সে শালতিটা যে কতদূরে রয়েছে সে সম্পর্কে আমাদের ধারণা না থাকলেও আমরা নিঃসন্দেহ যে, এতে সাফল্য লাভ করতে পারলেই পিতৃদত্ত প্রাণটাকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। আর তা যদি সম্ভব না হয় তবে নরবলির শিকার হওয়ার হাত থেকে আমাদের রক্ষা করার ক্ষমতা কারোরই নেই।
একদিকে আমরা সাধ্যমত দ্রুতগতিতে শাতি চালাতে লাগালাম, আর অন্য দিকে অসভ্য জংলিরাও লম্বা লম্বা পা ফেলে তার চেয়ে দ্রুত এগিয়ে চলল।
না, শেষ রক্ষা করতে পারলাম না। আমাদের চেয়ে দ্রুত গতিতে পা চালিয়ে একাধিক জংলি যথাস্থানে পৌঁছে শালতিটা দখল করতে গেলে অতর্কিতে ডার্ক পিটার্সের হাতের পিস্তল থেকে গুলি ছিটকে বেরিয়ে জংলিদের একজনের মাথার খুলিটা দিল উড়িয়ে। সে চোখের পলকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল।
বেগতিক দেখে অন্য জংলিটা প্রাণের মায়ায় উদ্ধশ্বাসে ছুটে পালিয়ে গেল।
জংলিদের বাকি দলদলটা তখনও শাতিটা থেকে বিশ-ত্রিশ কদম দূরে রয়েছে।
আমরা উল্কার বেগে ধেয়ে গিয়ে শালতিটার দখল নিয়ে নিলাম। ব্যস, আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে আমরা ব্যস্ত হাতে দাঁড় চালাতে লাগলাম।
মৃত্যুভয় অগ্রাহ্য করে জংলিদের মধ্য থেকে দুজন পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সাঁতরে এগিয়ে এসে শালক্টিা ধরে ঝুলতে লাগল। আমরাও পরিস্থিতি খারাপ দেখে কোমর থেকে ছুরি বের করে অদ্ভুতভাবে ঝুলে-থাকা জংলি দুটোকে পরপারে পাঠিয়ে দিলাম।
হায়! এ কী মহাসমস্যা। অসভ্য জংলিদের কবল থেকে দেখছি কিছুতেই অব্যাহতি পাওয়া যাবে না। জংলিদের একটা বিশাল দল হৈ-হল্লা করতে করতে উধশ্বাসে আমাদের অনুসরণ করতে লাগল।
উপায়ান্তর না দেখে ডার্ক পিটার্স বুদ্ধি করে বন্দুকের বেয়নেটের আঘাত হেনে হেনে দ্বিতীয় শাতিটার দাঁড়গুলো, গলুই আর একটা দিক ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলল। এভাবে সেটাকে পুরোপুরি ব্যবহারের অনুপযোগি করে দিয়ে আমরা ব্যস্ত। হাতে দাঁড় টেনে টেনে বার সমুদ্রে পৌঁছে গেলাম।
আমরা তখনও ক্রোধোন্মত্ত অসভ্য জংলিদের তর্জন-গর্জন বাতাসবাহিত হয়ে আমাদের কানে পৌঁছতে লাগল। আমরা দাঁড় টানার ফাঁকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, ভাঙা শালতিটার পাশে দাঁড়িয়ে তারা বিশ্রি অঙ্গভঙ্গি করে আমাদের লক্ষ্য করে বিকট স্বরে চিল্লাচিল্লি করছে।
সমূহ বিপদের হাত থেকে এখনকার মতো অব্যাহতি পাওয়া গেল বটে। কিন্তু আমাদের ভবিষ্যত কুয়াশার আস্তরণে মোড়া। এখন অসভ্য জংলিদের চারটি শালতির মধ্যে একটা দখল আমরা নিয়েছি। দ্বিতীয়টা ডার্ক পিটার্সের বন্দুকের বেয়নেটের আঘাতে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। আর বাকি দুটো আমাদের জাহাজ জেন গাইের বিস্ফোরণের ফলে গুড়ো গুড়ো হয়ে গেছে–খবরটা আমাদের বন্দি জংলিটার মুখ থেকে জানতে পারলাম।
