সেই অসহায় অবস্থায় আমার সবচেয়ে বড় ভয় হাঙরের পেটে গিয়ে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে না হয়। একটু আগেও তো যমদূতদের ধারে কাছেই ছোঁক ছোঁক করতে দেখেছি। তারা যাতে কাছে ঘেঁষতে না পারে সেজন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি করে, প্রচুর পরিমাণে পানি ছিটিয়ে ঢেউয়ের তালে তালে এগোতে লাগলাম।
আমার ভাগ্যের জোর আছে বটে। নিতান্ত ভাগ্যের জোরেই কোনোরকমে জাহাজটার কাছে পৌঁছতে পারলাম। কিন্তু সে মুহূর্তে ক্লান্তিতে হাত-পা এমন অবশ হয়ে পড়েছিল যে পিটার্সের সার্বিক সাহায্য সহযোগিতা ছাড়া আমার পক্ষে জাহাজে ওঠা কিছুতেই সম্ভব হত না। সে জাহাজের খোলের ওপর উঠে একটা কাছি ঝুলিয়ে দেয়, আমি সেটা ধরে ঝুলতে ঝুলতে জাহাজে উঠে যাই।
কোনোরকমে এখনকার মতো ভয়ানক বিপরীত অবস্থা থেকে অব্যাহতি পেলাম। এবার সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, নিশ্চিত নিরম্বু উপবাস। ডেকে যৎসামান্য খাবার দাবার যা-কিছু ছিল সবই জাহাজ উলটে যাওয়ায় ঢেউয়ের ঝাঁপটায় সাগরের পানিতে স্থান নিয়েছে।
অদূর ভবিষ্যতে খাবার-দাবার মেলার কোনো সম্ভাবনাই দেখছি না। হতাশা আর হাহাকার বুকে নিয়ে আমার দুজনই অবোধ শিশুর মতো বিলাপ পেড়ে কাঁদতে লাগলাম। জানি, কান্নাকাটি করা নিরর্থক, তবু মন মানবে কেন?
যাবতীয় মন্দেরই একটা ভালো দিক হয়তো থাকে। এক্ষেত্রেও তা অবশ্যই লক্ষিত হল। আমরা কাঁদতে কাঁদতে উদভ্রান্তের মতো হাঁটাহাঁটি করতে করতে একেবারে অপ্রত্যাশিতভাবেই হঠাৎ আবিষ্কার করে ফেললাম এক ধরনের সামুদ্রিক গেঁড়ি জাহাজটার তলা থেকে খোল পর্যন্ত দু-তিন ফুট জায়গা জুড়ে সেঁটে রয়েছে।
গেঁড়ি খাদ্য হিসেবে উপাদেয়, আর পুষ্টিগুণও যথেষ্টই বর্তমান।
হিসাব করে দেখলাম অপ্রত্যাশিতভাবে সে খাদ্যবস্তু আমাদের হাতের মুঠোর মধ্যে চলে এসেছে, তা দিয়ে আমরা অনায়াসেই অন্তত এক মাস তো কাটিয়ে দিতে পারবই।
অভাবনীয় উপায়ে আমাদের খাবারের সমস্যা মিটলেও পানীয় জলের সমস্যা আরও তীব্রতর রূপ নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হল।
ডার্ক পিটার্স রাতে কোনোরকমে চোখ বুজতে পারলেও আমি কিন্তু তীব্র পানিতৃষ্ণার কষ্টের জন্য দুচোখের পাতা কিছুতেই এক করতে পারলাম না। এভাবে বিদ্রি রাত কাটালাম। সে কী দূর্বিষহ যন্ত্রণাদায়ক ব্যাপার তা একমাত্র ভুক্তভোগি ছাড়া অন্য কারো পক্ষে উপলব্ধি করা কিছুতেই সম্ভব নয়।
পাঁচই আগস্টের সকাল। হালকা বাতাসের চাপে আমরা সামুদ্রিক শ্যাওলার দামের ভেতর দিয়ে ধীর মন্থর গতিতে অগ্রসর হতে লাগলাম।
