বাতাসের বেগ ক্রমেই বেড়ে চলল। ফলে জাহাজটা মোচার খোলার মতো এমন মারাত্মক দোল খেতে লাগল যে, আমাদের দাঁড়িয়ে থাকাই সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। তাই বৃষ্টির পানি ধরে রাখার পরিকল্পনাটা বাতিল করতেই হল।
দুপুর হতেই বাতাস অধিকতর তীব্র বেগে প্রবাহিত হতে লাগল। রাতের অন্ধকার নামা পর্যন্ত বাতাসের বেগ একই রকম রইল। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা ক্রমে ভয়ঙ্কর ঝড়ের রূপ ধারণ করল। ঝড়ের সে কী গর্জন। কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার জোগাড় হল।
চব্বিশ তারিখে রাত কেটে কোনোরকমে পঁচিশ তারিখে ভোর হল।
সকালের দিকে ঝড়ের বেগ কিছুটা কমল। আগের রাতে সমুদ্রের পানি যে পরিমাণ ফুলে ফেঁপে উঠেছিল তা একটু একটু করে কমে অনেক নিচে নেমে গেছে। উন্মত্ত সমুদ্রের ঢেউ এখন আর আগের মতো মাথার ওপর তীব্র আক্রোশে আছড়ে পড়ছে না।
ভাগ্যের ব্যাপারই বলতে হয়–এত সতর্কতার সঙ্গে রাখা সত্ত্বেও সবটুকু শূকরের মাংস আর দুটিন পানি জমে থাকা মেঝের ওপর গড়াগড়ি খাচ্ছে।
কয়েকটা মাত্র জলপাই আর পানিমেশানো মদ সহযোগে রাজা-বাদশার মতো মৌজ করে সকালের আহার সারলাম।
সমুদ্র কিছুটা শান্ত হলেও তার উদ্দামতা একেবারে শেষ হয়ে স্বাভাবিকতা ফিওে আসেনি–থেকে থেকে উত্তাল উদ্দাম হয়ে পড়ছে।
দুপুর হল। সূর্য ঠিক মাথার ওপর উঠে গেল। অনুমান করতে পারছি, উত্তর ও উত্তর পশ্চিম বাতাসের বেগে আমরা বিষুবরেখার কাছাকাছি কোনো স্থানে হাজির হয়েছি।
সবে সন্ধ্যার অন্ধকার একটু একটু করে নেমে আসতে শুরু করেছে। ঠিক তখনই লক্ষ করলাম, অতিকায় একটা হাঙর লোলুপ দৃষ্টি নিয়ে আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে। ভয়ে আমাদের অন্তরাত্মা শুকিয়ে যাবার উপক্রম হল। ব্যস, তাদের পরিশ্রমই সার হল।
জুলাইয়ের ছাব্বিশ তারিখ। গুদামঘরে নেমে হণ্যে হয়ে খোঁজাখুঁজি করেও খাদ্যবস্তু কিছুই সংগ্রহ করে আনতে পারলাম না। আবার হতাশার মেঘ আমাদের ঘিরে ধরল।
সাতাশে জুলাইয়ের ভোর হল। অবস্থার কিছুমাত্রও পরিবর্তন হলো না। আমরা থেকে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে লাগলাম। বিকেলের দিকে সূর্যের তেজ প্রচণ্ড হয়ে উঠল। আমরা সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে গিয়ে ভেজা পোশাক-আশাক শুকিয়ে নিলাম। সমুদ্রে স্নান সেরেও স্বস্তি কম পেলাম না।
পরিস্থিতি অনুকূল হয়ে ওঠায় কচ্ছপটা, পানির পাত্র, জলপাইয়ের টিন প্রভৃতি বাধা বাঁধি করে রাখলাম। বলা তো যায় না কখন আবার বিধি বাম হয়ে যায়। দিনভর সমুদ্র শান্তই রইল, এতটুকু উন্মাদনাও প্রকাশ পায়নি।
