বিশ্রিস্বর করে অবোধ্য ভাষায় তারা আধঘণ্টা ধরে এক নাগাড়ে চিল্লাচিল্লি করল। আমরা কিন্তু সুযোগটার সদ্ব্যবহার করতে ছাড়লাম না। কৌতূহল ও বিস্ময় মাখানো। দৃষ্টিতে বিচিত্র লোকগুলোকে নিরীক্ষণ করতে লাগলাম।
শালতি চারটিই দৈর্ঘ্য পঞ্চাশ ফুট করে আর প্রস্থ পাঁচ ফুট। আর অসভ্য জংলিরা সংখ্যায় একশো দশজন।
আর তারা ইউরোপীয়দের মতো লম্বা। তবে পেশিবহুল। একনজরে দেখলেই অনুমান করা যায়, প্রত্যেকেই অমিত শক্তিধর। গায়ের রং আবলুশ কাঠের মতো ঘন কালো। মাথায় ইয়া লম্বা চুলের গোছা পিঠ পর্যন্ত ঝুলে পড়েছে।
অজানা-অচেনা কোনো জানোয়ারের চামড়া গায়ে জড়ানো। তবে চামড়ার লোমশ দিকটা ভেতরের দিকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেবলমাত্র কবজিদুটো, গোড়ালি দুটো
আর গলার কাছাকাছি চামড়াটাকে ভাঁজ করে দেওয়া কালো লোমগুলো চোখে। পড়ছে।
আর যন্ত্রপাতি? বর্শা জাতীয় অস্ত্র আর একটু বেশি রকম লম্বা গদা। সবার হাতেই কোনো-না-কোনো অস্ত্র একটা আছেই। আরও আছে। প্রতি শাতির খোলের ভেতর থেকে ডিম্বাকৃতি পাথরের স্তূপ উঁকি দিতে লাগল। ব্যস, এ পর্যন্তই।
একটু পরেই তাদের সর্দারের ইশারায় চিল্লাচিল্লি থেমে গেল। সর্দার এবার ঝট করে গলুইয়ের ওপর উঠে গেল। আমাদের নৌকার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে ইশারা করতে লাগল, আমরা যাতে নৌকা দুটোকে তাদের শাতির কাছে নিয়ে যাই।
আমরা তাদের ইশারা না-বোঝার ভান করলাম। উদ্দেশ্য তাদের শালতিগুলো থেকে সাধ্যমত নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখা। আমাদের অনীহা লক্ষ্য করে সর্দার তিনটি শাতিকে একই জায়গায় রেখে কেবলমাত্র নিজের শালতিটাকে ধীরে ধীরে চালিয়ে অগ্রসর হতে লাগল। আমাদের কাছাকাছি এসেই সে ইয়া লম্বা একটি লাফ দিয়ে আমাদের নৌকায় চলে এলো।
কোনো কথা বা কোনোরকম ইশারা না করেই সে এবার ক্যাপ্টেন গাইয়ের কাছে চলে গেল। তার পাশের আসনে বসে পড়ল। এবার জাহাজটাকে বার-কয়েক উৎসুক দৃষ্টিতে দেখে নিল। জাহাজটাকে দেখিয়ে ক্যাপ্টেন গাইকে লক্ষ্য করে বার বার বলতে লাগল ‘আসামা মু-আসামা মু। আর আগের সেই ‘লামালামা’ শব্দ দুটোও বলল বার কয়েক।
আমরা নৌকা চালিয়ে এবার জাহাজে ফিরে গেলাম। শালতি চারটি কিন্তু আমাদের পিছন ছাড়ল না। আমাদের সঙ্গে সামান্য দূরত্ব বজায় রেখে তারা পিছন পিছন চলতে লাগল। অসভ্য জংলি সর্দার জাহাজের কাছে তার শালতিটাকে দাঁড় করাল। তার চোখে মুখে বিস্ময়ের ছাপ, আর বুকে বইছে অন্তহীন খুশি। সে অনবরত দুহাতে তালি বাজাতে বাজাতে সরবে হাসতে লাগল। সে কী হাসি। মনে হল, এই বুঝি তার দম বন্ধ হয়ে এলো। সে একা নয়, পরমুহূর্তে তার দলের অন্যান্যরাও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাসতে আরম্ভ করল।
