রাশিয়ার আলেকজান্ডার ১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে ক্রুজস্তানও লিসিওস্কি ক্যাপ্তেনদ্বয়কে পৃথিবী পরিক্রমায় পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু দ্রাঘিমা ৭০°১৫ট্টি পশ্চিমের লঘিমা ৫৯°৫৮’র বেশি অগ্রসর হওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
বৃটিশ নৌবহরের ক্যাপ্টেন জেমস ওয়েডেল ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে ছোট দুটো জাহাজ নিয়ে প্রায় বিনাবাধায় দক্ষিণে আরও অনেক ভেতরে চলে গিয়েছিলেন।
এবার মার্কিন জাহাজ ওয়াসপে চেপে ক্যাপ্টেন বেঞ্জামিন মোরেল ১৮২৩ সালের ফেরগুলেন্স ল্যান্ড থেকে দক্ষিণ মেরু অভিযানে যাত্রা করেন। তিনি দিনলিপির পাতায় চোদ্দই মার্চে লেখেন–‘আমি বিভিন্ন মধ্যরেখায় কয়েকবার দক্ষিণ মেরুবৃত্তের মধ্যে প্রবেশ করেছি। পানি আর বাতাসের তাপমাত্রা প্রায় একই রকম লক্ষ্য করেছি। আর ৬০° এবং ৬৫° ডিগ্রির মধ্যে অগণিত সুবিশাল বরফের দ্বীপ অবস্থান করার জন্য আমাকে জাহাজ চালাতে খুবই বেগ পেতে হয়েছে। আর আছে বরফের দ্বীপগুলোর। মধ্যে কোনোটির ব্যস এক থেকে দুমাইল পর্যন্ত। আর সেগুলো সমুদ্ররেখা থেকে। পাঁচশো ফুটেরও বেশি উচ্চতা বিশিষ্ট।
তখন পানি আর জ্বালানির অভাব দেখা দেয়। আর উপযুক্ত যন্ত্রপাতিও তাঁর সঙ্গে ছিল না সামনে বিস্তীর্ণ সমুদ্র অবস্থান করা সত্ত্বেও ক্যাপ্টেন মোলেয়ের পক্ষে ফিরে না গিয়ে উপায় ছিল না। উপরোক্ত অত্যাবশ্যক সামগ্রি সঙ্গে থাকলে তিনি আরও অগ্রসর হতেন–এটাই স্বাভাবিক আর তিনি নিজের স্বীকার করেছেন, অনিবার্য কারণ দেখা না দিলে তিনি দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম না হলেও অন্তত পঁচাশিতম সমান্তরাল রেখা পর্যন্ত অবশ্যই চলে যেতেন। কিন্তু তাঁর আশা সফল হলো না।
ক্যাপ্টেন ব্রিস্কো যে অঞ্চলে পরবর্তী পুরো মাসটাই অতিবাহিত করেন। ভাগ্য মন্দ। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া তার প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তার পক্ষে কিছুতেই তীরে নামা সম্ভব হয়নি।
১৮৩২ খ্রিস্টাব্দের কথা। সে বছরে প্রথমের দিকে তিনি আরও দক্ষিণ দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম হন।
ফেব্রুয়ারি মাসের চার তারিখে তিনি একটি মূল ভুখণ্ডে নামলেন। সে কী আনন্দ তার। প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে তার দ্বীপটার নামকরণ করলেন এডেলেড দ্বীপ।
ক্যাপ্টেন ব্রিস্কোর সাফল্যের কথা জানতে পেরে লন্ডনের রয়্যাল জিয়োগ্রাফিক্যাল সোসাইটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সেখান থেকে অনেক ভেতর পর্যন্ত একটা ভূখণ্ড অবশ্যই। অবস্থান করছে। মি. রেনল্ডসের প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন–আমরা এ বক্তব্য স্বীকার করে নিতে উৎসাহ পাচ্ছি না। আচ্ছা এ রকম অনুমানকে ব্রিস্কোর আবিস্কারও সমর্থন করে না। অতএব এ অনুমানকে মেনে নেওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়।’
উপরোক্ত অভিযানগুলোই দক্ষিণ মেরু অভিযানগুলোর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
কিছুক্ষণ পরেই জানতে পারা যাবে, জেন’-এর সমুদ্র অভিযানের আগে প্রায় ৩০০০ দ্রাঘিমা পর্যন্ত দক্ষিণ মেরু বৃত্তের অভ্যন্তরে কোনো অভিযাত্রীই প্রবেশ করতে সক্ষম হননি।
সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের সামনেও এক অনাবিস্কৃত সুবিমাল ভুখণ্ড অবস্থান করছিল। আমি ক্যাপ্টেন গাই-কে আগ্রহের সঙ্গে বলতে শুনেছি–আমি সাহসে ভর করে আরও দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। আমাকে অগ্রসর হতেই হবে।
.