উনত্রিশে জুলাই। আবহাওয়া এতটুকু পরিবর্তন হলো না। এদিকে এক সর্বনাশা কাণ্ড ঘটতে চলেছে। লক্ষ্য করলাম, আগাস্টাস-এর হাতের ক্ষতটা পচতে শুরু করেছে। সে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় এলিয়ে পড়ে রইল। থেকে থেকে কেবল তার তৃষ্ণার কথা বলছে। কিন্তু ব্যথা বেদনার তীব্রতার কথা মোটেই বলছে না। তার রোগমুক্তির ব্যাপারে আমাদের কিছুই করার ক্ষমতা নেই। আমাদের সাধ্যের মধ্যে যা রয়েছে, তার জন্য বরাদ্দ পানির পরিমাণ কিছুটা বাড়িয়ে দিলাম। সত্যি কথা বলতে কি, এতে আমাদের ত্যাগ স্বীকার তো করতেই হল। সেদিনটা ছিল ত্রিশে জুলাই। আবহাওয়া গুমোট। অস্বাভাবিক গরম। আর বাতাসও নেই। মনটা হঠাৎ আনন্দে নেচে উঠল। অতিকায় একটা হাঙরকে আমাদের চারিদিকে লোলুপ দৃষ্টি মেলে ঘুর ঘুর করতে দেখলাম। সারাটা সকাল নরমাংস লোভি জন্তুটা আমাদের কাছাকাছি ছোঁক ছোঁক করল। আমরাও কম লোভের পরিচয় দেইনি। পাল বাঁধার কাছির ফাস তৈরি করে হতচ্ছাড়াটাকে ধরার জন্য বহুভাবে চেষ্টা চালাতে লাগলাম। কিন্তু শেষমেশ ব্যর্থ হয়ে হাল ছেড়ে দিতেই হল।
আমার বন্ধুবর অগাস্টাসের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হতে হতে সে এখন একেবারেনির্জীব হয়ে পড়েছে। একে ক্ষতের যন্ত্রণা, তার ওপর পুষ্টির নিতান্তই অভাব তো রয়েছেই।
সব শেষে সে কয়টা জলপাই টিনের তলায় পড়েছিল আজ সন্ধ্যায় সেগুলো খেয়ে সাবাড় করে দিলাম। আর পানি? দুর্গন্ধ ছাড়ছে। মদ না মিশিয়ে সে পানি গলা দিয়ে নামানোই সম্ভব নয়।
আমরা আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। সকালে কচ্ছপটাকে কেটে তার মাংস দিয়ে কাটাতে হয়েছে। জাহাজের খোলের পরিস্থিতিটাই আমাদের এ নিরবচ্ছিন্ন অস্থিরতার কারণ।
ভোরের আলো ফুটে ওঠার একটু পরেই আমরা কচ্ছপটাকে জবাই করার কাজে মেতে গেলাম। কাজ মিটিয়ে ফেলতে দেরি হলো না। কচ্ছপটাকে ছোট, কুড়িয়ে কাড়িয়ে যে মাংসটুকু উদ্ধার করার হলো তার ওজন খুব বেশি হলেও পাউন্ড দশেক হবে। মাংসের একটা অংশ পৃথক করে টুকরো টুকরো করে কেটে নিলাম। উদ্দেশ্য ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করে রাখা। তাই সেগুলোকে জলপাইয়ের টিন আর মদের বোতলে ভরে রাখলাম। এভাবে তিন পাউণ্ডের মতো কচ্ছপের মাংস ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ের ব্যবস্থা হল।
আমরা আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম, অবশিষ্ট মাংসটুকু খেয়ে সাবাড় না করা অবধি সঞ্চিত মাংসে ভুলেও হাত দেওয়া চলবে না। এও সিদ্ধান্ত হয়ে গেল, প্রতিদিন আমরা চার আউন্স মাংস খাব। এভাবে চালালে সম্পূর্ণ মাংসে আমরা তের দিন চালিয়ে নিতে পারব।
সন্ধ্যার কিছু আগে বজ্রবিদ্যুৎসহ বৃষ্টি শুরু হল। অল্পেতেই বৃষ্টি থেমে গেল। বহু চেষ্টা করে আধ পাইট বৃষ্টির পানি ধরতে পারলাম। পাত্রের সবটুকু পানিই অগাস্টাসের জন্য বরাদ্দ করা হল। এছাড়া উপায়ও কিছু নেই। কারণ, তার অবস্থা শেষ ধাপে পৌঁছে গেছে। বৃষ্টি নামার পরও তার অবস্থার কোনো উন্নতি হলো না।
