তারপর মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যেই আমরা দুজন–ডার্ক পিটার্স আর আমি নবাগত বৃটিশ জাহাজটার কেবিনে আশ্রয় পেলাম। জাহাজটার নাম ‘জেন গাই’। লিভারপুল থেকে এসেছে। তবে যাত্রী-জাহাজ নয়। আগে ভুল অনুমানই করেছিলাম। সীলমাছ শিকার আর বাণিজ্যিক যাত্রা চলেছে। ক্যাপ্টেন গাই একে প্রশান্ত মহাসাগর আর দক্ষিণ সাগর অঞ্চলে নিয়ে চলেছেন। আমরা নিশ্চিত মৃত্যুর কবল থেকে অব্যাহতি পাওয়ায় নতজানু হয়ে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ না জা নিয়ে পারলাম না।
.
১৪. ॥ চতুর্দশ অধ্যায় ॥
‘জেন গাই’ জাহাজটার আয়তন বাস্তবিকই সুবিশাল। বহু পাল বিশিষ্ট। আর তার গঠন প্রকৃতিও চোখে লাগার মতোই বটে। ১৮০ টন মাল বহন করার ক্ষমতা রাখে। কেবল এই নয় চলে দ্রুতগতিতে। অস্বীকার করব না, ইতিপূর্বে আমি কোনোদিনই এমন দ্রুতগামিসম্পন্ন জাহাজ দ্বিতীয় আর একটি দেখিনি।
খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, জাহাজে পঁয়ত্রিশজন নাবিক কাজে নিযুক্ত। আর আছেন ক্যাপ্টেন ও মেট। একটা ব্যাপার আমার নজর এড়ালো না। বাণিজ্য-জাহাজের বিপদ তো যে কোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে। সে রকম সম্ভাব্য বিপদ আপদের কবলে পড়লে নিষ্কৃতি পাওয়ার মতো অস্ত্রপাতিতে জাহাজটা সুসজ্জিত নয়। অর্থাৎ আত্মরক্ষার ব্যবস্থাদি তো খুবই সাধারণ।
সামান্য পরিচয়ের মাধ্যমেই বুঝতে পারলাম, ক্যাপ্টেন গাই যথার্থই একজন সজ্জন। দক্ষিণ অঞ্চলে সমুদ্রযাত্রায় তার অভিজ্ঞতা যথেষ্ট। জীবনের একটা বড় অংশ তিনি এ-কাজেই নিজেকে লিপ্ত রেখেছেন। তবে একটা কথা খুবই সত্য যে, সে গুরুদায়িত্ব মাথায় নিয়ে তিনি জাহাজ ভাসিয়েছেন সে কাজে তার চরিত্রে অত্যাবশ্যক কর্মদক্ষতা এবং প্রয়োজনীয় উৎসাহ উদ্দীপনার কিছু আছেই।
ক্যাপ্টেন যে জাহাজটা নিয়ে যাত্রা করেছেন তিনি সেটার মালিকানার একজন অংশীদার। আর যে কোনো রকম বাণিজ্য সম্পদ নিয়ে দক্ষিণ অঞ্চলের সমুদ্রের বুকে হরদম যাতায়াত করার হিম্মৎ তিনি রাখেন। তাই তো তিনি হরেকরকম দ্রব্যসামগ্রিতে জাহাজটা বোঝাই করে নিয়েছেন।
দশই জুলাই জেন গাই জাহাজটা লিভারপুল বন্দর ছেড়ে এসেছে। পঁচিশে জুলাই কর্কটক্রান্তি রেখা অতিক্রম করেছে। আর উনত্রিশ তারিখে ভার্ড দ্বীপপুঞ্জেও হাজির হয়েছে। সেখান থেকে নুন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রি জাহাজে তুলেছে।
ভাউস অন্তরীপ থেকে গাই নোঙর তুলেছে তেসরা আগস্ট। সেখান থেকে যাত্রা করে দক্ষিণ পশ্চিম উপকূল ধরে ব্রাজিলের দিকে ঘুরে গেছে, সেখান থেকেই বিষুবরেখাকে অতিক্রম করার লক্ষ্য নিয়ে।
ইউরোপ থেকে উত্তমাশা অন্তরীপগামী জাহাজগুলো সাধারণত সে পথেই যাতায়াত করে। অথবা পূর্বভারতীয় দ্বীপপুঞ্জেও যেতেও সেই পথই ব্যবহার করে।
