এ-কথা ভেবে তার থেকে মাইল খানেক দূরে জাহাজটাকে নোঙর করে রাখা হল।
দু-জনকে হাহাজে পাহারায় মোতায়েন রেখে আমরা বাকি বত্রিশজন সঙ্গে করে পিস্তল, গাদা বন্দুক, তরবারি আর নাবিকদের ছুরি সঙ্গে নিয়ে জাহাজ ছেড়ে তীরে নামলাম। একশো জংলি কালো যোদ্ধা আমাদের অভ্যর্থনা কওে নিয়ে যাবার জন্য আগেভাগেই তীরে জমায়েত হয়েছিল।
তীরে অপেক্ষমান জংলিদের ওপর মুহূর্তের জন্য চোখের মণি দুটো বুলিয়ে নিয়ে দেখলাম, তারা সম্পূর্ণ নিরস্ত্র। এ ব্যাপারে সর্দার টু-উইটকে প্রশ্ন করলে জবাব পেলাম, আমরা যখন পরস্পর ভাইয়ের মতো তখন আর অস্ত্রপাতির প্রয়োজন কি?
সর্দারের কথাটা বড়ই ভালো লাগল। আমরা এবার তাদের সঙ্গে পথ পাড়ি দিয়ে তার থেকে ক্রমেই জঙ্গলের ভেতরের দিকে এগোতে লাগলাম।
আমরা এবার কয়েকটা ঝর্ণা আর নদীখাত ডিঙিয়ে সঙ্কীর্ণ একটা গিরিখাত ধরে এগোতে লাগলাম। গিরিখাতটা প্রায় চল্লিশ ফুট চওড়া আর দেড়-দু মাইল লম্বা।
আজ যখননিরিবিলিতে বসে সেদিনের এত বড় বোকামির কথা ভাবি তখন একটা কথাই বার বার মনের কোণে ভেসে ওঠে, তখন এতই অবাক হই যে, সঙ্কীর্ণ সে গিরিখাতের ভেতর দিয়ে আমাদের সামনে ও পিছনে এতগুলো জংলিদের রেখে পথ পাড়ি দিতে গিয়েই ভুলটা করেছিলাম।
কিন্তু গতদিন এখানেই তো আমরা নিজেদের দলের শক্তি সামর্থ্যের ওপর ভরসা রেখে নির্দিধায় পথ পাড়ি দিয়েছিলাম। আমাদের নিজেদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত ভরসা আর সর্দার টু-উইটের অনুচররা নিরস্ত্র থাকার জন্যই আর তার ওপর আগ্নেয়াস্ত্রের অবশ্যম্ভাবী সাফল্যের বিশ্বাস আর জংলিগুলোর সঙ্গে দীর্ঘদিনের মেকি হৃদ্যতার সম্পর্কে আমরা সম্পূর্ণ নিশ্চিত ছিলাম।
পথের ঝোঁপঝাড় কাটাকাটি আর পাথর সরিয়ে পথ পরিষ্কার করতে করতে পাঁচ ছয়জন জংলি সবার আগে আগে যেতে লাগল।
একে অন্যের কাছ থেকে যাতে দূরে সরে না যাই সে চিন্তা করে আমরা প্রায় গা ঘেঁষা ঘেঁষি করে পথ পাড়ি দিতে লাগলাম। আর অবশ্য শৃঙ্খলা আর ভদ্রতার পরিচয় দিতে দিতে জংলিরা আমাদের পিছন পিছন হেঁটে চলল।
[খুব সম্ভবত এখানে কিছু পাতা মিসিং আছে]
উইলসন এলেন, ডার্ক পিটার্স আর আমি আমাদের দলটার ডানদিক ধরে হাঁটতে লাগলাম। হাঁটতে হাঁটতে নরম পাথরের একটা ফাটলের দিকে আমাদের নজর পড়ল। তার ভেতরে একটা লোক অতি কষ্টে গেল। ব্যস, এর বেশি নয়। আর সেটা পাহাড়ের পিছন দিকে আঠারো বিশ ফুট সোজা এগিয়ে গিয়ে বাঁ দিকে ক্রমেই চালু হয়ে নিচে নেমে গেছে। চোখ বুলিয়ে অনুমান করলাম, গিরিখাদের দুদিকের উচ্চতা ষাট-সত্তর ফুট হতে পারে। ঘাড় ঘুরিয়ে পিটার্স আর উইলসন এ্যালেনকে দেখে আমি বললাম, ফাটলের মধ্যে দুজনের পথ চলার মতো জায়গা হবে না। উইলসন এলেন ফাটলটার মুখের কাছে পা দিতে না দিতেই ভয়ঙ্কর একটা সংঘর্ষের শব্দে রীতিমত চমকে উঠলাম। এমন ভয়ঙ্কর শব্দ এর আগে কোনোদিনই আমি শুনিনি। মনে হলো পৃথিবীর ভিতটাকে কেউ বুঝি হঠাৎ টুকরো টুকরো করে দিল। পৃথিবীর বুকে মহাপ্রলয় নেমে এলো বলে। অচিরেই বুঝি সবকিছু ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
