আমি বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে বললাম–না, জানি না। নরওয়ের তাকে বলে ভুরুখ।
ভুরুখ?
হ্যাঁ। আমার মাঝখানের দ্বীপটার নাম মসকো।
আর ওই মাইল খানেক উত্তরে যে দ্বীপটা দেখা যাচ্ছে, ওটার নাম?
ওটাকে বলে আমপরেন।
তারপর আরও দূরের কয়েকটা দ্বীপের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে করতে বলতে লাগলেন–ওইটার নাম ইসখেসেন, কিন্ডহেম, হট, বহম, আর ওইটার নাম সুয়ারভেন।
আমি তার একের পর এক দ্বীপের দিকে আঙুল ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে চোখের মণি দুটোকেও ঘোরাতে লাগলাম।
তিনি এবার আরও দূরবর্তী কয়েকটা দ্বীপের দিকে এক এক করে অঙ্গুলিনিদের্শ করে বলতে লাগলেন–আরও দূরে, ভুরুখ আর মসৃকো দ্বীপের মাঝখানে ওই দেখা যাচ্ছে, ওটারহম, স্যান্ডফ্লোসেন, স্টকহম আর এই যে দ্বীপটা দেখা যাচ্ছে, ওটার নাম ফ্লিমেন।
এগুলো কিন্তু দ্বীপগুলোর আসল নাম। কিন্তু এরকম নামকরণের দরকার যে কেন হয়েছিল, তা তুমি তো বলতে পারবেই না, এমনকি আমিও না।
মুহূর্তের জন্য নীরবে উৎকর্ণ হয়ে কি যেন শোনার চেষ্টা করে এক সময় ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন–বন্ধু, কিছু শুনতে পাচ্ছ কী?
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললাম–কী? কীসের কথা বলছেন?
কিছু শুনতে পাচ্ছ না?
কই, না তো।
ভালো কথা, পানির কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ছে কী?
আমি পানির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম। নতুন কোনোকিছু নজরে পড়ল না।
বুড়ো লোকটা আমার দিকে মুহূর্তের জন্য তাকিয়ে নীরবে মুচকি হাসলেন।
লফডেনের মধ্যবর্তী অঞ্চল থেকে আমরা প্রায় দশ মিনিট আগে হেলসেগেন পর্বতের চূড়ায় উঠেছি। অতএব পাহাড়ের চূড়ায় ওঠামাত্র সমুদ্রটা অকস্মাই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠার পূর্ব মুহূর্ত অবধি আমরা একটা বারের জন্যও সমুদ্রটাকে দেখার সুযোগ পাইনি।
আমার বুড়ো বন্ধু কথা বলার সময়ই আমি একেবারেই হঠাৎ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, এমন একটা জোড়ালো শব্দ শুনতে পেলাম। শব্দটা আমেরিকার বিস্তীর্ণ তৃণাঞ্চলে একপাল মোষ চরার মতো আর্তনাদ যেমন শোনায়, অবিকল ঠিক সে রকমই আমার কানে বাজল। ঠিক তখনই বিশেষ একটা ঘটনার দিকে আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো। নাবিকরা যাকে আলোড়ন সৃষ্টিকারী চরিত্র আখ্যা দিয়ে থাকে, সেটা যেন একেবারেই দ্রুত, বিদ্যুৎগতিতেও বলা চলে পূর্বগামী একটা স্রোতে পরিবর্তিত হয়ে গেল। অত্যাশ্চর্য ঘনাটার দিকে আমি নিস্পলক চোখে তাকিয়ে রইলাম। আমার চোখের সামনেই সে স্রোতটায় অবিশ্বাস্য গতিবেগ সঞ্চারিত হলো। শুধু কি এই? গতির প্রাবল্য প্রতিটা মুহূর্তে বেড়ে যেতে লাগল। চোখের পলকে, মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই একেবারে ভুরুখ অবধি সম্পূর্ণ সমুদ্রপৃষ্ঠই যেন চাবুকের আঘাতে বাঁধনহারা ক্রোধে রীতিমত ফুঁসতে আরম্ভ করল।
