খাদ্য। খাদ্য। একমাত্র খাদ্যই আমাদের সর্বক্ষণের চিন্তা হয়ে দাঁড়াল। ডার্ক পিটার্সের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম, যে করেই হোক, মাইল দেড়েক পথ পাড়ি দিয়ে আমরা সাগরের ধারে যাবই।
পাহাড়ের ওপরের গোপন মাথাগোঁজার জায়গাটা থেকে উঁকি ঝুঁকি মেরে বহুবার দেখেছি, সমুদ্রের পাড় ঘেঁষে প্রায়ই বহু কচ্ছপ ঘোরাফেরা করে। একটাকে ঘায়েল করতে পারলে অন্তত দিন কয়েকের জন্য খাদ্যাভাব দূর হবে।
এরকম দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা পাহাড়ের গায়ের মাটি আর পাথরের স্তূপ আর ঝোঁপঝাড়ের আড়াল দিয়ে দিয়ে অত্যন্ত সন্তর্পণে পথ পাড়ি দিতে লাগলাম।
ঘটনাটা একেবারেই আচমকা ঘটে গেল একটা বাঁক ঘুরতেই পিছনের একটা গুহা থেকে শিকারি পশুর মতো পাঁচজন জংলি হঠাৎ আমাদের আক্রমণ করে বসল। আমরা ব্যাপারটা ভালোভাবে বোঝার আগেই জংলিদের একজনের গদার আঘাতে ডার্ক পিটার্স বিকট আর্তনাদ করে হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। এবার সবাই তাকে নিয়ে ব্যস্ত হল।
সবাই ডার্ক পিটার্সের দিকে মন দেওয়ায় আমি আকস্মিক পরিস্থিতিটাকে একটু সামলে নেবার ফুরসৎ পেলাম।
আমার জ্যাকেটের দু-পকেটে দুটো পিস্তল তাদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। যন্ত্রচালিতের মতো দু-পকেটে হাত চালান করে দিয়ে তাদের বের করে আনলাম। দু হাতে দুটোকে শক্ত করে ধরে লড়াকু জংলিদের ওপর আক্রমণ চালাতে লাগলাম।
দু-দুটো তাজা গুলি ক্রোধোন্মত্ত দুটো জংলির বুকে গেঁথে দিলাম। তৃতীয়জন ডার্ক পিটার্সকে লক্ষ করে বর্শা ছোঁড়ার চেষ্টা করতেই পিস্তল থাকা সত্ত্বেও সে নিজের দৈহিক শক্তিকে ব্যবহার করল। ঝট করে নিহত জংলিদের একটা গদা কুড়িয়ে নিয়ে প্রথমে বর্শাধারীকে এবং পরমুহূর্তে অন্য দুজনকে গদার আঘাতে ধরাশায়ী করে ফেলল।
আমরা যে এত সহজে শয়তানগুলোকে সাবাড় করে দিতে পারব ভাবতেই পারিনি। জয়ের আনন্দটুকু ভাগাভাগি করে উপলব্ধি করার সুযোগই পেলাম না। হঠাৎ বহু জংলির মিলিত কণ্ঠস্বর, চিৎকার চাচামেচি বাতাসবাহিত হয়ে আমাদের কানে এলো।
ব্যাপারটা বুঝতে দেরি হলো না। পিস্তলের আওয়াজে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে উৎসস্থল অনুমান করে জংলিরা ক্রোধে ফুঁসতে ফুঁসতে ছুটে আসছে।
আমরা ধরা পড়ে যাবার আতঙ্কে মুষড়ে পড়ার জোগাড় হলাম। পাহাড়ের দিকে। ছুটে পালাতে গেলে জংলিদের দিকেই যেতে হবে। আবার যদি নিচের দিকে নেমে যেতে চেষ্টা করি তবেও তাদের চোখে পড়ে যাবার সম্ভাবনা কম নেই। এখন উভয়। সঙ্কটে পড়ে আমরা বাঁচার পথ হাতড়াচ্ছি; ঠিক সে মুহূর্তেই আমার গুলির আঘাতে সে মারা গেছে ভেবেছিলাম। কিন্তু কয়েক কদম যেতে না যেতেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করল। কিন্তু কয়েক কদম যেতে না যেতেই আমরা তাকে জাপ্টে ধরে ফেললাম।
