অগাস্টাসের আহত হাতটার দিকে তাকালে কেবল সে মনটা বিষিয়ে ওঠে তাই নয়, আচমকা গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। কবজি থেকে একেবারে কাঁধ পর্যন্ত কুচকুচে কালো হয়ে গেছে। আলকাতরার প্রলেপ দিলেও বুঝি কোনোকিছু এতখানি কালো দেখায় না। পা দুটোতে হাত বুলিয়ে মনে হলো বরফও বুঝি এর চেয়ে কম ঠাণ্ডা।
অগাস্টাসের অবস্থা দেখে আমার বুকের ভেতরের ধুকপুকানি শুরু হয়ে গেল। যে কোনো মুহূর্তে তার দেহ থেকে আত্মাটা বেরিয়ে যেতে পারে।
অগাস্টাস শুকিয়ে একেবারে পোড়া কাঠ হয়ে গেছে। আমাকে নিয়ে ন্যান্টাকেট থেকে যাত্রা করার সময় এক শ সাতাশ পাউন্ড ছিল তার দৈহিক ওজন। এখন সেটা দাঁড়িয়েছে খুব বেশি হলেও পঁয়তাল্লিশ বা পঞ্চাশ পাউন্ড।
তার চোখের মণি দুটো কোটরের অনেকটা ভেতরে ঢুকে গেছে। সে দুটোর উপস্থিতিই বোঝা যায় না। মুদু কি এ-ই? যে খাদ্যবস্তু চিবোনোর ক্ষমতাটুকুও তার মধ্য থেকে লোপ পেয়েছে। এমনকি পানি পর্যন্ত গলা দিয়ে নামতেও যেন প্রাণটা বেরিয়ে যাবার উপক্রম হয়। উ। তার কষ্ট চোখের সামনে দেখলেও চোখ দুটো জলে ভরে ওঠে।
জুলাই মাস গিয়ে অগাস্টের পয়লা তারিখ এলো। আবহাওয়া আগের মতোই শান্ত স্বাভাবিক। রোদের তাপ অস্বাভাবিক। তৃষ্ণার ছাতি ফেটে যাবার উপক্রম হয়েছে। বোতলের পানি পুরোপুরি দূষিত হয়ে গেছে। পোকা জন্মেছে। পোকাগুলোকে ছুটোছুটি করতে দেখা যাচ্ছে। তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে ওই পানির সঙ্গেই মদ মিশিয়ে বার বার গলাটাকে ভিজিয়ে নিতে লাগলাম। কিন্তু তৃষ্ণা তো মিটছে না।
বুকের জ্বালা নেভাতে সমুদ্রে খুব করে স্নান করলাম। কিছুটা স্বস্তি পেলাম বটে। হাঙরের ভয়ে বুক কাঁপে, বেশি সময় ধরে স্নান করতেও ভরসা হলো না।
এদিকে আমি ক্রমেই নিঃসন্দেহ হয়ে পড়তে লাগলাম, অগাস্টাসকে বাঁচানো সম্ভব নয়। মৃত্যু শিয়রে ঠায় দাঁড়িয়ে।
ঘণ্টা কয়েক অসাড়ভাবে পড়ে থাকার পর অগাস্টাস বারোটার কাছাকাছি শেষ বারের মতো নিশ্বাস ফেলল। ব্যস, খতম। বন্ধু অগাস্টাসের মৃত্যুতে আমরা যারপরনাই মর্মাহত হলাম। দিনভর বিষণ্ণমনে মৃতদেহটা আগলে বসে কাটিয়ে দিলাম। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসর পর পাষাণে বুক বেঁধে অগাস্টাসের মৃতদেহটা সমুদ্রে ফেলে দিলাম। অন্ধকারে, ঢেউয়ের মুখে পড়ে সেটা কোথায় যে তলিয়ে গেল বুঝতে পারলাম না। আমার ফুসফুস নিঙড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো।
আগস্টের দুই তারিখ। আবহাওয়ার কোনো পরিবর্তনই হলো না। বাতাস ও সমুদ্র আগের মতোই শান্ত। আর ভ্যাপসা গরম তো আছেই।
