দীর্ঘ সময় ধরে আমরা দ্বীপভূমিতে হাঁটাহাঁটি করলাম। কিন্তু উল্লেখযোগ্য কিছুই চোখে পড়ল না।
আমরা দ্বীপভূমি থেকে ফিরে আবার জাহাজের নোঙর তুললাম। সোজা দক্ষিণ দিকে এগোতে এগোতে এক সময় আমরা আরও ৮০ ডিগ্রি এগিয়ে গেলাম।
সত্যি কথা বলতে কি, আজ পর্যন্ত যত অভিযান অনুষ্ঠিত হয়েছে তাতে আমাদের আগে কেউ-ই এ পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম হয়নি।
সমুদ্র এখন শান্ত। পুকুরের মতো নিস্তরঙ্গ না হলেও শান্তই বলা চলে।
একটা ব্যাপার আমাকে যারপরনাই অবাক করল, আমরা যতই এগোতে লাগলাম, পানি আর বাতাসের তাপমাত্রা ততই হ্রাস পাচ্ছে। ঝড়ের চিহ্নমাত্রও নেই। তবে দক্ষিণ দিকে কুয়াশার একটা হালকা চাদর যেন সমুদ্রের ওপর বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। তা-ও মাত্র কিছুক্ষণের জন্য।
এবার দুটো মাত্র সমস্যার সম্মুখীন আমরা হলাম। তাদের একটা হচ্ছে, আমাদের জ্বালানি প্রায় নিঃশেষ আর জাহাজের নাবিকদের মধ্যে একজনের মধ্যে স্কার্ভি রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে।
ক্যাপ্টেন গাই প্রায় হতাশ হয়ে পড়েছেন। আমাদের কাছে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব রাখলেন।
আমরা, বিশেষ করে আমি কিন্তু তার প্রস্তাবটাকে সানন্দে গ্রহণ করতে পারলাম না আমরা তো দৃঢ়প্রত্যয় রয়েছে যে, অচিরেই বড়সড় কোনো ডাঙা আমাদের চোখে পড়বে।
আমার দিক থেকে ফিরে যাওয়ার আগ্রহ দেখতে না পেয়ে ক্যাপ্টেন গাই একটু অবাক হলেন।
আমি তার কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ রাখলাম, মাত্র আর একটা দিন সুযোগ দেওয়ার জন্য। অর্থাৎ অন্তত আরও একদিন জাহাজটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হোক।
ক্যাপ্টেন গাই মুচকি হেসে আমার প্রস্তাবে সম্মতি দিলেন।
অতএব আমার অনুরোধ রক্ষা করতে গিয়ে জাহাজের গতি অব্যাহত রাখার জন্য যে অদৃষ্টবিড়ম্বিত মর্মান্তিক রক্তাক্ত ঘটনাগুলো ঘটে গেল, তার জন্য যেমন আজও অনুতাপ জ্বালায় দগ্ধে মরছি। ঠিক তেমনই, এ-কথা ভেবেই সংবাদ পরিবেশনার কাজে আমারও পরোক্ষ অবদান রয়েছে। কয়জনের বরাতে এমনটা ঘটে, বলুন?
.
