ব্যাপারটার দিকে সরকারের নজর পড়ল। সরকার এর দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্তনিল। শেষপর্যন্তনিলও।
সরকার পক্ষ থেকে নাবিক ব্যারণ ডি কারগুলেমকে দ্বীপটাকে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে পর্যবেক্ষণ করে বিশদভাবে বিবরণ পেশ করার জন্য নিযুক্ত করল।
ব্যাস, এ কাজ করতে গিয়ে ভুলটা নজওে পড়ে গেল। পরবর্তীকালে, সতেরশ সাতাত্তর খ্রিস্টাব্দে ক্যাপ্টেন কুক সে দ্বীপটায় জাহাজ নোঙর করেন। তিনি দ্বীপটাকে ঘুরেফিরে দেখে এর নামকরণ করলেন ‘নির্জন দ্বীপ’। আর সেটা পাহাড়ে ঘেরা ও সবুজে ঢাকা। পাহাড়গুলোর শিখর দেশ সর্বদা বরফাবৃত থাকলেও তারা কিন্তু খুব উঁচু নয়। তিনি এও বুঝতে পারলেন, সেখানকার বহু দ্বীপের মধ্যে সুযোগ সুবিধার দিক থেকে ক্রিস্টমাস দ্বীপই সেরা। আর অন্য দ্বীপগুলোর কোনো-না-কোনো সমস্যা আছেই।
আমাদের জাহাজ জেন গাই ক্রিস্টমাস বন্দরে নোঙর করা মাত্র প্রধান মেট জাহাজ থেকে নৌকা সমুদ্রের বুকে নামিয়ে দিলেন। সেটা নিয়ে তিনি সীল মাছের সন্ধানে যাত্রা করলেন। আর ক্যাপ্টেন ও তার এক যুবক আত্মীয় জাহাজেই রয়ে গেলেন। শুনলাম, দ্বীপের ভেতরে তাদের কি যেন একটা কাজ রয়েছে।
এক সময় আমি দেখলাম, ক্যাপ্টেন মুখ আঁটা একটা চিঠি বোতলের মধ্যে ভরে তার ছিপিটা এঁটে দিলেন। তারপর সেটাকে হাতে নিয়ে তিনি সেখানকার উচ্চতম পাহাড়টার দিকে অগ্রসর হলেন। তাঁর উদ্দেশ্য–আমার জানা নেই, জানার চেষ্টা করার প্রয়োজন বোধ করেনি।
ডার্ক পিটার্স আর আমি করার মতো কোনো কাজ না থাকায় সীল মাছের সন্ধানে। উপকূল ধরে এগোতে লাগলাম।
প্রায় তিন মাস ধরে চেষ্টা চালিয়ে আমরা মাত্র তিনশো পঞ্চাশটা সীল মাছ শিকার করে তাদের চামড়া জাহাজে আনতে পারলাম।
এগারো দিন বাদে আমরা জাহাজে ফিরে এলাম। ক্যাপ্টেন গাই আর তার ভাইপো জাহাজেই রয়েছে দেখলাম। আমরা আবার তাদের সঙ্গে মিলিত হলাম। তাদের মুখে গল্প শুনে আমরা জানতে পারলাম সারা দ্বীপটা ঘুরে তারা নিঃসন্দেহ। হয়েছেন, স্থানটা জনমানবশূন্য।
ফেরগুলেম দ্বীপে আর থাকার দরকার নেই মনে করায় আমরা অহেতুক সেখানে জাহাজটাকে আর দাঁড় করিয়ে রাখার প্রয়োজন বোধ না করায় সেখান থেকে আমরা নোঙর তুললাম।
জেনগাই বন্দর ছেড়ে গভীর সাগরের দিকে এগিয়ে চলল।
ন্যারেটিভ আর্থার গর্ডন পাম – ১৫
১৫. ॥ পঞ্চদশ অধ্যায় ॥
জেন গাই জাহাজটা উত্তরদিকে অগ্রসর হতে হতে এ দ্বীপ সে দ্বীপ ঘুরতে ঘুরতে পনেরো দিন বাদে আকুনহা দ্বীপে হাজির হল।
এ দ্বীপপুঞ্জটা তিনটি গোলাকার দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। এটা পর্তুগিজ নাবিকরা প্রথমে আবিষ্কার করেছিল।
তারপর ১৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে ওলন্দাজ নাবিকরা সেখানে জাহাজ ভেড়ায়।