জংলিদের এখন একমাত্র ভরসা ডিঙিগুলো। তারা নির্ঘাৎ সেগুলো নিয়ে আমাদের পিছু নেবে। এখান থেকে মাইল তিনেক দূরে সেগুলো রয়েছে–এও বন্দি জংলিটার মুখ থেকেই শোনা। তাই তারা এখানে পৌঁছাবার আগেই আমাদের ঐ দ্বীপ থেকে অবশ্যই বহু দূরে চলে যাওয়া চাই-ই চাই।
কেবলমাত্র আমরা দুজনই নয়, বন্দি-জংলিটার হাতেও বৈঠা দিয়ে জোরসে চালাবার জন্য বার বার তাড়া দিতে লাগলাম। আধঘণ্টা একনাগাড়ে বৈঠা চালাবার পর আর পাঁচ-ছয় মাইল দক্ষিণে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, বেশ কয়েকটি ডিঙি নৌকা আমাদের অনুসরণ করার জন্য তৎপরতার সঙ্গে উপসাগর থেকে বেরোচ্ছে। আর কিছুটা এগিয়ে এসে অনুসরণকারী জংলিরা দেখল, আমরা বার-সাগরে পড়ে গেছি। তারা হতাশ দৃষ্টিতে আমাদের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে থমকে ডোঙা দাঁড় করিয়ে দিল।
আমরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। দ্রুত বৈঠা চালিয়ে আমরা তীর থেকে দূরে বহুদূরে চলে গেলাম। এবার ঢেউয়ের হাতে নিজেদের ভবিষ্যৎ ছেড়ে দিলাম।
.
২৪. ॥ চতুর্বিংশ অধ্যায় ॥
আমাদের সেদিনকার কাণ্ডকারখানার কথা ভাবলে আজ নিজেই বিশ্বাস করতে উৎসাহ পাই না। এও কি কাউকে বিশ্বাস করানোর মতো কথা, সাধারণ একটা শালতি চেপে আমরা তিনটি প্রাণী দক্ষিণ মেরু সাগরের বুকেনির্বিবাদে এগিয়ে চলেছি।
এখন আমাদের সঙ্গে খাবার বলতে সম্বল মাত্র তিনটি কচ্ছপ।
এদিকে আর এক আতঙ্কের ব্যাপার–মেরুবৃত্তের দীর্ঘ শীতঋতু। সে-ও প্রায় আমাদের শিয়রে পৌঁছে গেছে। অতএব আমাদের ব্যাপারটা নিয়ে ভাবনা চিন্তা করা অবশ্যকর্তব্য, কোন পথে কোন, দিকে অগ্রসর হব।
আমার অদৃষ্ট সম্বল করে ঢেউয়ের তালে তালে ভেসে চলেছি। পথ পাড়ি দিতে গিয়ে ইতিমধ্য ছয়-সাতটা একই চরিত্রের দ্বীপ আমাদের দৃষ্টিতে ধরা পড়ল। একটা থেকে অন্যরা পাঁচ-ছয় লীগ দূরে অবস্থান করছে।
অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা মনে করতেই আমাদের কোনো দ্বীপেই শালতি ভেড়াতে সাহসে কুলাল না। উত্তর দিক থেকে এতটা পথ পাড়ি দিতে গিয়ে যে ভয়ঙ্কর বিপদসঙ্কুল বরফের এলাকা পেরিয়ে এখানে হাজির হয়েছি আবার যদি সে পথেই ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করি তবে নিতান্তই বোকামি করা হবে। তাই একটা মাত্র পথই অবলম্বন করার মতো রয়েছে–দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যাওয়া। অনন্যোপায় হয়ে আমরা এ-সিদ্ধান্তই নিলাম। বলা তো যায় না, পথে অন্য কোনো দেশ আর অধিকতর। মনোরম আবহাওয়া পেলেও পেতে পারি।
ইতিপূর্বে দক্ষিণ মেরু অঞ্চলের ওপর দিয়ে পথ পাড়ি দিতে গিয়ে ঝড় তুফানমুক্ত মনোরম আবহাওয়া পেয়েছি। কিন্তু সামান্য একটা শাতি সম্বল করে আমরা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে চলেছি, তার ওপরে ওটার অবস্থাও মোটেই নির্ভরযোগ্য নয়।
