হুম! আমি প্রায় অস্ফুট উচ্চারণ করলাম।
তিনি বলেই চললেন–আরও আছে, এই যে ছোট পাহাড়টা দেখতে পাচ্ছ, ওটার দিকে চোখ পড়লেই আর মাথাটা চক্কর মেরে ওঠে, জান কী?
একটু আগেই সামান্য বিশ্রামের মাধ্যমে একটু দম নিয়ে নেবার জন্য সে ছোট পাহাড়টার গায়ে এমন সাবধানতার সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন যে, তার শরীরের বেশির ভাগ অংশটাই পাহাড়টার একেবারে পিচ্ছিল অংশটায় এলিয়ে পড়েছিল। তিনি যে কিভাবে আচমকা নিচে পড়ে যান, কালো পাথরের সে ছোট পাহাড়টা নিচের পাহাড়গুলো থেকে একদম খাড়াভাবে প্রায় পনেরো ষোলো শো ফুট নিচে নেমে গেছে। ব্যাপারটা বাস্তবিকই অভাবনীয়।
সত্যি কথা বলতে কি, আমি হলে কিন্তু ভুলেও এমন কাজ করতাম না। পৃথিবীর কোনোকিছুর লোভেই আমি পাহাড়ি প্রান্তের দুগজের মধ্যে যেতাম না। কেউ জোর করেও আমাকে নিতে পারত না। অথচ তিনি কি করে যে এমন একটা কাজ করলেন, আমি ভেবে কিছুতেই কুলকিনারা পেলাম না।
মোদ্দা কথা হচ্ছে, বন্ধুবরের এমন ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমার মধ্যে উত্তেজনা এমন তীব্র হয়ে পড়েছিল যে, উপায়ান্তর না দেখে হঠাৎই ভূমিতে টানটান হয়ে শুয়ে পড়ে আশপাশের ঝোঁপঝাড়কে আঁকড়ে ধরেছিলাম।
সত্যি কথা বলতে কি, তখন আমি ভয়ে এমনই মুষড়ে পড়েছিলাম যে, এমনকি মুহূর্তের জন্য আকাশের দিকে চোখ মেলে তাকাতেও ভরসা পেলাম না।
অনেকক্ষণ সেখানে দুরু দুরু বুকে শুয়ে পড়ে থাকার পর বুকে কিছুটা সাহস সঞ্চার করা সম্ভব হলো। এবার হঠাৎ করে সম্বিৎ ফিরে পাওয়ার মতো আমি ধীরে ধীরে উঠে বসতে চেষ্টা করলাম। হ্যাঁ, অল্পায়াসেই উঠে বসতে সক্ষম হলাম। তারপর দূরবর্তী দৃশ্যের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেও অসুবিধা হলো না।
আমার পথপ্রদর্শক এগিয়ে এলেন, আমার মুখোমুখি দাঁড়ালেন। তারপর সহানুভূতির স্বরে বললেন–একটা কথা বলব, শুনবে কী?
কথা? কী কথা? আমি বললাম।
কথাটা হচ্ছে, এসব অসার অবাস্তব কল্পনা তেমাকে মন থেকে মুছে ফেলতে হবে, জয় করতেই হবে।
হুম।
তোমাকে এখানে নিয়ে আসার কারণ কী, বলতে পার?
আমি কপালের চামড়ায় ভজ এঁকে বললাম–কী? কী সে উদ্দেশ্য?
তোমাকে এখানে নিয়ে আসার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, যে ঘটনাটার কথা তোমাকে বললাম, সে জায়গটাকে যাতে তুমি চোখের সামনে, খুব ভালোভাবে দেখতে পাও, আর সে ঘটনাস্থলটাকে তোমার চোখের ঠিক সামনে রেখেই কাহিনীটা তোমাকে শোনাতে পারি, বুঝলে তো?
হুম।
এবারনিজস্ব ভাব-ভঙ্গিতে তিনি বলতে আরম্ভ করলেন–এখন আমরা কোথায় আছি, বলতে পার?
আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকালাম।
তিনি পূর্ব প্রসঙ্গ সম্বন্ধেই বলে চললেন–আমরা এখন নরওয়ের উপকূলের কাছাকাছি অবস্থান করছি, অর্থাৎ ৬৮° দ্রাঘিমায়–নর্থল্যান্ড প্রদেশের অন্তর্গত ভয়ঙ্কর লকোডেল অঞ্চলে।
মুহূর্তের জন্য থেমে তিনি এবার বললেন- এখন আমরা যে পাহাড়টার শীর্ষদেশে অবস্থান করছি, এর নাম হেসেগেন। মেঘে ঢাকা হেলসেগেন চূড়া বলেই সবাই একে জানে। কথা বলতে বলতে তিনি আমার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন–এবার শরীরটাকে একটু তোলার চেষ্টা করে দেখ তো, পার কি না?
আমি সামান্য নড়েচড়ে ওঠার চেষ্টা করলে তিনি বললেন–শোন, যদি মনে কর মাথা চক্কর মারতে পারে তবে ওই লম্বা ঘাসের গোছাটাকে মুঠো করে ধরে থাক। ওই ভাবে–ওই ভাবেই, এবার নিচের দিককার বায়ুস্তর আর তীরের দূরবর্তী সমুদ্রের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ কর।
মাথা চক্কর মারছে। সে অবস্থাতেই তার নির্দেশিত দিকে তাকালাম। সমুদ্রের দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি। সে-মুহূর্তেই মনের কোণে উঁকি দিল নিউবীয় ভৌগোলিকের বিবরণসমৃদ্ধ মারে টেম্রোরাম-এর কথা। এর চেয়ে বেশি তো দূরের ব্যাপার, এরকম অবর্ণনীয় শোচনীয় বিষণ্ণতায় পূর্ণ একটা দৃশ্যের কথা মানুষে ভাবতেও পারে না।
সমুদ্রের দিকে যতদূর দৃষ্টি যায় কেবল পাহাড় আর পাহাড়, অস্বাভাবিক কালো আর সমুদ্রের ওপর ঝুঁকে পড়া সারিবদ্ধ পাহাড়। সবকিছু যেন বিষণ্ণতায় ভরপুর। আর সে বিষণ্ণতাকে যেন আরও বেশি মর্মান্তিক করে তুলেছে পাহাড়ের দৈত্যাকৃতি সাদা চূড়ার ওপর ক্রোধোন্মত সমুদ্রের নিরবচ্ছিন্ন আর্তস্বর। সে আর্তনাদ কাঁপন ধরিয়ে দিতে লাগল।
পাহাড়ের যে শিখরটার ওপর আমরা অবস্থান করছিলাম, তার ঠিক বিপরীত দিকে প্রায় পাঁচ-ছয় মাইল দূরবর্তী সমুদ্রের বুকে একটা জনমানবশূন্য দ্বীপ দেখা গেল। আরও একটা ছোট দ্বীপ দেখতে পেলাম। স্থলভূমি থেকে প্রায় দুমাইল দূরে সেটার অবস্থান। অস্বাভাবিক রকমের পর্বতময়। তা একেবারেই অনুর্বর। বহুসংখ্যক কালো পাহাড়ের শ্রেণি তাকে চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে।
খুব বেশি দূরবর্তী দ্বীপ আর উপকূল রেখার মধ্যবর্তী সমুদ্রের রূপ কেমন অস্বাভাবিক দেখাতে লাগল। সমুদ্রের চেহারা যে এমন হতে পারে, কল্পনাই করা যায় না।
ঠিক তখনই প্রলয়ঙ্কর ঝড় শুরু হয়ে গেল। সে কী ঝড়ের বুক-কাঁপানো গর্জন! তবে সমুদ্রে তেমন ঢেউ লক্ষিত হয়নি। আর পাহাড়গুলোর গায়ের সমুদ্রে ছাড়া অন্য কোনো স্থানে তেমন ফেনার ছড়াছড়িও দেখা যায়নি। সব মিলিয়ে বলা চলে সমুদ্র ছিল মোটামুটি শান্ত-স্বাভাবিক।
আমার বুড়ো বন্ধুটি অঙ্গুলি-নির্দেশ করে বলতে আরম্ভ করল–ওই যে দূরের দ্বীপটা দেখা যাচ্ছে, তার কী নাম, জান?
