গ্রামটায় অবশ্য–একে গ্রাম বলে স্বীকৃতি দিলে, পথের এখানে ওখানে কিছু বিচিত্র জানোয়ার চোখে পড়ল। তাদের গতিবিধি দেখে মনে হলো তারা অসভ্য জংলিদের পোষা জানোয়ার। আর দেখলাম, অ্যালট্রেস পাখি, মুরগি আর জলাশয়ে দেখলাম হরেক রং ও আকৃতির মাছ। আর দেখলাম, গ্যালিপাগো কচ্ছপ।
আমরা টু-উইটের সঙ্গে তাদের বস্তির কাছাকাছি যেতেই আমাদের দেখার জন্য দলে দলে মানুষ ছুটোছুটি করে এসে আমাদের ঘিরে দাঁড়াল।
আমাদের চারিদিকে ভিড় করে দাঁড়ানো মানুষগুলোর মুখেও সর্দারে সঙ্গিদের মতোই আশা-সুর লামা লামা’ কথাটা বার বার শুনতে পেলাম।
ব্যাপারটা আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিস্ময় উৎপাদন করল, নবাগত অসভ্য জংলিরা সবাই সম্পূর্ণ বিবস্ত্র। শাতি করে যারা আমাদের জাহাজে গিয়েছিল কেবলমাত্র তারাই কটিদেশে এক টুকরো চামড়া জড়িয়ে লজ্জা নিবারণ করেছে।
তবে জংলিরা সম্পূর্ণ নিরস্ত্র। সর্দার দু-উইটের বসতি–ঝুপড়িটা বস্তির ঠিক কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। প্রায় তাঁবু খাটানোর কায়দায় সেলাই করা চামড়ার ছাউনি একটা। আর শুকনোপাতা পুরু করে বিছিয়ে গদি বা নিয়ে নেওয়া হয়েছে। চমৎকার বন্দোবস্ত।
অভাবনীয় অভ্যর্থনা করে আমাদের ঘরের ভেতওে নিয়ে যাওয়া হল।
ঘরের ভেতরে ঢুকে সর্দার টু-উইট নিজে পার্তার গতিতে বসল আর আমাদেরই ইশারায় বসতে বলল। আমাদের অস্বস্তি এবার তুঙ্গে উঠে গেল। আমরা মাত্র বারোজন মেঝেতে পাতার গদিতে বসেছি, আর অসভ্য জংলিরা কম করেও চল্লিশজন তো হবেই।
অসভ্য জংলিদের দিকে মুহূর্তের জন্য চোখ বুলিয়ে নিয়ে ভাবলাম, হঠাৎ কোনো গোলমালের সূত্রপাত হলে আমাদের পক্ষে বন্দুক ব্যবহার করা তো দূরের কথা, বন্দুক তোলাও সম্ভব হবে না। এমনকি ঝট করে উঠে দাঁড়াবার মতো সুযোগই পাওয়া যাবে না।
এ-তো গেল ঘরে ভেতরের পরিস্থিতি। আর বাইরে কৌতূহলী বস্তিবাদী জংলিরা আরও অনেক, অনেক বেশি।
একসময় পরিস্থিতি এমনই খারাপ হয়ে পড়ল যে, সর্দার টু-উইট চিল্লাচিল্লি করে তাদের সরিয়ে না দিলে হয়তো তাদের পায়ের তলায় পড়ে আমাদের জান খতমই হয়ে যেত। নিশ্চিত করে বলতে পারি, আমাদের মাঝখানে টু-উইটের উপস্থিতি একান্ত অপরিহার্য। তাই তো আমরা সাধ্যমত তার কাছাকাছি অবস্থান করতে লাগলাম।
অসভ্য জংলিদের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী অতিথি অভ্যর্থনার সারলে আমরা তাদের বস্তি ছেড়ে উপকূলে বেঁধে-রাখা নৌকায় ফিরে এলাম। স্বীকার করতেই হবে, জংলি সর্দার টু-উইট বা তার অনুগামীদের কাছ থেকে কোনোরকম দুর্ব্যবহার তো দূরের কথা, সামান্যতম বিপরীত আচরণও তো পাইনি; এমনকি সর্দারের হুকুমে অসভ্য গ্রামবাসীরা কয়েকটা গ্যালিপাগো কচ্ছপ আর বুনোহাঁস আমাদের নৌকায় তুলে দিয়ে একান্ত অনুগত ভূত্যের মতো বিদায় জানাতে দাঁড়িয়ে রইল।
