বাদামগুলো আর পাখিটাকে আস্তানায় রেখে আমরা এবার ডালপালায় ফাটলের মুখটা বন্ধ করে দিয়ে ঝোঁপঝাড়ের আড়াল দিয়ে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে চললাম। আমাদের জাহাজটার পরিস্থিতি একবারটি নিজের চোখে দেখার জন্য মন দারুণ ছটফট করছে।
সমুদ্রের ধারে পৌঁছেই দেখতে পেলাম, অসভ্য জংলিরা জাহাজটাকে ভাঙাচোরার কাজ মিটিয়ে ফেলেছে। এবার আগুন ধরাবার তোড়জোর চলছে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে জাহাজের ভেতর দিয়ে ধোয়ার রাশি কুণ্ডলি পাকিয়ে পাকিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে ওপরে উঠে যাচ্ছে।
জাহাজের দড়িদড়া, পাল, মাস্তুলের যা-কিছু ছিল এক এক করে সবই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যেতে লাগল।
জাহাজের চারদিকে শালতিতে যে অসভ্য জংলি ভিড় করে হৈ-হল্লা করছে তাদের সংখ্যা কম হলেও হাজার দশেক তো হবেই।
আমরা গোপন অন্তরাল থেকে জাহাজটার দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে থাকলাম, ভাবলাম যে কোনো মুহূর্তে জাহাজে ভয়ঙ্কর একটা কিছু ঘটে যাবে, আশঙ্কায় আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম।
এমন সময় জাহাজের ভেতর থেকে ঘনকালো মেঘের মতো ধোঁয়ার কুণ্ডুলি– আগুনের হল্কা পর মুহূর্তেই আচমকা ভয়ঙ্কর একটা বিস্ফোরণ। আগুন, পোড়াকাঠ, ছাই আর মানুষের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ছিন্ন বিচ্ছিন্ন টুকরা চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। সে এক রীতিমত নারকীয় দৃশ্য।
অসভ্য জংলিগুলো জাহাজটা ধ্বংসের মধ্য দিয়ে তাদের চক্রান্তের প্রাপ্য ফল হাতে-নাতে পেয়ে গেল। সে বিস্ফোরণে হাজার খানেক অসভ্য জংলি নির্মমভাবে মৃত্যুর শিকার হলো আর কতজন যে বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ল তার ইয়ত্তা নেই।
জংলিদের মধ্যে যারা জীবিত রইল তারা আকস্মিক বিপদের আশঙ্কায় এমন হকচকিয়ে গেল যে কেউ-ই আহত পল্লীবাসীদের সাহায্য করতে এগিয়ে এলো না। আর তাদের মধ্যে অভাবনীয় একটা পরিবর্তন ঘটে গেল। আতঙ্কে অবোধ্য ভাষায় চিৎকার করতে করতে গভীর জঙ্গলের দিকে ছুটে পালাল।
জংলিদের বড় একটা দলকে এরই মধ্যে জঙ্গলে ঢুকতে দেখা গেল। কতকগুলো কাঠের খোটা নিয়ে একটু পরেই তারা বেরিয়ে এলো।
একটু পরেই দেখলাম, আঠারোই জানুয়ারি লাল দাঁতের পাটি আর বড় বড় নখযুক্ত যে বিচিত্র জানোয়ারটাকে আমরা জাহাজে তুলে নিয়েছিলাম তার মৃত দেহটা জঙ্গলের এক জায়গায় পড়ে রয়েছে, আর জংলিরা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে তার কাছে গেল। দেখতে দেখতে সেটাকে ঘিরে ভিড় জমে গেল।
ক্যাপ্টেন গাই ঘর বোঝাই করে জানোয়ারটাকে যথোপযুক্ত সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এটাকে ইংল্যান্ডে নিয়ে যাবেন।
প্রচণ্ড বিস্ফোরণটা ঘটায় জানোয়ারটা হয়তো ছিটকে এখানে এসে পড়েছে। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু কথা হচ্ছে, এটাকে নিয়ে জংলিদের এত কৌতূহলই বা কেন?
লক্ষ্য করলাম, কেউই জানোয়ারটার কাছাকাছি যেতে সাহস পাচ্ছে না। দূরে, অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সবাই জানোয়ারটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল।
জংলিরা একটু বাদে জঙ্গলের গভীর থেকে নিয়ে আসা খোঁটাগুলোকে জানোয়ারটার চারিদিকে বৃত্তাকারে পুঁতে দিয়ে ব্যস্ত পায়ে দ্বীপের ভেতরে, জঙ্গলের দিকে চলে গেল। সবাই গলা ছেড়ে বলতে লাগল ‘টেকেলি-লি! টেকিলি-লি! টেকেলি লি!