আমি পূর্বদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে বিষণ্ণ মন আর ক্লান্ত অবসন্ন প্রায় শরীরে ভোরটাকে দেখতে লাগলাম। অসহ্য বোতলের পানি একেবারেই পানের উপযুক্ত নয়। তৃষ্ণায় শেষপর্যন্ত সাগরের পানির সঙ্গে মদ মিশিয়ে গিলতে আরম্ভ করলাম। একবারের বেশি পারলাম না। ঠেলে বমি বেরিয়ে আসতে চাইল। উপায়ন্তর না দেখে সে চেষ্টাও ছেড়ে দিতেই হল।
গত রাতে বন্ধু অগাস্টাসের মৃতদেহটা সমুদ্রে ফেলে দেবার পর উৎপাত নতুন রূপ নিয়ে দেখা দিল। হাঙরের ছোঁকছোঁকানি বেড়ে গেল। আসলে নরমাংসের লোভেই তারা এমন উৎপাত জুড়ে দিয়েছে। তার এমন লোলুপদৃষ্টিতে আমাদের দিকে বার বার তাকাতে লাগল যে, নাগালের মধ্যে পেলেই যেন ছিঁড়ে ফেঁড়ে খেয়ে নেবে।
হায় ঈশ্বর! একী মহা ফাঁপরেই না পড়া গেল। এক দিকে বুকফাটা তৃষ্ণার যন্ত্রণা আর অন্যদিকে ক্ষুধার্ত হাঙরের নিরবচ্ছিন্ন ছোঁক ছোঁকানি। রাতভর বিন্দ্ৰিই কাটাতে হল। কেউ-ই আতঙ্কে চোখের পাতা একত্র করতে পারলাম না।
৩ আগস্ট। আমাদেও নিরবচ্ছিন্ন দুঃখ-যন্ত্রণার অবসান ঘটার কিছুমাত্র সম্ভাবনাই দেখলাম না।
এদিকে জাহাজটার পরিস্থিতিও খুবই খারাপ। এটা একদিকে এত বেশি কাৎ হয়ে পড়েছে যে, যে কোনো মুহূর্তে ভয়ঙ্কর অঘটন ঘটে যেতে পারে। তাছাড়া ডেকের ওপর দাঁড়ানো পর্যন্ত যাচ্ছে না। আর ঘুমের তো দফারফা।
অগাস্টের চার তারিখের সকাল হল। ভোরের আলো ফোঁটার আগেই বুঝতে পেরেছিলাম, আমাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল জাহাজটা একটু একটু করে সমুদ্রের বুকে তলিয়ে যাচ্ছে। উলটাতে শুরু করেছে। জাহাজটাকে–নিজেদের বাঁচাবার প্রাণান্ত প্রয়াস চালাতে লাগলাম। সম্ভাব্য সবরকম চেষ্টা করে দেখলাম। গোড়ার দিকে ধীরে ধীরে তারপর শেষ-মেষ একেবারে দুম্ করে জাহাজটা অবিশ্বাস্যভাবে উলটে গেল। মুহূর্তের মধ্যে আমরাও আছাড় খেয়ে সমুদ্রে পড়ে খাবি খেতে লাগলাম। কারণ প্রকাণ্ড জাহাজটার খোলের তলায় চাপা পড়ে আমার তখন কয়েক বাও পানির নীচে অবস্থান করছি।
আমি তখন পিতৃদত্ত জীবনটার আশা পুরোপুরি ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর প্রতীক্ষায় রয়েছি।
আমি কিন্তু সে খারাপ অবস্থায় হাবুডুবু খাবার সময় ভুলেও ভাবতে পারিনি আকাশচুম্বী এক ঢেউয়ের ধাক্কায় আমাদের জাহাজটা আবার হঠাৎ করে সোজা হয়ে পড়তে পারে। কিন্তু সত্যি তা-ই ঘটে গেল। আমাকে একেবারে অবাক করে দিয়ে জাহাজ আবার সত্যি সত্যি স্বাভাবিকতা ফিরে পেল।
আমি কিন্তু তাতে ২০ গজ দূরে ছিটকে গেছি। উত্তাল-উদ্দাম সমুদ্রের বুকে পড়ে খাবি খাচ্ছি। পিটার্সকে চোখে পড়ছে না।
সমুদ্রে পড়ে হাবুডুবু খেতে খেতে হঠাৎ একটা তেলের পিপে ভাসতে দেখলাম। আমার সঙ্গে সেটার ব্যবধান ফুট-কয়েকের বেশি নয়। আর জাহাজের হাজারো খুটিনাটি জিনিস সমুদ্রে এখানে-ওখানে ভেসে বেড়াচ্ছে।