নিছকই ভাগ্যের জোরে আমরা শ্যাওলা দামের ভেতর থেকে এগারোটা ইয়া বড় বড় কাঁকড়া ধরে ফেললাম। সেগুলো দিয়ে আমরা দুজনে মৌজ করে আহার সারলাম। আশ্চর্য ব্যাপার সেগুলো উদরস্থ করার পর সেঁড়ি খাওয়ার মতো অত তীব্র পানিকষ্টে ভুগলাম না।
আর একটা ব্যাপার লক্ষ করলাম, সামুদ্রিক শ্যাওলার পুরু আস্তরণ চারদিক ছেয়ে থাকায় হাঙরের ছোঁক ছোঁকানি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সাহসে ভর করে দীর্ঘ সময় সমুদ্রের পানিতে স্নান করে শরীর ও মন তৃপ্তি করে নিলাম। মাংসলোলুপ হাঙরগুলো যখন বেপাত্তা হয়ে গেছে তখন প্রাণনাশের সম্ভাবনা নেই। তাই নির্ভয়ে সমুদ্রস্নান সারা সম্ভব হল। পরম তৃপ্তি পাওয়ায় গভীর ঘুমের মধ্যে রাতটা কাটিয়ে দিতে পারলাম।
আগস্ট মাসের ১০ তারিখ, সকাল। চোখে সূর্যের আলো পড়ায় সকাল সকালই আমাদের ঘুম চটে গেল। সকালে আকাশ নির্মেঘই ছিল। কিন্তু দুপুর হতে না হতেই মুষলধারে বৃষ্টি নামল। জাহাজে পানির ড্রাম বা টিন না থাকায় আফসোসে নিজের চুল নিজেরই ছিঁড়তে ইচ্ছে করছিল।
উপায়ান্তর না দেখে শেষমেষ গায়ের জামা খুলে বৃষ্টির পানিতে ভিজিয়ে নিয়ে তা নিঙড়ে শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া জিভ, গলা আর ফুসফুস ভিজিয়ে নিলাম। উফ! কী যে তৃপ্তি, কী যে অনির্বচনীয় শান্তি, তা বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়। সত্যি কথা বলতে কি, দিনটা ভালোই কাটল।
আগস্টের ১৭ তারিখ। ভোরের আলো ভালোভাবে ফোঁটার আগে আমরা দুজনের একই সঙ্গে একটা পাল হঠাৎ নজরে পড়ল। অনুসন্ধিৎসু নজরে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম, সেটা আমাদের দিকে এগোচ্ছে।
অপ্রত্যাশিত, একেবারে অকল্পনীয় ব্যাপারটায় আমাদের মন-প্রাণ আনন্দে নাচানাচি করতে লাগল। আমরা দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য যা-কিছু করা সম্ভব সাধ্যমত সবই করলাম। হাত নেড়ে, গায়ে জামা খুলে তাদের দিকে বার বার নাড়াতে লাগলাম। শেষপর্যন্ত গলা চড়িয়ে চিৎকার জুড়ে দিলাম।
তখন আমাদের আর সেই দূরের জাহাজটার মধ্যে ব্যবধান মাইল পনের তো হবেই।
হাত ও জামা নাড়ানাড়ি আর গলাফাটা ডাকাডাকির মধ্য দিয়ে ঘন্টা খানেক কেটে গেল।
ইতিমধ্যে জাহাজটা আরও কাছে এগিয়ে আসায় জাহাজটাকে ভালোভাবে দেখা সম্ভব হল। তার বড় পালটার গায়ে কালো বল আঁকা, দেখলাম। আর এও অনুমান করতে পারলাম, বাণিজ্য জাহাজ নয়, যাত্রী-জাহাজ। যাত্রী বোঝাই।
নবাগত জাহাজটা আরও সামান্য এগিয়ে এলে লক্ষ্য করলাম, ডেকের ওপরে সবাই উত্তেজিতভাবে হাঁটাহাঁটি করছে।
মুহূর্তের মধ্যে ওই জাহাজটার গায়ে একটা বড়সড় বৃটিশ পতাকা উড়িয়ে দেওয়া হল। আর সেটা সোজা আমাদের দিকে দ্রুত এগিয়ে আসতে লাগল।