মিনিট কয়েকের মধ্যেই তারা ঝোঁপ ঝাড়ের আড়ালে চলে গেল। একটু পরেই তাদের কণ্ঠস্বরও আর শোনা গেল না।
.
২৩. ॥ ত্রয়োবিংশ অধ্যায় ॥
বিচিত্র জানোয়ারটাকে নিয়ে অসভ্য জংলিদের কৌতূহলের ব্যাপার স্যাপার ঘটার পর আমরা পাহাড়ের ওপরের গোপন আশ্রয়স্থানেই আরও সাতটা দিন অবস্থান করি। তবে মাঝে-মধ্যে অত্যন্ত সতর্কতা বজায় রেখে খাদ্য ও পানীয়, কাঠ-বাদাম আর ঝর্ণার পানি আনতে আস্তানার বাইরে বেরোই।
আমরা শুকনো ঘাস-পাতা জড়ো করে আগুন জ্বালি। মওকা মতো পাখিটা পেয়ে যাওয়ায় খুবই সুবিধা হয়ে গেছে। তবে তার মাংস একটু-আধটু শক্ত হলেও খেতে খুবই সুস্বাদু।
গিরিখাতের কাছে গিয়ে আরও তিনটি পখির দেখা পেলাম। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, তাদের একটাকেও শিকার করা গেল না। আসলে তারা মাটিতে না নামার জন্যই তাদের ধরা সম্ভব হয়নি।
কয়েকের দিনের মধ্যেই আমাদের খাদ্যের অভাব দেখা দিল। তা ছাড়া একনাগাড়ে আর কতদিনই বা কাঠ বাদাম খেতে ভালো লাগে। তাই খাদ্যের সমস্যা মেটাবার জন্য আমরা দুজনে আলোচনার মাধ্যমে স্থির করলাম, করাত ঠুকে নিচে নেমে যাব।
আমরা পরিকল্পনা অনুযায়ী গোপন আস্তানাটা থেকে নিচে নামার জন্য সতর্কতার সঙ্গে ঝোঁপঝাড়ের আড়াল দিয়ে নিচের দিকে কিছুটা পথ নেমে যেতেই অদূরে জংলিদের কণ্ঠস্বর কানে এলো। আমরা প্রমাদ গুণলাম। লম্বা-লম্বা পায়ে উঠে এসে আবার আস্তানায় মাথা গুঁজলাম। ভাগ্যের জোরেই তাদের হাতে ধরা পড়ে বেঘোরো প্রাণ খোয়াবার হাত থেকে রেহাই পেয়ে গেছি।
কিন্তু এভাবে তো আর পেটে কিল মেরে দিনের পর দিন কাটিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এখন উপায়?
আমরা চিন্তা করে দেখলাম, পাহাড়ের ওপর থেকে নিচে নামতে না পারলে কিছুতেই বাঁচা সম্ভব নয়। ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় বাদাম চিবালেও বাদামের যোগান তো অচিরেই একদিন বন্ধ হয়ে যাবে। এখনই বহু খোঁজাখুঁজি করে দুদশটার বেশি মেলে না। এরপর তো ঝর্ণার পানিই একমাত্র সম্বল হয়ে দাঁড়াবে।
এক বিকেলে আমরা ঝুপড়িটা থেকে বেরিয়ে খাদ্যের খোঁজে ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেকখানি পথ পাড়ি দিয়ে ফেললাম। ভয় হচ্ছিল, যদি পথ হারিয়ে অন্য দিকে চলে যাই, আস্তানায় ফিরতে না পারি তবেই কেলেঙ্কারি চূড়ান্ত হয়ে যাবে। মাথার চারদিকে হাজারো দুশ্চিন্তা আর হতাশা ভিড় করে থাকলেও বিকেলের পড়ন্ত রোদে এদিকটার পাহাড় আর অজানা অদেখা বিচিত্র সব গাছগাছালি ও লতাগুল্মই কেবল নয়, পাখি পাখালিও আমাকে কম মুগ্ধ করল না। গাছের ডালে ডালে হরেক রং ও আকৃতিবিশিষ্ট পাখি ঘুরে বেড়ালেও আমরা বহু চেষ্টা করে একটাকেও ঘায়েল করতে পারলাম না। আসলে পাথর ছুঁড়ে গাছের পাখিকে নামানো বড়ই কঠিন সাধ্য ব্যাপার। সবচেয়ে বড় সমস্যা আমাদের হাত অ-পটু। জংলিদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে আমাদের তুলনা বিন্দুমাত্র চলে না।