ক্যাপ্টেন গাই কেন যে কেরগুলেন্স ল্যাণ্ড-এ প্রথম যাত্রাবিরতির ইচ্ছা অন্তরে পোষণ করতেন তা আমার জানা নেই।
ক্যাপ্টেন গাই যেদিন আমাদের অসহায় অবস্থা থেকে রক্ষা করার সুমহান উদ্দেশ্য আমাদের তুলে নিয়েছিলেন, সেদিন সেন্ট রোখ অন্তরীপে, পশ্চিমে ৩১° ডিগ্রি দ্রাঘিমায় জাহাজটা অবস্থান করছিল। অর্থাৎ তখন আমরা অন্তত ৩৫ ডিগ্রি উত্তর থেকে দক্ষিণে ভেসে চলে এসেছিলাম। ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য হলেও সম্পূর্ণ সত্য।
আমাদের জেন গাই জাহাজে তুলে নিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকেই যে কেবল রক্ষা করেছিল তা-ই নয়, সহানুভূতিপূর্ণ আচরণও করতে লাগলেন।
আমরা আশ্রয় লাভের পর এক পক্ষকালের মধ্যেই ডার্ক পিটার্স আর আমি পুরোপুরি সুস্থ স্বাভাবিকতা ফিরে পেলাম। দীর্ঘদিন ধরে কু-গ্রহের খপ্পরে পড়ে আমরা যে অন্তহীন দুঃখ-যন্ত্রণা ভোগ করেছি আজ সেসব কথা ভাবলে নিতান্তই দুঃস্বপ্ন বলে মনে হতে লাগল। তা যেন আমাদের জীবনে বাস্তবে ঘটেনি।
পর পর কয়েকটা সপ্তাহ কেটে গেল। ইতিমধ্যে বলার মতো কোনো ঘটনাই ঘটেনি।
ষোলই সেপ্টেম্বর। জাহাজটা উত্তমাশা অন্তরীপের কাছাকাছি সমুদ্রে হাজির হল। এই প্রথম সেটা প্রলয়ংকর একটা ঝড়ের কবলে পড়ল।
তীব্র ঝড় ঝাঁপটার মধ্যে দিয়ে আমাদের সারাটা রাত কাটল। জাহাজটা এই ডোবে কি সেই ডোবে।
পূর্ব-আকাশে রক্তিম ছোপ ফুটে উঠল। ভোরের দিকে ঝড়ের তাণ্ডব কেটে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে উঠল।
ক্যাপ্টেন গাই ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে আমাকে বললেন ‘আমাদের ভাগ্যের জোর আছে বটে। ঝড়টা অল্পের ওপর দিয়েই আমাদের রেহাই দিয়ে গেল। এ অঞ্চলের ঝড় অধিকাংশ সময়েই খুবই প্রলয়ংকর হয়ে থাকে।
সেটা ছিল ১৩ অক্টোবর। আমরা দূর থেকে প্রিন্স অ্যাডয়ার্ড দ্বীপটা দেখলাম। ৩৭° ৪৬, পূর্ব দ্রাঘিমা ৪৫° ৪৩ দক্ষিণ দ্রাঘিমায় সেটা অবস্থিত। অর্থাৎ ষোলই অক্টোবর আরও দুদিন একনাগাড়ে চলার পর জেনগাই ক্রোজেট দ্বীপ ছাড়িয়ে গেল।
১৮ তারিখে দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের বুকে অবস্থিত ফেরগুলেন দ্বীপে আমরা হাজির হলাম। আর সেখানেই আমরা ক্রিস্টমাস বন্দরে জাহাজ নোঙর করলাম।
ফেরগুলেন দ্বীপটা উত্তমাশা অন্তরীপ থেকে পূর্ব দক্ষিণে প্রায় ৮০০ লীগ দূরে অবস্থান করছে।
১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে এ দ্বীপটা আবিষ্কৃত হয়। আবিষ্কর্তা ফরাসি নাবিক ডি ফেরগুলে। তিনি ধারণা করেছিল, এ-দ্বীপটা সুবিশাল দক্ষিণ মহাদেশের একটা অংশ।
দ্বীপটা আবিষ্কারের খবরটা ব্যারণ ডি কারগুলেম নিজের দেশে পাঠিয়ে দিলে সেখানে তো রীতিমত হৈ হৈ রৈ রৈ পড়ে যায়।
