তবে সেখান থেকে বাড়ি ফেরার পর দেখছি, ‘হেনরি’ নামক মার্কিন জাহাজ নিয়ে ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে ক্যাপ্টেন জনসন, আর ‘ওয়াস্প’ নামক মার্কিন জাহাজ নিয়ে ক্যাপ্টেন মোলে সে দ্বীপাঞ্চলে হাজির হয়েছিলেন। আর এও জানতে পেরেছি তাঁদের উভয়ের বরাতে আমাদের মতোই ফল লাভ হয়েছিল।
.
১৬. ॥ মোড়শ অধ্যায় ॥
১২ ডিসেম্বর। ক্যাপ্টেন গাই গর্ভনর গ্ল্যাসের পরামর্শ মাফিক ৬০° দক্ষিণ এবং ৪১.২° পশ্চিম সমান্তরালবর্তী কয়েকটা ছোট ছোট দ্বীপ আবিষ্কারের প্রত্যাশা নিয়ে সেই দিকে জাহাজ ছুটিয়ে নিলেন। তীব্র গতিতে জাহাজ ছুটে চলল।
১৮ ডিসেম্বর। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ক্যাপ্টেন গাই জাহাজ নিয়ে সে অঞ্চলে পৌঁছলেন। একনাগাড়ে তিন-তিনটি দিন জাহাজ নিয়ে সমুদ্রের বুকে চক্কর মেরে সে রকম কোনো দ্বীপের চিহ্নও দেখতে পেলেন না।
২১ তারিখ। আবহাওয়া অভাবনীয় মনোরম। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, দক্ষিণ দিকে যতদূর সম্ভব এগিয়ে যাব।
আমাদের সমুদ্রযাত্রার এ অংশটুকু শুরু করার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত দক্ষিণ মেরু আবিষ্কারের যে কয়েকবার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে তার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র পাঠকদের সামনে তুলে ধরলে হয়তো তাঁদের পক্ষে এ ব্যাপারে ধারণা নেওয়া সহজতর হবে। এ-কথা বিবেচনা করে এখন সে চেষ্টাই করছি।
ক্যাপ্টেন কুক সর্বপ্রথম এ রকম অভিযানে আত্ম নিয়োগ করেন। ক্যাপ্টেন কুক ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে রেজোলিউশন’ জাহাজে চড়ে আর ক্যাপ্টেন কাশের ‘অ্যাডভেঞ্চার নামক জাহাজটা সঙ্গে নিয়ে দক্ষিণ মেরুর উদ্দেশে যাত্রা করলেন। তিনি ডিসেম্বর মাসে আট-পঞ্চাশ সমান্তরাল দক্ষিণ দ্রাঘিমা এবং ২৬০২৭ পূর্ব দ্রাঘিমা পর্যন্ত হাজির হয়ে যান।
জায়গাটা বরফের রাজ্য। যেদিকে, যতদূর দৃষ্টি চলে কেবল বরফ আর বরফ। আট-দশ ইঞ্চি পুরু হয়ে বরফ জমে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জাহাজ চালানো নিতান্তই অসম্ভব ব্যাপার। সেখানে হরেক রং আর আকৃতিবিশিষ্ট পাখির ঝাঁক দেখে ক্যাপটেন কুক নিঃসন্দেহ হলেন ধারে কাছেনির্ঘাৎ স্থলভূমি আছে।
স্থলভূমির দেখা পাওয়ার প্রত্যাশা বুকে নিয়ে ক্যাপ্টেন কুক সোজা দক্ষিণ দিকে জাহাজ নিয়ে অগ্রসর হতে লাগলেন। আবহাওয়া মাত্রাতিরিক্ত ঠাণ্ডা তিনি এরই মধ্যে ৩৮°১৪’ পূর্ব দ্রাঘিমায় পৌঁছে গেলেন। এখানে থার্মোমিটার ৩৬০-তে অবস্থান করছে, আর আবহাওয়াও মোটামুটি মনোরম।
একইভাবে পর পর পাঁচদিন অতিক্রান্ত হয়ে গেল। সতেরোশ’ তিয়াত্তরে জাহাজ দক্ষিণ মেরু পেরিয়ে গেল সত্য, কিন্তু আর এগোতে পারল না।
