৭ জানুয়ারিও সমুদ্র উক্তই দেখতে পেলাম। তাই অগ্রসর হতে কোনো সমস্যারই সম্মুখীন হতে হলো না। পশ্চিম দিকে কয়েকটা বরফের পাহাড় নজরে পড়ল। বিকেলের দিকে এরকমই একটা বরফের পাহাড়ের গা দিয়ে এগিয়ে যাবার সময় লক্ষ্য করে অনুমান করলাম, তার উচ্চতা সাগরপৃষ্ঠ থেকে চারশো বাও তো হবেই। আর একদম গোড়ার দিকে তার ব্যস পৌনে এক লীগ। আর তার গা-বেয়ে কয়েকটা ঝর্ণা এঁকে বেঁকে নিচে নেমে এসেছে। বরফের পাহাড়টাকে দুদিন অবধি দেখতে পেলাম। তারপরই সেটা কুয়াশার আড়ালে চলে গেল।
১০ জানুয়ারি সকাল। সকাল হতে না হতেই আমাদের একটা লোকরে আকস্মিক– মৃত্যু ঘটে গেল। সেনিউইয়র্কের অধিবাসী। পিটার ভেডেনবার্গ তার নাম। খুবই
করিতকর্তা লোক। চটপট কাজ করতে তার জুড়ি পাওয়া ভার। হঠাৎ পা হড়কে দুটো বরফের চাঁইয়ের ফাঁকে পড়ে যায়। ব্যস, আর উঠে আসা সম্ভব হলো না।
দুপুরের দিকে আমরা ৭৮০৩০ দ্রাঘিমা ৪০০১৫ পশ্চিমে হাজির হলাম। ঠাণ্ডা কনকনে ঠাণ্ডা যেন হাড়ে গিয়ে আঘাত করছে। উত্তর ও পূর্ব দিক থেকে ঝড় হিমেল বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। মাথার ওপর দিয়ে হরেক রং আর আকৃতির পাখি ঝাঁক বেঁধে উড়ে যেতে লাগল। তারা এত নিচে দিয়ে যেতে লাগল যেন হাত বাড়ালেই ধরা যায়।
১২ জানুয়ারির সকাল। ভোরের আলো ফুটতেই লক্ষ্য করলাম, দক্ষিণের পথ আমাদের জন্য আবার বন্ধ হয়ে আছে। সীমাহীন আকাশছোঁয়া বরফের প্রাচীর সদম্ভে পথ আগলে দাঁড়িয়ে। খোলা পথের প্রত্যাশা নিয়ে চোদ্দ তারিখ পর্যন্ত পশ্চিমদিকে অধীর প্রতীক্ষায় কাটালাম।
১৪ জানুয়ারি। সকাল হতেই পশ্চিমদিক ঘুরে আমাদের পক্ষে নতুন করে ভোলা সমুদ্রে পৌঁছানো সম্ভব হল। চারদিকে সন্ধানী চোখে তাকালাম। একটুকরো বরফও নজরে পড়ল না। আমাদের সবার মন আনন্দে নেচে উঠল। আশায় বুক বাঁধলাম, দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছতে পারা সম্বন্ধে আর কোনোই দ্বিধা নেই।
১৭ জানুয়ারির সকাল। সকাল হতে না হতেই একের পর এক ঘটনা ঘটতে লাগল। সত্যি আজকের দিনটা ঘটনাবহুলই বটে। হরেক রং আর আকৃতির অগণিত পাখি দক্ষিণ দিক থেকে উড়ে আসতে লাগল। আমরা বন্দুক হাতে ডেকের ওপর গিয়ে দাঁড়ালাম। আমরা সেই কয়েকটাকে গুলি করে নামিয়ে দিলাম। রান্নাবান্নার পর দেখা। গেল পেলিকান নামক অতিকায় পাখির মাংস খুবই সুস্বাদু।
দুপুরের দিকে আমরা ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে হঠাৎ দেখতে পেলাম একটা বিশালায়তন বরফের চাঁইয়ের ওপর বেশ বড়সড় একটা জানোয়ার মৌজ করে বসে ভাসতে ভাসতে অগ্রসর হচ্ছে।
আবহাওয়া স্বচ্ছ থাকার জন্য সেটা কোন জানোয়ার দেখে আসার জন্য ক্যাপ্টেন গাই দুটো নৌকা করে জন্য কয়েক লোককে পাঠিয়ে দিলেন। তাঁর অনুমতি নিয়ে পিটার্স আর আমিও তাদের সঙ্গ নিলাম। আমরা উঠলাম মেটের সঙ্গে বড় নৌকাটিতে।