ন্যারেটিভ আর্থার গর্ডন পাম – ২০
২১. ॥ একবিংশ অধ্যায় ॥
অকস্মাৎ বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়া মনটা যখন আবার কিছুটা একত্রে পুঞ্জীভূত হল, কিছুটা আত্মস্থ হলাম, তখন আমি অনুভব করলাম, অচিরেই বুঝি শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যাবে।
ধুলো বালির গাদায় পড়ে আমি অন্ধকারে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে পথ খোঁজার চেষ্টা করছি তখনও ঝুর ঝুর করে গুঁড়োমাটি মাথার ওপর পড়ছে। ভাবলাম, বুঝি জ্যান্তই আমাকে কবর দেবার মতলব করেছে।
জমাট বাঁধা আতঙ্ক বুকে নিয়ে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করলাম। অল্পতেই দাঁড়াতে পেরে গেলাম।
কয়েক মুহূর্তে স্থবিরের মতো নিশ্চিন্ত-নিষ্পন্দভাবে দাঁড়িয়ে ভাবতে চেষ্টা করলাম, আমি কোন আকস্মিক প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন, আছিই বা কোথায়?
ঠিক সে মুহূর্তেই একটা তীব্র আর্তস্বর শোনা গেল। ডার্ক পিটার্স চাপা অথচ করুণ স্বরে ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে সাহায্যের প্রত্যাশায় ডাকাডাকি করছে।
হামাগুড়ি দিয়ে, প্রায় বুকে হেঁটে দু-এক হাত সামনের দিকে যেতেই দুম করে বন্ধু ডার্ক পিটার্সের ঘাড় আর মাথার ওপর আড়াআড়ি পড়ে গেলাম।
মুহূর্তের মধ্যেই নিঃসন্দেহ হলাম, মাটির গুঁড়োয় কোমর অবধি চাপা পড়ে সে উঠে আসার জন্য সে মরিয়া হয়ে কসরৎ চালিয়ে যাচ্ছে।
আমি দুহাতে উন্মাদের মতো গুঁড়ো মাটির স্তূপ সরিয়ে সরিয়ে তাকে আধা সমাধিস্থ অবস্থা থেকে উদ্ধার করলাম। জমাটবাধা আতঙ্ক আর বিস্ময়ের ঘোরটুকু কোনোরকমে কাটিয়ে নিয়ে ডার্ক পিটার্স আর আমি বিষণ্ণ মুখে পাশাপাশি বসে সহজভাবে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম, কোনো-না-কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে আমরা যে ফাটলটার মধ্যে গলে গিয়েছিলাম সেটা অকস্মাৎ ওপর থেকে ধসে পড়েছে। আর সে জন্যই আমাদের এখানেই জীবন্ত সমাধি হবার জোগাড় হয়েছে, হবেও হয়তো তাই-ই।
আমরা দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র যন্ত্রণা আর নিরবচ্ছিন্ন হতাশায় একেবারেই মনমরা হয়ে পড়লাম। প্রাণরক্ষা পাওয়ার মতো সামান্যতম আশার আলোও আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে উঁকি দিল না।
দীর্ঘ ভাবনা চিন্তার পর শেষপর্যন্ত ডার্ক পিটার্স আমার দিকে মুখ তুলে তাকাল। করুণ স্বরে বলল–এ অন্ধকার যক্ষপুরী থেকে আমাদের যে করেই হোক উদ্ধার পাবার চেষ্টা করতেই হবে।