১৮. ॥ অষ্টাদশ অধ্যায় ॥
আঠারোই জানুয়ারি। আমাদের গতি অব্যাহতই রয়েছে। চমৎকার আবহাওয়ার মধ্য দিয়ে আমরা সোজা দক্ষিণ দিকে অনবরত এগোতে লাগলাম।
পানির তাপমাত্রা তেপান্ন ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসে সামান্য উষ্ণতা অনুভূত হচ্ছে। আর সমুদ্র সম্পূর্ণ শান্ত, মৃদু, ঢেউ, বাতাসের চাপে ধীরগতিতে এগিয়ে চলেছে। মেরুর দিকে ঘণ্টায় এক মাইলবেগে একশো পঞ্চাশ বাও পানির স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে।
পানি আর বাতাস একই দক্ষিণ-দিকে প্রবাহিত হওয়ার জন্য নাবিকরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে জাহাজের এখানে-ওখানে অনুচ্চ জল্পনা কল্পনায় লিপ্ত। সবার চোখে মুখেই আতঙ্কের ছাপ সুস্পষ্ট।
আর একই ভাবনায় ক্যাপ্টেন গাইও ভাবিত। তাঁর মুখের অস্বস্তির ছাপটুকুও আমার নজর এড়াল না।
দিন ভর পানি আর আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে অগণিত অ্যাব্রাটস পাখি আর কয়েকটা অতিকায় তিমির দেখা মিলল।
দিনের শেষে যখন ফলের মতো দেখতে কিছু লাল ফুল আর একটা ফুলে ফেঁপে ওঠা বিচিত্র দর্শন একাট মৃত জানোয়ারকে সমুদ্র স্রোতে ভেসে যেতে দেখলাম। আমরা দড়ির ফাঁদ ফেলে জাহাজে তুলে নিলাম। মৃতদেহটা তিন ফুট লম্বা, ছয় ইঞ্চি উঁচু। ছোট ছোট পা চারটিতে বাঁকানো সুতীক্ষ নখ। সর্বাঙ্গ সাদা লোমে আবৃত। প্রায় দেড় ফুট লম্বা ইঁদুরের মতো একটা লেজও রয়েছে দেখলাম। আর বিড়ালের মতো প্রায় গোলাকৃতি মাথাটার দুদিকে কুকুরের ঝুলে-পড়া কান দুটোও আমার নজর এড়াল না। সব মিলিয়ে জানোয়ারটা বাস্তবিকই আমাদের চোখে অদ্ভুতই লাগল।
আঠারোই জানুয়ারির রাত কেটে উনিশ তারিখের সকাল হল। আমাদের গতি অব্যাহতই রইল। আমরা লঘিমা ৮৩°৫ এবং ৪৩°৫গ্র পশ্চিম দ্রাঘিমায় উপস্থিত হলাম। সমুদ্রের দিকে চোখ পড়তেই লক্ষ্য করলাম, এখানকার পানি অস্বাভাবিক। কালো।
আমরা মাস্তুলের ওপর থেকে আবার স্থলভূমি–মাটি দেখতে পেলাম। একটা দ্বীপপুঞ্জ-দ্বীপসমষ্টি।
দ্বীপটার ভেতরে বহু গাছপালা আছে অনুমান করে আমাদের মন-প্রাণ আনন্দে নাচানাচি শুরু করে দিল।
আমরা দ্বীপপুঞ্জটার দিকে আরও চার ঘণ্টা এক নাগাড়ে জাহাজ চালিয়ে একটা তীরের কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম। উল্লসিত হয়ে লস্কররা নোঙর ফেলল।
দুটো বড় বড় নৌকার ডার্ক পিটার্স আর আমাকেসহ সশস্ত্র একটা দলকে, পর্যবেক্ষণের জন্য ডাঙায় পাঠানো হল। পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ করার দায়িত্ব আমাদের ওপর বর্তাল।
তীর ধরে এগিয়ে একটু আধটু খোঁজাখুঁজি করতেই একটা খাড়ি আমাদের নজরে পড়ল। খড়িটার মুখে পৌঁছে ভেতরে ঢুকতে গিয়েই আমরা রীতিমত হকচকিয়ে গেলাম। দেখতে পেলাম, চারটি শালতি উপকূল থেকে যাত্রা করার জন্য তৎপরতা চালাচ্ছে।
প্রত্যেকটা শালতি সশস্ত্র মানুষে বোঝাই।
আমরা থমকে গিয়ে নৌকা থামিয়ে দিলাম। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই শালতিগুলো আমাদের কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল।
পরিস্থিতি অনুকূল নয় অনুমান করে ক্যাপ্টেন গাই একটা দাঁড়ের ডগায় এক চিলতে সাদা কাপড় বেঁধে উঁচু করে ধরে নাড়াতে লাগলেন।
সাদা কাপড়টা দেখে অপরিচিত আগন্তুকরা হঠাৎ থমকে গিয়ে দুর্বোধ্য ভাষায় হৈ চৈ জুড়ে দিল।
তারা গলা ছেড়ে যা-কিছু বলল তার একটা বর্ণের অর্থও বুঝতে পারলাম না সত্য কিন্তু দুটো শব্দ বার বার উচ্চারণ করতে শুনলাম–‘আমামু’ আর ‘লামা–লামা লামা।’
