অসভ্য জংলিরা আমাদের চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে। তারা অবশ্যই মওকা। খুঁজছে ‘জেন’-কে লুঠ করে আমাদের যাবতীয় সম্পত্তি কিভাবে হাতিয়ে নেবে।
উপসাগরের বুকেই হয়তো আমাদের জাহাজটা নোঙর করা অবস্থায়ই রয়েছে। আর আমাদের সঙ্গি, যাদের জাহাজ পাহারা দেবার জন্য মোতায়েন করে এসেছিলাম তারা তো আমাদের এমন চরমতম দুর্গতির কথা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেনি। আর কী বিপদ যে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে তাও তাদের অজানা।
হায় ঈশ্বর। এখন যদি আমরা জাহাজে তাদের পাশে থাকতে পারতাম তবে জাহাজ নিয়ে চম্পট দিতাম, আর মরতে হলে একই সঙ্গে মৃত্যুর শিকার হতাম।
ভাবলাম, এখন পিস্তলের ফাঁকা আওয়াজ করে জাহাজের সহকর্মীদের আমাদের দূরবস্থার কথা জা নিয়ে দিলে হয়তো ভালোই হবে। পরমুহূর্তেই মনে হলো এতে ভালো করতে গিয়ে হয়তো তাদের সর্বনাশই করা হবে।
এবার আমাদের আর একটা ভাবনা, চুপি চুপি উপসাগরে ফিরে গিয়ে জংলিদেরই একটা শালতি নিয়ে সোজা জাহাজে হাজির হওয়া। ব্যস, তারপরই এ মরণ ফাঁদ থেকে চম্পট দেওয়া। না, এ দুঃসাহসিক পরিকল্পনাটাকে বাস্তবায়িত করতে পারা খুবই ক্ষীণ অনুমান করে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাতিল করতেই হল।
আমাদের ঘিরে লতাপাতার ঝোঁপ-ঝাড়ের মধ্যে টু-উইট আর তার সাগরেদরা নির্ঘাৎ ঘাপটি মেরে রয়েছে। তাই নিতান্ত অন্য উপায়ে জঙ্গলের গোপন অন্তরালে আত্মগোপন করে আসন্ন সংঘর্ষ এবং জাহাজটার ধ্বংস মুখ বুজেই দেখতে হবে।
আমরা ঝোঁপের ফাঁক দিয়ে উঁকি-ঝুঁকি মেরে দেখতে লাগলাম, দলে দলে দ্বীপবাসী জংলি ষাট-সত্তরটা শালতিতে হুড়মুড় করে উঠতে শুরু করেছে। তাদের সঙ্গে অস্ত্র বলতে সঙ্গে রয়েছে ইয়া মোটা মোটা কাঠের গদা আর বিভিন্ন আকৃতির পাথরের স্তূপ।
এবার সাধ্যমত দ্রুতগতিতে শালতি চালিয়ে তারা কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আমাদের একমাত্র অবলম্বন জেন-কে ঘিরে ফেলল। জাহাজটার দখল নেওয়াই যে তাদের লক্ষ্য আমাদের তা বুঝতে দেরি হলো না।
আমি তো ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারিনি, জাহাজ রক্ষার জন্য রেখে-আসা নাবিকরা এতগুলো অসভ্য জংলির সঙ্গে লড়াই করে সফল হওয়া তো দূরের ব্যাপার প্রতিরোধের জন্য হাতিয়ারে হাত দেবারই সুযোগ পাবে না।
কিন্তু পরমুহূর্তেই দেখলাম, আমাদের সহকর্মী অসহায় নাবিকরা জাহাজটাকে এগিয়ে নিয়ে গেল। জংলিদের শাতিগুলো বন্দুকের গুলির আওতায় এলে জাহাজ থামল।
কিন্তু হায়। আমাদের সহকর্মীদের মতলব পুরোপুরি ভেস্তে গেল। এর পিছনে কোনো অজ্ঞাত কারণ কাজ করেছে নতুবা আকস্মিক পরিস্থিতির উত্তেজনা ও ব্যস্ততার জন্য তারা ব্যর্থ হয়েছে।
সত্যি ব্যাপারটা ভাববার মতোই বটে। একটা শালতির গায়েও গোলাগুলি লাগল, একটা জংলিও মারা তো গেলই না, এমনকি গায়ে কাঁটার আঁচড়ও লাগল না।
