর্তেই ভয়ানক খিচুনি শুরু হয়ে গেল। তার মাটিতে লুটিয়ে পড়ে প্রায় সংজ্ঞাহীন অবস্থায় জড়ানো গলায় অনবরত ‘টুকেলি-লি! টুকেলি-লি, বলতে লাগল।
পাঁচই মার্চ। বাতাসের বেগ কমতে কমতে আজ একেবারেই কমে গেল। তীব্র স্রোতের টানে আমাদের শাতিটা উল্কার বেগে দক্ষিণ দিকেই দ্রুত এগিয়ে চলল।
আমার কেবলই মনে হতে লাগল, যে কোনো মুহূর্তে আমরা বুঝি বিপদের সম্মুখীন হতে পারি। কিন্তু আমরা আশঙ্কা অনুযায়ী সে রকম কিছুই ঘটল না। ডার্ক পিটার্সের মুখের দিকে নজর ফিরিয়ে তেমন কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম না। তবে এমন একটা ভাব তার মুখে লক্ষ্য করলাম, যা দেখে আমি নিজের বুদ্ধি বিবেচনার দ্বারা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারলাম না।
আমার স্পষ্টই মনে হতে লাগল, মেরু শীত আর বেশি দূরে নয়। কিন্তু তার কষ্টদায়ক পরিস্থিতি অনুভূত হচ্ছে না। শরীরও মনে কেমন যেন অসারতা বোধ হতে লাগল, সামান্য তন্দ্রাচ্ছন্ন বোধ করলাম। ব্যস, এটুকুই।
মার্চের ছয় তারিখ। ধোয়াটে বাষ্পের আস্তরণটা ওপরে উঠতে উঠতে অনেকটা ওপরে উঠে এসেছে। ক্রমেই ফ্যাকাশে হতে হতে সে ধোঁয়াটে রংটাও অনেকটা হালকা হয়ে গেছে। এত গরম হয়ে গেছে যে হাত পর্যন্ত ছোঁয়ানো যাচ্ছে না। আর সাদাটে ভাবটাও অপেক্ষাকৃত গাঢ় হয়ে এসেছে।
আরও কিছুটা এগোতেই শালতির একেবারে কাছাকাছি পানির তোলপাড়ানি নজরে পড়ল। আর তার সঙ্গে বাষ্পের ওপরের দিকটাও অস্বাভাবিক রকম জ্বলে উঠল। বাষ্পের আগুন নিভে যাওয়ার পর আর পানির তোলপাড়ানি বন্ধ হয়ে গেল। ছাইয়ের মতো সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম সাদাটে গুঁড়ো কিছুটা শাতিতে আর পানির অনেকটা জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল।
বন্দি-জংলি নুনু শালতিতে উপুড় হয়ে পড়ে থাকল। আমরা টানাটানি করে কিছুতেই তাকে ওঠাতে পারলাম না। সে শালতির কাঠ আঁকড়ে পড়ে রইল।
মার্চের সাত তারিখ। আমরা নুনু-কে বার বার জিজ্ঞাসা করলাম, তার দ্বীপবাসী জাতভাইরা কেন আমাদের সঙ্গিদের মেরে সাবাড় করে দিতে উঠে পড়ে লেগেছিল? কিন্তু শত চেষ্টা করেও তার কাছে থেকে আমাদের বাঞ্ছিত উত্তরটা পেলাম না। ভয়ে শিটকে লেগে সে শাতিটার তলায়ই পড়ে থাকল।