১৭. ॥ সপ্তদশ অধ্যায় ॥
গ্লাসের বর্ণিত দ্বীপপুঞ্জের খোঁজ করা থেকে আমরা বিরত থাকলাম। আমরা চারদিন একনাগাড়ে জাহাজ চালিয়ে আরও দক্ষিণদিকে ক্রমেই অগ্রসর হতে লাগলাম।
ইতিমধ্যে আমরা যতটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি তার মধ্যে কোথাও সামান্যতম বরফও দেখতে পেলাম না।
আমাদের গতি অব্যাহতই রইল। চব্বিশ তারিখের দুপুরের দিকে কয়েকটা বরফের দ্বীপ আমাদের নজরে ধরা পড়ল। দ্বীপ বটে, কিন্তু সেগুলোর আয়তন তেমন বেশি নয়।
এবার থেকে আমাদের চলার পথে প্রতিদিনই কম-বেশি বরফ দেখা যেতে লাগল।
২৭ তারিখে থার্মোমিটারে পারদ পঁয়ত্রিশ পর্যন্ত উঠল।
১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দের পয়লা জানুয়ারি। আজ আমরা বরফে পুরোপুরি আটক হয়ে গেলাম। অতএব আমাদের ভবিষ্যৎ বিষণ্ণতায় ভরপুর। দুপুরের কিছু আগে মাঝারি ধরনের ঝড় হল। দিনের শেষে ঝড় বাড়তে বাড়তে সন্ধ্যার দিকে ঝড়ের তাণ্ডব আরও বেড়ে গেল। ঝড়ের তাণ্ডব বেড়ে যাওয়ায় সামনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের বরফের চাই ধসে গিয়ে বেশ কিছুটা জায়গা পরিষ্কার হয়ে গেলো। আমরা আনন্দে লাফালাফি শুরু করে দিলাম। ব্যস্ততার সঙ্গে জাহাজের পাল তুলে দিলাম। পালে প্রবল বাতাস লাগায় জাহাজ দ্রুতগতিতে ছুটতে লাগল।
২ জানুয়ারি। ঝড়ের তাণ্ডব থেমে গিয়ে আর হাওয়া মোটামুটি শান্ত হয়ে এসেছে। আমাদের জাহাজ উল্কার বেগে ছুটে দুপুরের মাঝামাঝি মেরুবৃত্ত অতিক্রম করল। দক্ষিণ দিকে ঘণ্টায় দুমাইল বেগে সমুদ্র স্রোত প্রবাহিত হতে লাগল। বাতাসে তাপমাত্রা প্রায় ৩৩০ সেঃ।
৫ জানুয়ারি। আমরা ৪২০ ১০ পশ্চিম দ্রাঘিমা, লঘিমা ৭৩০ ১৫ পূর্বে উপস্থিত হলে আবার আমাদের ভাগ্য বিপর্যয় ঘটল। আমরা আবার বরফে অবরুদ্ধ না হলেও কঠিন বরফ পথরোধ করল। তখনও আমাদের দক্ষিণে অনেকটা উন্মুক্ত সমুদ্র চোখের সামনে ভেসে উঠল। এক সময় সেখানে যে পৌঁছতে পারবই এতে কোনো দ্বিধা নেই।
আর একটু এগোতেই প্রায় মাইল খানেক চওড়া একটা পথের হদিশ পেয়ে সূর্য পাটে না বসা অবধি সে পথ বেয়ে আমরা অগ্রসর হতে লাগলাম। দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে উত্তর-পশ্চিম দিকে একের পর এক ঝাঁক অ্যালবেট্রস পাখি আমাদের চোখের সামনে দিয়ে উড়ে যেতে লাগল।