তবে এও সত্য যে, এ আলোড়নটাকে উপকূল আর মসকোর মধ্যবর্তী অঞ্চল জুড়েই অবস্থান করতে দেখা গেল।
একটা ব্যাপার আমি স্পষ্ট লক্ষ্য করলাম, অসীম জলধারা যেন ভয়ানক আলোড়নের জন্য হাজার পরস্পর বিরোধী জলধারায় বিভক্ত হয়ে হঠাৎ অভাবনীয় বিক্ষোভে সামিল হয়েছে, ফেটে পড়ছে।
একটা বা দুটো নয়, সবগুলো স্রোত ভয়ঙ্কর ফুলে ফেঁপে অবর্ণনীয় দ্রুতগতিতে পূর্বদিকে বয়ে চলেছে। জলপ্রপাতের ক্ষেত্রে জলরাশি প্রচণ্ড বেগে পাহাড়ের গা-বেয়ে নিচে নেমে আসে, খুবই সত্য। ঠিক জলপ্রপাতের মতোই জলধারার দ্রুততা লক্ষিত হলো। জলপ্রপাতের স্রোতধারা ছাড়া অন্য কিছুর সঙ্গেই এর তুলনা চলতে পারে বলে আমার অন্তত জানা নেই।
পরিস্থিতি কিন্তু দীর্ঘসময় অপরিবর্তিত রইল না। মিনিট কয়েকের মধ্যেই সে ভয়ঙ্কর দৃশ্যটার পুরো পরিবর্তন ঘটে গেল। পানির উপরিতলের অশান্ত ভাবটা কিছুটা বদলে গেল। সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হলেও কিছুটা শান্ত তো হলই।
পানিতে ঢেউ প্রায় অদৃশ্য হয়ে এলো। ফেণাও অনেকাংশে ছড়িয়ে পড়ল। যেখানে ফেণার চিহ্নমাত্রও ছিল না সেখানে পেঁজা তুলার মতো প্রচুর পরিমাণে ফেণা জমতে আরম্ভ হলো। শেষমেশ সে ফেণাগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে পড়তে বিস্তীর্ণ অঞ্চল ঘেঁয়ে ফেলল।
কিছুক্ষণের মধ্যে ফেণাগুলো আবার একত্রে পুঞ্জিভূত হতে হতে ঘূর্ণাবর্তের ঘূর্ণমান গতির রূপ ধারণ করল।
আমি ব্যাপারটার দিকে গভীর মনোযোগ নিবদ্ধ করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার মনে হলো ঘূর্ণমান ঘূর্ণাবর্তটা যেন বৃহত্তর ঘূর্ণাবর্তের অঙ্কুর ছাড়া কিছু নয়।
অকস্মাৎ, একেবারেই অকস্মাৎ! সেটা যেন এক মাইলেরও বেশি ব্যাসার্ধযুক্ত একটা বৃত্তের আকৃতি ধারণ করল। আর ঘূর্ণাবর্তের চারদিক ঘিরে জলকণার একটা চওড়া বেষ্টণিও তৈরি হয়ে গেল।
সে ফেঁদলটার মুখের ওপর ছিটকে যাচ্ছে না।
যতদূর পর্যন্ত দৃষ্টি যায়, ভেতরের সে মসৃণকণা, চকচকে ঘন কালো রঙ বিশিষ্ট পানির প্রাচীরটা ৪৫° কোণে দিগন্তের দিকে সামান্য হেলে ঘুরতে ঘুরতে প্রচণ্ড গতিতে ধেয়ে চলেছে, আর বাতাসে ছুঁড়ে দিচ্ছে খুবই তীব্র একটা শব্দ। কেমন সে শব্দটা? কিছুটা আর্তনাদ আর কিছুটা গর্জন যেন তার সঙ্গে মিশে রয়েছে।
সে শব্দ, সে আর্তনাদটা এমনই ভয়ঙ্কর যে, নায়েগ্রার দুর্দান্ত বেগবতী জলপ্রপাতও কখনই এমন ভয়ঙ্কর শব্দ আর তীব্র যন্ত্রণার মাধ্যমে পরম পিতার কাছে আর্জি জানায় না। ভয়ঙ্কর সে শব্দটা কানে যেতেই আমার বুকের মধ্যে রীতিমত ধড়ফড়ানি শুরু হয়ে গেল।