এবার ৬৭°১৫’ লঘিমাতে হাজির হওয়ার পর তাদের নজরে পড়ল, দক্ষিণ দিকে আকাশচুম্বী বরফের প্রাচীর যমদূতের মতো পথ আগলে দাঁড়িয়ে। অতএব এগিয়ে। যাবার পথ রুদ্ধ। তাই উপায়ান্তর না দেখে ক্যাপ্টেন কুক এবার জাহাজের মুখ ঘুরিয়ে উত্তর দিকে এগোতে লাগলেন।
ক্যাপ্টেন কুক পরের নভেম্বরে নতুন করে দক্ষিণ মেরু আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন।
ডিসেম্বরের গোড়ার দিকে জাহাজ ১৪২°৫৪’ পশ্চিম দ্রাঘিমা এবং ৬৭°৩১’ লঘিমায় পৌঁছলে তারা ঠাণ্ডার প্রকোপে পড়লেন। আর সে সঙ্গে বিধ্বংসী ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয়ে গেল। কুয়াশাও পুরু আস্তরণ সৃষ্টি করে প্রকৃতিকে ঢেকে রেখেছে। তবে যা মনে পুলকের
সঞ্চার করল তা হচ্ছে, হরেক রঙ আর আকৃতিবিশিষ্ট পাখি। তাদের মধ্যে বিশেষ করে নাম করতে হয় পেঙ্গুইন, প্রেটেন আর অ্যালব্যাট্রস প্রভৃতি অতিকায় পাখির।
লঘিমা ৭০°২৩’ তে পৌঁছে দেখা গেল, বরফের অতিকায় বহু দ্বীপ। আর বরফের মতো সাদা দক্ষিণের মেঘ। ক্যাপ্টেন কুক অনুমানে ধরে নিলেন, ধারে কাছেই হয়তো বরফের দেশ অবস্থান করছে।
১০৬°৪৫’ পশ্চিম দ্রাঘিমা ৭১°১০’ লঘিমার দক্ষিণে এগোতে গিয়ে ক্যাপ্টেন কুক লক্ষ্য করলেন, দিগন্তব্যাপী বরফের চাই পথরোধ করে বরফ সদম্ভে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে। আর সে প্রান্তরের উত্তর ভাগ তো বটেই, আর ভাঙা ভাঙাও। লম্বা-লম্বা বরফের চাঁই খুঁটির মতো এমন মাথা উঁচিয়ে রয়েছে যে, সেগুলোকে অতিক্রম করে অগ্রসর হওয়ার চিন্তা একেবারেই অবাস্তব। আর এরই পিছনে লক্ষিত হচ্ছে। আকাশচুম্বী বরফের পাহাড়। একটা নয়, একের পর এক পাহাড়ের শ্রেণি।
ক্যাপ্টেন কুক অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে পরিবেশটাকে দেখে নিয়ে অনুমান করলেন, এমনও হতে পারে এমন পরিবেশটা হয় দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, নয়তো কোনো মহাদেশের সঙ্গে মিশে গেছে।
পরবর্তীকালে মেরু অঞ্চল আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে গঠিত জাতীয় অভিযান কমিটির প্রধান হোতা মি. জে. এন. রেনল্ডস রেজোলিউশের প্রয়াস সম্বন্ধে মন্তব্য করেছেন ক্যাপ্টেন কুক যে ৭১°১০’ পেরোতে সক্ষম হননি তাতে কিন্তু আমরা এতটুকুও অবাক হইনি। কিন্তু অবাক হচ্ছি তিনি ১০৬°৫৪’ পূর্ব দ্রাঘিমার মধ্যরেখায় পৌঁছতে সক্ষম না হওয়ার জন্য।
‘পার্মাসল্যান্ড’ শেটল্যান্ডের দক্ষিণ ও পশ্চিম থেকে অধিকতর দক্ষিণ এবং পশ্চিমে বিস্তৃত হয়ে রয়েছে। আজ পর্যন্ত কোনো নাবিকের পক্ষে সেখানে উপস্থিত হওয়া কিছুতেই সম্ভব হয়নি। আর ক্যাপ্টেন কুকের অভিযান সেখানেই অবরুদ্ধ হয়েছিল। তীব্র আকাঙ্খা থাকা সত্ত্বেও বরফের জন্য তিনি রণে ভঙ্গ দিয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হন।