সাধ্যমত দ্রুত গতিতে বৈঠা চালিয়ে বরফের চাইটার কাছে গেলাম। দেখলাম, তার ওপরে মেরু ভাল্লুক প্রজাতির অতিকায় একটা জানোয়ার বসে রয়েছে। আমাদের সঙ্গে বন্দুক থাকায় গুলি চালিয়ে দিতেই জানোয়ারটা ক্রোধে গর্জন করতে করতে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সাঁতার কেটে আমাদের নৌকার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
আমরা আবারও ক্রোধোন্মত্ত জানোয়ারটাকে লক্ষ্য করে পর পর আরও কয়েকটা গুলি চালালাম। পেটে ও মাথায় লাগল। তবুও সেটা এগোতেই লাগল।
সে সমূহ সঙ্কটাপন্ন পরিস্থিতি থেকে ডার্ক পিটার্স-ই আমাদের রক্ষা করল।
পরিস্থিতি খারাপ দেখে ডার্ক পিটার্স-ই আচমকা লাফিয়ে একেবারে তার পিঠের ওপর বসে পড়ল। ব্যস, আর মুহূর্তমাত্র দেরি না করে উন্মাদের মতো সে হাতের ছুরির ফলাটা দিয়ে ক্রোধোন্মত্ত জানোয়ারটার পেটে, পাঁজরের কাছে আর গলায় একের পর এক আঘাত হানতে লাগল।
ছুরির ফলাটা তার গলায় গেঁথে দিতেই তার ক্রোধের অবসান ঘটল। হঠাৎ । সমুদ্রের পানিতে কাৎ হয়ে এলিয়ে পড়ল।
জানোয়ারটা পানিতে এলিয়ে পড়তেই ডার্ক পিটার্সও দুম করে পানিতে পড়ে গেল।
আমরা তাকে লক্ষ্য করে নৌকা থেকে দড়ির গোছা ছুঁড়ে দিলাম। ডার্ক পিটার্স এবার মড়া জানোয়ারটাকে দড়ি দিয়ে আচ্ছা করে বেঁধে ফেলল। এবার নিজে সাঁতরে নৌকায় উঠে এলো।
আমরা শিকারটাকে নৌকার সঙ্গে বেঁধে বিজয়ী বীরের মতো জাহাজে ফিরে এলাম। জাহাজের পাচক মাংস ভালোই রান্না করে। আমরা সবাই মিলে সদ্য শিকার করা জানোয়ারটার মাংস দিয়ে মজা করে খাবার সারলাম।
আহারাদি সেরে আমরা সবে ভূঁড়িতে হাত বুলাতে ডেকের দিকে এগোচ্ছি, ঠিক সে মুহূর্তেই একজনের আনন্দ-উল্লাস কানে এলো। উত্তর্ণ হয়ে লক্ষ্য করলাম, মাস্তুলের ওপর থেকে কে যেন আনন্দে চিৎকার করছে–‘ওই ওই যে, ডাঙা দেখা যাচ্ছে। গলুইয়ের ডানদিকে–ওই যে ডাঙা দেখা যাচ্ছে।
আমরা ছুটোছুটি করে ওপরে উঠে গেলাম। তার অঙ্গুলি-নির্দেশিত পথে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তার কথার সত্যতা যাচাই করলাম। হ্যাঁ, তার কথা অভ্রান্ত। নিঃসন্দেহ হলাম, ডাঙাই বটে।
ব্যস, ব্যাপারটা সম্বন্ধে নিশ্চিত ধারণা লাভ করার পর আমাদের মধ্যে রীতিমত হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। আমরা ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে গিয়ে নিজনিজ কাজে হাত লাগালাম।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা জাহাজটাকে উপকূলের কাছাকাছি নিয়ে যেতে লাগলাম।
দেখলাম, আমাদের বহু আকাক্ষিত ডাঙাটা একটা ছোট পার্বত্য দ্বীপ। এক বিশেষ ধরনের কাঁটাগাছের ঝোঁপঝাড় ছাড়া তাকে ন্যাড়াই বলা চলে। বড়সড় কোনো গাছই দ্বীপটার কোথাও চোখে পড়ল না।