আমি তাকে খতম করে ফেলতেই চেয়েছিলাম। ডার্ক পিটার্স বাধা দিল। তাকে জিইয়ে রাখার কারণ সম্বন্ধে সে বলল–শয়তানটাকে ধরে আমাদের ডেরায় নিয়ে যেতে পারলে তার সাহায্যে আমাদের এখান থেকে কেটে পড়ার উপায় জেনে নেওয়া যাবে। উদ্ধার পাওয়া সহজ হবে।
আমরা গুলি করার ভয় দেখিয়ে তাকে ঠাণ্ডা রাখলাম। সে গোবেচারির মতো আমাদের নিরাপদ পথে সমুদ্রের দিকে নিয়ে চলল। আশ্চর্য ব্যাপার। মিনিট কয়েকের। মধ্যেই সে যেন আমাদের পুরোপুরি অনুগত ভৃত্য বনে গেল।
আমরা পথ প্রদর্শক জংলিটার নির্দেশিত পথে বন-পাহাড় অতিক্রম করে উৰ্দ্ধশ্বাসে ছুটতে ছুটতে সমুদ্রের কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম।
সেখান থেকে সমুদ্রের দূরত্ব আর মাত্র দুশ গজের মতো। এমন সময় নজরে পড়ল দ্বীপের বিভিন্ন দিক থেকে ক্রোধোন্মত্ত জানোয়ারের মতো গর্জন করতে হাজার হাজার অসভ্য জংলি আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে।
প্রাণভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ফিরে যাব মনস্থ করে ঘুরে দাঁড়াতেই, বিশালায়তন একটা পাথরের আড়ালে একটি শালতি গলুই নজরে পড়ল। প্রাণের মায়ায় আমরা সেদিকেই উধশ্বাসে ছুটতে লাগলাম।
ছুটতে ছুটতে কাছে গিয়ে দেখি, একটা নয়, দু-দুটো শালতি গাছে বেঁধে রাখা হয়েছে। আর সে দুটো একেবারেই অরক্ষিত। আরও কিছুটা এগিয়ে গিয়ে দেখি, ছয়টা দড়িদড়ার গোছা আর দুটো কচ্ছপ ছাড়া আর কিছুই নেই। চারদিকে অনসুন্ধিৎসু নজরে তাকিয়ে জংলিদের চিহ্নমাত্রও নজরে পড়ল না।
আর ভালো-মন্দ চিন্তা না করে আমরা দুজন ঝটপট একটা শালতিতে উঠে বসলাম। বন্দি-জংলিটাকেও জোর জবরদস্তি তুলে নিলাম। এবার উভয়ে সর্বশক্তি নিয়োগ করে সেটাকে সাগরে ভাসিয়ে দিলাম। শয়তান জংলিটা বার কয়েক হাত পা ছোঁড়াছুড়ি করে কোনো ফয়দা হবার নয় ভেবে মুখ গোমড়া করে নিতান্ত অনুগতের মতে, বসে রইল।
হায়! হায় ঈশ্বর! বিপদ যে কিছুতেই আমাদের পিছন ছাড়ে না। তীর ছেড়ে মাত্র পঞ্চাশ গজ এগোতে-না-এগোতেই মর্মে মর্মে বুঝতে পারলাম, অন্য শাতিটাকে ওখানে ফেলে এসে কী ভুলই না আমরা করেছি।
আমরা পরিষ্কার দেখতে পেলাম, ক্রোধোন্মত্ত জানোয়ারের মতো তর্জন গর্জন করতে করতে অসভ্য জংলিরা সে শালতিটার দিকে সাধ্যাতীত দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে। আমাদের তুলনায় দ্বিগুণ তাদের গতি।
এখন চরমতম পরিস্থিতিতে আমাদের আত্মরক্ষার উপায় একটাই, একটা মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে যে কোনো উপায়ে তাদের আগেই সেখানে হাজির হয়ে ফেলে আসা শাতিটার দখল নেওয়া।