১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে সেখানে হাজির হয় ফরাসি নাবিকরা। এরা সবাই দ্বীপপুঞ্জটার অবস্থান ও গঠন বৈচিত্র্য দেখে যারপরনাই মুগ্ধ হয়।
দ্বীপ তিনটার সমন্বয়ে একটা ত্রিভুজাকৃতি ভূখণ্ড গড়ে উঠেছে। একটা দ্বীপ থেকে অন্যটায় যেতে হলে প্রায় দশ মাইল সাগর পাড়ি দিতে হয়।
সবকটা দ্বীপই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বেশ উঁচু। তবে সবচেয়ে উঁচু দ্বীপটাকে আশি নব্বই মাইল দূর দিয়ে জাহাজ নিয়ে পাড়ি দেবার সময়ও স্পষ্ট নজর পড়ে।
সবুজ বনানীতে ছাওয়া এবং সাগরে ঘেরা দ্বীপটার আকৃতি ও গঠন বৈচিত্র্যে যে কোনো সৌন্দর্য পিপাসুর মনকে প্রভাবিত করবে সন্দেহ নেই।
দ্বীপগুলোর উপকূলে বিভিন্ন আকৃতির সামুদ্রিক পাখি ও সীল মাছের প্রাচুর্যের জন্য প্রথম প্রথম ফরাসি আর ওলন্দাজরা প্রায়ই পালতোলা জাহাজ নিয়ে ঘুর ঘুর করত।
তারপর ফিলাডেলফিয়ার ক্যাপ্টেন প্যাটেন ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে ‘ইন্ডাস্ট্রি’ নামক এক পাল তোলা জাহাজ নিয়ে এখানে আসেন। তখন তিনি কম করেও পাঁচ হাজার দুশ সীল মাছ ধরেন ও চামড়া সংগ্রহ করেন। আর তিনি এও বলেন, তিনি সপ্তাহের মধ্যে চর্বি দিয়ে জাহাজ বোঝাই করে নিতে পারতেন।
এ ঘটনার কিছুদিন বাদে মার্কিন মুলুকের ক্যাপ্টেন কুশকোহন, ‘বেটিসির জাহাজের মালিক এখানে হাজির হন। তিনি শিকারে উৎসাহি ছিলেন না। তাই তিনি দ্বীপভূমিতে আলু, পিয়াজ আর কপির চাষ শুরু করেন। তারপর থেকেই সেখানে প্রচুর পরিমাণে সজি পাওয়া যায়।
এবার ক্যাপ্টেন হেউড ‘নেরেয়ূস’ নামক জাহাজে চেপে ১৮১১ খ্রিস্টাব্দে ‘ত্রিস্তান’ এ হাজির হন। তখন তিনি জন মার্কিন মুলুকের মানুষকে তিনি সীলের চামড়া ও চর্বির কারবার করতে দেখেছিলেন। রমরমা কারবার। এক সময় গ্লাস নামধারী বৃটিশ গোলন্দাজ বাহিনীর এক প্রাক্তন কর্পোরাল তো এই দ্বীপের সুপ্রিম প্রভু গভর্ণরের পদে নিযুক্ত ছিলেন। বিশজন পুরুষ ও নারী কর্মী তার অধীনে কাজ করতেন।
আমরা যখন এ দ্বীপে হাজির হই তখনও গ্ল্যাস দ্বীপের গভর্ণরের পদে কাজ করছেন। তবে তার সংসার তখন বেড়ে বেড়ে ষাট-সত্তরে দাঁড়িয়ে গেছে।
ক্যাপ্টেন গাই-এর সঙ্গে দেখা করলেন। দর দস্তুর করে তিনি তাঁর কাছ থেকে কিছু হাতির দাঁত আর পাঁচশো সীলের চামড়া খরিদ করেন। জাহাজের লস্কররা সেগুলোকে জাহাজে তুলেনিল।
পাঁচই নভেম্বর। আমাদের জাহাজ আরও দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত অরোরা দ্বীপপুঞ্জের দিকে ছুটে চলল। তিনি তিনটি সপ্তাহ ধরে জাহাজটা এক নাগাড়ে ছোটার পরও কোনো দ্বীপ আমাদের নজরে পড়ল না। অবশ্য কোনো দ্বীপ এ-পথে আদৌ আছে কিনা আমার অন্তত জানা নেই।
