আমরা এভাবে বিশজনের একটা দলকে পর পর জাহাজে চড়িয়ে তাদের কৌতূহলনিবৃত্ত করলাম। তবে প্রতিজনার সঙ্গেই সর্দার টু-উইট রইল।
অসভ্য জঙ্গলিগুলো কিছু জিনিস দেখে গোড়ার দিকে কৌতূহলাপন্ন ও ভত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেও শেষপর্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই ব্যবহার করল। কিন্তু কয়েকটা জিনিস দেখে তারা এমন অদ্ভুত আচরণ করতে লাগল যার কারণ আজও আমি ভেবে পাচ্ছি না। ব্যাপারগুলো হচ্ছে–খুলে রাখা বস্তু জাহাজের পাল, ডিস, আর ময়দা ভর্তি আটা। এদের প্রত্যেকেই দেখামাত্র তাদের মুখ এমন বিমর্ষ হয়ে গেল যে, কিছুতেই তাদের ওগুলোর কাছে নিয়ে যাওয়া গেল না।
আর একটা কথা, এ-দ্বীপে প্রচুর সংখ্যক গ্যাউল পাগোস প্রজাতির কচ্ছপ নজরে পড়ল। এমনকি সর্দার টু-ইউটের শালতিতেও একটা পড়ে থাকতে দেখলাম। এদের সুস্বাদু মাংসের কথা ভাবলেই জিভ রসিয়ে উঠে।
এখন সব ব্যাপার-স্যাপার দেখে ক্যাপ্টেন গাই মনস্থির করে ফেললেন, এ অঞ্চলটাকে ঘুরে ঘুরে ভালোভাবে দেখবেন। এতে তার আবিষ্কারের সঙ্গে কিছু অমূল্য তথ্যে ঝোলা ভরে নিতে সক্ষম হবেন।
আর আমি? একে মনসা তার ওপর ধূনার গন্ধ–হাতে স্বর্গ পেয়ে গেলাম।
ক্যাপ্টেন গাই কথা প্রসঙ্গে পানি আর জ্বালানির কথা পাড়লেন। আমি তাকে নিশ্চিন্ত করতে গিয়ে বললাম–আরে, এরজন্য এত ভাববার কী আছে? জাহাজ নিয়ে ফেরার সময় এ দ্বীপ থেকে পানি আর জ্বালানি তুলে নেওয়া সম্ভব হবে।
সর্দার টু-উইটের পরামর্শে ‘জেন’-কে প্রায় এক মাইল ঘুরিয়ে নেওয়া হল। দ্বীপটার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে সুদৃশ্য একটা উপসাগর চোখে পড়ল।
উপকূলের শেষ প্রান্তে তিনটি স্বাদু পানির ঝর্ণা আর জঙ্গল থেকে প্রচুর শুকনো কাঠও পাওয়া গেল। তাই সেখানেই জাহাজ ভেড়ানো হল।
সর্দার টু-উইট আমাদের সঙ্গে জাহাজেই রয়েছে। তার গায়ে বেড়াতে যাবার জন্য আমাদের সাদর আমন্ত্রণ জানায়।
ক্যাপ্টেন গাই তার আমন্ত্রণে খুশি হয়ে তার গায়ে যেতে সম্মত হলেন। কিন্তু নিশ্চিন্ত হতে পারলেন না।
ক্যাপ্টেন গাই অসভ্য জংলিদের মধ্য থেকে দশজনকে জামিন হিসেবে আমাদের জাহাজে থাকার ব্যবস্থা করে, আমরা বারো জন দল বেঁধে সর্দারের গায়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। প্রচুর অস্ত্রপাতিও সঙ্গে নিতে নিতে ভুললাম না।
জাহাজ ছেড়ে যাবার পূর্ব মুহূর্তে ক্যাপ্টেন গাই সেটাকে কড়া নির্দেশ দিয়ে গেলেন তাঁর অবর্তমানে কাউকে যেন জাহাজে উঠতে না দেওয়া হয়। আর এও বললেন, বারো ঘণ্টার মধ্যে আমরা যদি জাহাজে ফিরে না আসি তবে যেন আমাদের খোঁজ করার জন্য ঘূর্ণায়মান কামানসহ এক-মাস্তুলওয়ালা জাহাজটাকে উপকূল ধরে এগিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে।