একটু পরেই সবাই এক এক করে হাসি থামিয়ে চুপ করল। অচিরেই জানতে পারলাম, সর্দারের নাম টু-উইট।
ক্যাপ্টেন গাই এবার আমাদের নৌকাটার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে সর্দারকে ইশারায় বোঝাতে চেষ্টা করলেন তার দলের বিশ জনের বেশি লোককে একসঙ্গে জাহাজে তোলা সম্ভব নয়।
সর্দার যেভাবেই হোক ক্যাপ্টেনের অভিলাষ বুঝতে পেরে সেভাবেই ব্যবস্থা করল।
একটা শালতি ধীর গতিতে জাহাজের একেবারে গায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়াল। আর বাকি তিনটি জাহাজ থেকে দূরে, একই জায়গায় দাঁড়িয়েই রইল।
ক্যাপ্টেন গাইয়ের অনুমতি পেয়ে সর্দারের তত্ত্বাবধানে বিশ জন অসভ্য জংলি এক এক করে জাহাজে উঠে এলো। জাহাজে উঠেই তারা বিস্ময়-ভরা চোখে জাহাজটাকে। দেখতে লাগল। পরমুহূর্তেই কৌতূহলের শিকার হয়ে তারা জাহাজের এটা-ওটা ধরে নাড়াচাড়া ও টানাটানি করতেও ছাড়ল না। জাহাজের জিনিসপত্রগুলো সম্বন্ধে ধারণা করে নেওয়াই তাদের ইচ্ছা।
অসভ্য জংলি মানুষগুলোর রকম সকম দেখে এ-ধারণাটাই স্পষ্ট বুঝা গেল, এর আগে তারা কোনোদিনই সাদা চামড়ার মানুষ দেখেনি।
তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ‘জেন’ একটা জীবন্ত প্রাণী। তার একমাত্র এ-বিশ্বাসের বশবর্তী হয়েই তারা হাতে বর্শা থাকতেও কিছুতেই তাকে সামান্যতম আঘাতও হানল না।
সর্দার টু-উইটের লোকদের ডেকের উপরটা দেখা হয়ে গেলে ক্যাপ্টেন গাই তাদের নীচে নিয়ে যেতে বলল। করাও হলো তা-ই। তার সেখানে পৌঁছেই যা-কিছু দেখল তাতে চোখ ট্যারা হয়ে যাবার উপক্রম হল। বন্দুক-কামান দেখে তো তারা সেখান থেকে নড়তে চায় না। টু-উইট তো রীতিমত থ বনে গেল। তার লোকজন কামান বন্দুকের গায়ে হাত লেগে যেতে পারে ভয়ে সাধ্যমত দূরে দূরে থাকতে লাগল।
কেবিনে দুটো বড় আয়না ঝুলিয়ে রাখা আছে। সে দুটোতে নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখে তো বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল।
সে কেবিনে ঢুকে মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ল। একটা আয়না তার মুখের আর পিছনের আয়না তার পিছনের দিকে দেওয়ালে আটকানো। আয়নায় নিজের মুখটা দেখেই সে তো ধরেই নিল, সে নির্ঘাত পাগল হয়ে গেছে। মুখ ফিরিয়ে দ্বিতীয়বার নিজেকে দেখতে পাওয়ামাত্র তার মুখাবয়ব এমন বদলে গেল যে, আমার তো ভয়ে আত্মা শুকিয়ে যাবার জোগাড় হল, এই বুঝি লোকটা মারা গেল।
সে অতর্কিতে মেঝেতে উপুড় হয়ে আয়নাটার সামনে পড়ে রইল। শেষমেশ আমরা তাকে অনেক বুঝিয়ে, ধরতে গেলে টেনে হিঁচড়ে ডেকের ওপর নিয়ে যেতে পারলাম।
