তার উৎসাহ-আগ্রহে আমি নতুন জীবনীশক্তি নিয়ে স্তূপাকৃতি গুঁড়ো মাটি সরিয়ে সরিয়ে এক কদম এগোতেই এক টুকরো আলো অতর্কিতে আমার চোখে ধরা দিল। মনে আশার সঞ্চার হল। আর যা-ই হোক, অন্তত বাতাস না পেয়ে শ্বাসরূদ্ধ হয়ে এ মুহূর্তেই মরতে হবে না।
অন্য দুই সঙ্গিকেও সঙ্গে সঙ্গে প্রাণরক্ষার ভরসা দিয়ে দিলাম। গুড়া মাটি আর আবর্জনা সরিয়ে সরিয়ে আরও কিছুটা অগ্রসর হতেই চারদিকের পরিবেশ দেখতে পেলাম। বুঝলাম, আমরা ফাটলের সোজাসুজি অন্তিম প্রান্তে হাজির হয়ে গেছি।
ফাটলটা এবার বাঁ দিকে বেঁকে গেছে। আরও কিছুক্ষণ দাঁতে দাঁত চেপে চেষ্টা চালিয়ে বাঁকের মুখে হাজির হতেই মনপ্রাণ খুশিতে মাতোয়ারা হয়ে উঠল।
প্রায় পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণ সৃষ্টি করে লম্বা একটা ফাটল খাড়াভাবে ওপরের দিকে উঠে গেছে। ফাটলটার শেষ প্রান্ত আমাদের নজরে না পড়লেও ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে উঠল যে, আর একটু এগোতে পারলে মুক্ত বাতাসে ফুসফুসটাকে ভরে নেওয়া সম্ভব হবে।
ব্যাপারটা এবার মনে পড়ল, এ ফাটলটায় আমরা তিনজনই তো ঢুকেছিলাম। কিন্তু আমাদের সঙ্গি তৃতীয়জন, উইলসন এ্যালেন? সে যে বেপাত্তা।
আমরা দুজন–ডার্ক পিটার্স আমি আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিলাম, পিছিয়ে গিয়ে পাত্তা লাগাতেই হবে।
দীর্ঘ সময় ধরে হণ্যে হয়ে খোঁজাখুঁজি করে উইলসন এ্যালেনকে বের করার চেষ্টা চালালাম। হায় ঈশ্বর। এ কী সর্বনাশা কাণ্ড ঘটতে চলেছে। মাথার ওপরের মাটির স্তর যে কোনো মুহূর্তে ধ্বসে পড়তে পারে।
এক সময় ডার্ক পিটার্সের চিৎকার কানে এলো, সে উইলসন এলেনের পা চেপে ধরেছে, টানাটানি করছে। তার বাকি শরীরটা গুঁড়োমাটি আর আবর্জনার স্তূপে চাপা পড়ে গেছে। সেখান থেকে তাকে টানাটানি করে বের করে আনা কিছুতেই সম্ভব নয়।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ডার্ক পিটার্সের কথার সত্যতা উপলব্ধি করলাম, বহু আগেই তার শেষ নিকাস বেরিয়ে গেছে।
ফুসফুস নিঙড়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিষণ্ণ মনে সহযাত্রী বন্ধুর দেহটাকে নিষ্ঠুর অদৃষ্টের হাতে সঁপে দিয়ে আমরা পিছন ফিরলাম। বিষণ্ণ মনে ধীর-মন্থর গতিতে আমরা আবার সে বাঁকটার দিকে অগ্রসর হতে লাগলাম।
দীর্ঘ হতাশা আর প্রত্যাশা বুকে নিয়ে নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমের মাধ্যমে শেষমেষ আমরা উভয়েই একটা সমতল প্রান্তরে হাজির হতে পারলাম।
কয়েকমুহূর্ত নীরব দম নিয়ে সন্ধানী নজর মেলে চারদিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হলাম, ফাটলটা কৃত্রিম। আর সেটাকে অতিসম্প্রতি সৃষ্টি করা হয়েছে।
এবার ব্যাপারটা খোলসা হয়ে গেল, যে সংঘর্ষের তীব্র আওয়াজ শুনে আমরা দারুণ ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, সে সংঘর্ষই আমাদের মুক্তির জীবন রক্ষার পথটাকেও উন্মুক্ত করে দিয়েছিল।