ব্যাপারটা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করে আমাদের এ-ধারণাই হলো যে, আর তারা জায়গামত পৌঁছাবার আগেই গোলাবারুদ কোনোক্রমে পানিতে পড়ে গেছে, তা নাহলে সব কটা গুলিই তাদের মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেছে।
তা সত্ত্বেও লাভ তো একটা হলই। গোলাগুলির বুক-কাঁপানো আওয়াজ তাদের অনভ্যস্ত কান বরদাস্ত করতে পারল না। আর সে সঙ্গে আকস্মিক ধোঁয়ার ব্যাপারটা। তাদের মনে বিস্ময় ও আতঙ্কের সঞ্চার ঘটাল। তা দেখে আমার তো মনেই হলো তারা বুঝি রণে ভঙ্গ দিয়ে কেটেই পড়বে।
আমাদের সঙ্গীরা যদি আক্রমণটাকে আরও কিছুক্ষণ টিকে থাকতে পারত তবে হয়তো তারা পালিয়েই যেত। আর জঙ্গলিদের শাতিগুলো ইতিমধ্যেই এত কাছে চলে এসেছিল যে লক্ষ্য করে জাহাজের মুখ ঘুরিয়েনিল। ব্যস, এতেই অসভ্য জংলিগুলো আকস্মিক বিস্ময় ও আতঙ্কটুকু কাটিয়ে স্বাভাবিকতা ফিরে পাওয়ার উপযুক্ত সময় সুযোগ পেয়ে গেল।
আবার জাহাজ থেকে আমাদের সহকর্মীদের ছোঁড়া গোলাগুলি জংলিদের চরম দুর্গতিতে ফেলে দেয়। সাত-আটটা শাতি ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। সত্তর-আশিজন জংলি মারা পেল। আর আতঙ্কে পানিতে পড়ে গিয়ে নাস্তানাবুদ হতে লাগল কম করেও একশো। অবশ্য তাদের মধ্যে বেশ কিছুসংখ্যক ভয়ানক জখমও হল। আর যারা রইল তারা প্রাণের মায়ায় সোজা চম্পট দিল।
কার্যত দেখা গেল, আমাদের সঙ্গিসাথীদের বাধা দেওয়া সার্থক হয়েছে। তাতেও কিন্তু তারা বিপদের হাত থেকে পুরোপুরি অব্যাহতি পেল না। এই মওকায় শাতির দেড়শোরও বেশি জংলি যে যেদিকে পারল কেটে পড়ল। জনাকয়েক দড়ি বেয়ে জাহাজের ডেকের ওপর উঠে পড়ল।
আমাদের সঙ্গিরা বারুদে আগুন দেবার ফুরসুতটুকুও পেল না। ব্যস, তাদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার আর কোনো প্রতিবন্ধতাও থাকল না। তারা উন্মাদের মতো আমাদের লোকজনদের ওপর তুমুল আক্রমণ চালিয়ে মেরে সাবাড় করে দিতে লাগল।
আমাদের সঙ্গি সাথিরা মরে ভূত হয়ে যাবার পর জঙ্গিরা হুড়মুড় করে যে যেদিক দিয়ে পারল জাহাজে উঠে পড়ল। এবার আমাদের জাহাজ ‘জেন’-এর ডেকের ওপর হিংসার জোয়ার বয়ে চলল। ডেকের মেঝে রক্তে পিছল হয়ে গেল।
অসভ্য জংলিরা এবার হৈহল্লা করতে করতে জাহাজটাকে তীরের দিকে নিয়ে গেল। সেটাকে উপহার হিসেবে সর্দার টু-উইটের হাতে তুলে দিল।
এদিকে সর্দার টু-উইট তার দলবল নিয়ে সমুদ্রের দিকে চলে গেল। আমরা জঙ্গলের গোপন অন্তরাল থেকে বেরিয়ে শিকার করে ফেললাম। খুশিতে মন-প্রাণ চনম নিয়ে উঠল। আর যা-ই হোক, একটা সপ্তাহ খাবারের জন্য আমাদের আর ভেবে মরতে হবে না। ঝুপড়িতে ফিরে যাবার সময় একটা গাছতলা থেকে আমরা প্রচুর কাঠবাদামও কুড়িয়ে নিলাম। ব্যস, নিশ্চিন্ত মনে আবার ঝুপড়িতে মাথা গুঁজলাম।