আমরা সেই মুহূর্তে নিজেদের বড়ই ভাগ্যবান মনে না করে পারলাম না। কারণ, সর্দার টু-উইটের হুকুমে অসভ্য জংলিরা হরেক রকম খাবার দাবার এনে আমাদের জাহাজ বোঝাই করে দিল।
গ্যালিপাগো কচ্ছপ আর বুনো হাঁস তো প্রচুর মিলেছে। আর আমরা আকার ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেওয়ার পর অসভ্য জংলিরা প্রচুর পরিমাণে স্কার্ভি ঘাস, সেলেরি ঘাস এবং শালতি বোঝাই করে টাটকা মাছ ও শুঁটকি মাছ এনে দিয়ে নিজেদের জীবন ধন্য জ্ঞান করল।
সত্যি কথা বলতে কি অসভ্য জংলিদের দেওয়া খাদ্যবস্তু খাওয়ার পর আমাদের রোগব্যাধি সেরে তো গেলই এমনকি অবসাদটুকুও কেটে গেল। এক কথায় আমরা সম্পূর্ণ সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে উঠলাম।
আমরা পরম খুশির মেজাজে পুরো একটা মাস কাটিয়ে দিলাম। এবার আমাদের সেখান থেকে নোঙর তোলার পালা।
আমরা মনস্থ করলাম, যাত্রা করার আগে একবার জংলিদের বস্তিতে গিয়ে সর্দার টু-উইট আর তার অনুগামীদের কাছ থেকেই বিদায় নিয়ে আসব। আর এ জন্য টু উইটিও এত বেশি আব্দার করতে লাগল যে, তার মনে ব্যথা দেওয়াটা আমরা কেউ-ই সঙ্গত মনে করলাম না! সবেচেয় বড় কথা, দীর্ঘ এক মাস ধরে তাদের কাছ থেকে আমরা হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণ ও বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা পেয়েছি তাতে আমাদের মধ্যে প্রথম দিকে তাদের প্রতি যে সন্দেহ জেগেছিল, তা পুরোপুরি কেটে গেছে। এতে তাদের ওপর অন্তরের অন্তঃস্থলে নিখাদ মমত্ববোধের সঞ্চার ঘটেছে।
কিন্তু কিছু সময়ের মধ্যেই আমাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়ে গেল। তাদের এই যে গায়ে পড়ে উপকার আর সহানুভূতিপূর্ণ আচরণ সবকিছুর মূলে রয়েছে একটা গোপন চরমতম দূরভিসন্ধি ষড়যন্ত্র। অথচ সভ্যতার আলোক থেকে নিদারুণভাবে বঞ্চিত অসভ্য জংলিদের জন্য আমাদের মনে এতই সহানুভূতি আর প্রীতির সঞ্চার ঘটেছিল। তার পরিমাপ করা বাস্তবিকই অসাধ্য।
জংলিদের গায়ে ঘুরে আসার জন্য আমরা পয়লা ফেব্রুয়ারি জাহাজ ছেড়ে নামলাম।
ইতিপূর্বেই বলে রেখেছি, জংলিদের প্রতি আমাদের মনে আর সামান্যতম সন্দেহও নেই। তা সত্ত্বেও সাধ্যমত সাবধানতা অবলম্বন করলাম।
জাহাজে দুজন নাবিককে পাহারায় নিযুক্ত করে কড়া নির্দেশ দিয়ে গেলাম, আমাদের অবর্তমানে শত অজুহাত-অনুরোধ-উপরোধেও যেন জাহাজে উঠতে দেওয়া না হয়। আর তারা যেন মুহূর্তের জন্য ডেকের ওপর থেকে না নামে।
আর তাদের নজর এড়িয়ে কেউ যাতে জাহাজে চড়তে না পারে।