ডার্ক পিটার্স ও আমি উভয়েরই শরীর মন দু-ই ক্লান্ত। উঠে খাড়াভাবে দাঁড়ানোও সম্ভব হচ্ছে না, কথা বলার তো প্রশ্নই ওঠে না।
ডার্ক পিটার্স কোনোরকমে বলল, পিস্তলে ফাঁকা আওয়াজ করে আমাদের উপস্থিতির কথা জানিয়ে দিলে কেমন হয়? তবে জংলিরা নির্ঘাৎ আমাদের উদ্ধার করতে এগিয়ে আসবে।
তার প্রস্তাবটাকে আমি মন থেকে মেনে নিতে পারলাম না।
পরবর্তী ঘটনায় অবশ্য ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যায়, তার পরামর্শ মাফিক কাজ করলে অনুতাপে আমাদের আঙুল কামড়াতে হত। ভাগ্য ভালো যে, পরমুহূর্তেই জঘণ্য একটা চক্রান্তের আভাস পেয়ে গেলাম। অতএব আমাদের অবস্থিতির কথা কিছুতেই জংলিগুলোর কাছে ফাস করা নিরাপদ হবে না, আমরা করবও না।
ডার্ক পিটার্স পিস্তলটাকে জ্যাকেটের পকেট থেকে টেনে বের করে নেবার পরও যথাস্থানেই গুঁজে রাখল।
আমরা প্রাণান্ত প্রয়াস চালিয়ে এক সময় সমতলে উঠে গেলাম। নজর মেলে চারদিকে দৃষ্টিপাত করতেই কিছুক্ষণ আগেকার ভয়ঙ্কর সে বিস্ফোরণটার রহস্যভেদ করে ফেলতে পারলাম।
আমাদের ভয়ঙ্কর সঙ্কটাপন্ন অবস্থার মূলে যে অসভ্য জংলিদের জঘণ্য চক্রান্ত রয়েছে যারা আমাদেও সঙ্গে এতদিন বন্ধুত্বের অভিনয়ে লিপ্ত ছিল।
জংলিরা চুনাপাথরের পাহাড়ের গায়ে কিছু কাঠের গুঁড়ি পুঁতে আর কিছু আড়াআড়িভাবে বেঁধে মাচার মতো তৈরি করেছিল। তার ওপরে ময়লা আবর্জনা আর গুঁড়ো মাটি ও ধুলো প্রভৃতি গোপনে কাঠের গুঁড়ির গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে তা হুড়মুড় করে আমাদের মাথার ওপর ভেঙে পড়ে।
ডার্ক পিটার্স আর আমি ছাড়া আমাদের অন্য সব সঙ্গিদের কী মর্মান্তিক পরিণতি ঘটেছে তা বুঝতে দেরি হলো না। ভাগ্যের জোরে আমরা দুজন প্রাণে বেঁচে গেলাম।
এ-দ্বীপে আমরা, একমাত্র আমরা দুজনই জীবন্ত সাদা চামড়ার মানুষ। উফ্! আমাদের মেকি বন্ধুত্বের ফাঁদে ফেলার জন্য জংলিগুলো কী জঘণ্য চক্রান্তেই না লিপ্ত হয়েছিল।
.
২২. ॥ দ্বাবিংশ অধ্যায় ॥
আমরা এখন যে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির মধ্যে প্রতিটা মুহূর্ত কাটাচ্ছি তাতে তো মনে হচ্ছে। তা চিরদিনের মতো ভূ-গর্ভে সমাহিত হয়ে থাকার চেয়ে কোনো অংশে কম দুর্বিষহ নয়।
এখন আমাদের সামনে দুটো পথ খোলা দেখতে পাচ্ছি–অসভ্য জংলিদের হাতে বেঘোরে প্রাণ দেওয়া নতুবা, জীবনভোর তাদের হাতে বন্দি হয়ে দিনাতিপাত করা। এর চেয়ে ভালো কোনো ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তো এখন পর্যন্ত কিছুই মাথায় আসছে না। এখন জঙ্গলের ঘাপটি মেরে থেকে তাদের চোখে ধূলো দেওয়া যেতে পারলেও তা দিয়ে আর কতদিন? শীঘ্রই মেরু অঞ্চলে শীত নেমে আসবে। ফলে না খেয়ে শুকিয়েই মারা যেতে হবে। অন্যথায় জংলিদের হাতে ধরা পড়তে হবে। উভয়সঙ্কটে পড়ে আমরা হতাশায় জর্জরিত হতে লাগলাম।