উপকূল ছেড়ে ভেতরের দিকে যত এগোচ্ছি আমাদের মধ্যে ততই দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাতে লাগল, আমরা যেন সভ্য জগৎ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটা জগতে পৌঁছে গেছি। আমরা আগে যা-কিছু জেনেছি ও দেখেছি সেসবকিছুই এখানে অনুপস্থিত।
পথের ধারে একটা পার্বত্য ঝর্ণা দেখতে পেয়ে সর্দার দু-উইট আর তার চ্যালাচামুণ্ডা গণ্ডুষ ভরে ভরে পানি খেতে খেতে গেল।
জলের রং দেখেই আমরা ধরে নিলাম, পানের উপযুক্ত নয়, দূষিত। আমরা সে পনি খেতে আপত্তি জানালাম। শেষপর্যন্ত অবশ্য বুঝতে পারলাম, এখানকার সব পানি এরকমই। বর্ণহীন তো নয়ই, আবার বিশেষ কোনো একটা বর্ণেরও নয়।
অসভ্য জংলিগুলো বিশেষ করে সর্দার টু-উইট আমাদের জাহাজে আয়না দেখে যেমন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল আমরাও ঝর্ণার পানি দেখে কম বিস্মিত হইনি।
এবার একটা পাত্রে কিছুটা নিয়ে তাকে থিতিয়ে নেবার জন্য রেখে দিলাম। লক্ষ্য করলাম, সবখানি তরল পদার্থ বহু পৃথক পৃথক রসনালী মিলে গঠিত। আর প্রতিটা রসনালীর রং আলাদা, কেউ কারো সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে না।
শেষমেশ যে আপাত অলৌকিক ঘটনাবলি আমার চারদিকে ঘিরে ধরেছিল তারই প্রথম পর্ব পানির এ ঘটনাটা। বাস্তবিকই একেবারেই অলৌকিক ঘটনাই বটে।
.
১৯. উনবিংশ অধ্যায়
জাহাজ থেকে নয় মাইলেরও বেশি দূরবর্তী সর্দারের গ্রমটায় পৌঁছাতে আমাদের তিন ঘণ্টা সময় লেগে গেল। আমরা যতই পথ পাড়ি দিচ্ছি ততই ছয়-সাতজনের নতুন নতুন দল এ-পথ সে-পথ দিয়ে এগিয়ে এসে আগের একশো দশজন জংলির সঙ্গে মিলিত হচ্ছে।
তাদের সংখ্যা বৃদ্ধির ব্যাপারটা আমাদের যারপরনাই বিস্মিত করল এ জন্য যে পুরো কাজটাই পূর্ব পরিকল্পিতভাবে এবং শৃঙ্খলার সঙ্গে চলতে লাগল। এজন্যই ব্যাপারটা অন্য কারো না হলেও আমার মনে সন্দেহের উদ্রেক করল। আবার সমস্যা হচ্ছে, ফিরে যাওয়াও সম্ভব নয়। তাই ভেবেচিন্তে মনস্থির করে ফেললাম, জংলি সর্দার টু-উইটের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রেখে যাবতীয় দায়িত্ব তার ওপর ছেড়ে দেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ ও একমাত্র উপায়।
আমরা একটা পাহাড়ি খাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে দ্বীপভূমির একমাত্র বস্তিতে হাজির হলাম। বস্তির কাছাকাছি গিয়েই সর্দার টু-উইট গলা ছেড়ে অবোধ্য ভাষায় যা বলল তার মধ্যে ক্লিক ক্লক’ শব্দটা বার বার ব্যবহার করল। এমনও হতে পারে, ওটা বস্তিটার নাম। ইতিপূর্বে এমন শোচনীয় অবস্থাসম্পন্ন বাড়ি অন্য কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। আবার এগুলোর কয়েকটার মালিক গাঁয়ের ইয়ামপু অর্থাৎ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
