টিনের পানি একুশ তারিখেই একেবারে তলে গিয়ে দাঁড়াল।
মাসের ২০ তারিখ। আমরা পরস্পরের মুখোমুখি বসে আমাদের মর্মান্তিক পরিস্থিতি কথাবার্তা বলতে লাগলাম। কথার ফাঁকে আচমকা একটা কথা আমার মনের কোণে উঁকি দেওয়ায় নতুন অর একটা আশা উঁকি দিল। বড় মাস্তুলটা কেটে সমুদ্রের ফেলে দেওয়ার পর পিটার্স কুড়ালটা আমার হাতে তুলে দিয়েছিল। তখন সে বার বার সতর্ক করে দিয়েছিল, এমন এক জায়গায় রেখে দিতে যাতে সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে চলে না যায়। এখন কথার ফাঁকে হঠাৎ আমার মাথায় মতলবটা খেলল, পানি তলিয়ে যাওয়া গুদামটার ওপরের ডেকের ছাউনি কোনোরকমে কুড়ুল দিয়ে বিচ্ছিন্ন করতে পারলে ভাগ্য খুললে খুলতেও পারে। তাতে খাবার দাবার পেয়ে যাওয়াও কিছুমাত্র অসম্ভব নয়।
আমার মতলবটা সহযাত্রী বন্ধুদের কাছে বলতেই তারা সবাই সম্মতি দিল। ব্যস। আর কিছুমাত্র দেরি না করে আমরা কুড়ুলটা নিয়ে কাজে মেতে গেলাম।
ডার্ক পিটার্স আর আমি পালা করে কাঠের গায়ে অনবরত কুড়ুলের ঘা মারতে লাগলাম। বন্ধু অগাস্টাসের হাত ক্ষত থাকার জন্য তাকে কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হল। এদিকে আমাদের শক্তি-সার্মথ্যের তো দীর্ঘদিন ধরে তিল তিল করে খোয়া গেছে–শরীর খুবই দুর্বল।
কুড়ুল দিয়ে ঘা কয়েক মারার পরই আমরা ধরে নিলাম, কাঠ লোহার মতো শক্ত। কুড়ুলের ঘা মেরে মেরে একজনের ঢোকার মতো গর্ত তৈরি করতে দুজনের প্রচুর সময় লেগে যাবে। তা সত্ত্বেও আমরা কিন্তু মোটেই উৎসাহ হারালাম না।
চাঁদের জ্যোৎস্নায় কুড়ুল চালিয়ে ২৩ তারিখের ভোরের আলো ফোঁটার আগে কেটে ফোঁকড় তৈরি করার কাজ সেরে ফেললাম।
ডার্ক পিটার্স স্বেচ্ছায় পানিভর্তি গুদামটার ভেতরে নেমে গেল।
একটু পরেই ডার্ক পিটার্স পানিভর্তি একটা বড়সড় টিন নিয়ে ওপরে উঠে এলো।
আমরা তিনজনই বুভুক্ষ জলপাইয়ের টিনটার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। মিনিট কয়েকের মধ্যেই সেগুলো গোগ্রাসে সাবাড় করে দিলাম।
আর দেরি নয়, ডার্ক পিটার্সকে আমরা আবার গুদামের ভেতরে নামিয়ে দিলাম। একটু পরেই সে একেবারেই অভাবনীয় এক কাণ্ড করে ফিরে এলো। সে তুলে আনল, কিছু শূকরের মাংস আর এক বোতল মদ। একেবারে বেশি খেতে ভরসা পেলাম না। সবাই এক ঢোক করে মদ খেয়ে গলাটা ভিজিয়ে নিলাম। আর এদিকে হাড়ের গায়ে লেগে থাকা দুপাউন্ডের মতো মাংস খাবার যোগ্য নয় দেখে আমরা ফেলে দিলাম। অবশিষ্ট ভালো মাংসটা তিনটি ভাগ করে তিনজনে নিলাম।
ক্ষিধের জ্বালায় অতিষ্ট হয়ে অগাস্টাস আর ডার্ক পিটার্স তখনই তাদের ভাগের মাংসটুকু গপাগপ উদরস্থ করে ফেলল। সামান্য একটু খেয়ে বাকি মাংসটুকু আমি ভবিষ্যতের জন্য রেখে দিলাম।
দীর্ঘ কঠোর পরিশ্রমের জন্য আমাদের শরীর আর চলছে না, রীতিমত টলছে। বাধ্য হয়ে শরীরটাকে একটু চাঙা করে নেবার জন্য আমরা সবাই ঘুমিয়ে পড়লাম। আর তা নিতান্ত অপরিহার্যও ছিল।
আমার ঘুম ভাঙল দুপুরের দিকে। ঘুমের মাধ্যমে আমাদের শরীর ও মন কিছুটা অন্তত চাঙা তো হয়েছেই। আমরা নতুন উদ্যমে আবার খাবার জোগাড় করতে মেতে গেলাম।
সূর্য পাটে বসা পর্যন্ত ডার্ক পিটার্স আর আমি পালা করে ডুব দিয়ে দিয়ে সব মিলিয়ে তুলে আনলাম, শূকরের মাংসের বড়সড় একটা খণ্ড, চার টিন জলপাই ও প্রায় তিন গ্যালন ভালো মদ, আর যা সবচেয়ে খুশির ব্যাপার–গ্যালিপাগো জাতের ছোট একটা কচ্ছপ।
ক্যাপ্টেন বার্ণাডই গ্রামপাস বন্দর থেকে রওনা দেবার আগে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে সবে ফিরে-আসা জাহাজ ‘মেরিপিটস’ থেকে কচ্ছপটাকে সংগ্রহ করে জিইয়ে রেখেছিলেন।
এ অভিযানের বিবরণ দিতে গিয়ে ভবিষ্যতে এরকম কচ্ছপের কথা বার বার এসে পড়বে। গালিপাগাসে দ্বীপপুঞ্জে এ জাতের কচ্ছপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এর দৈহিক গড়ন বাস্তবিকই বিচিত্র। আর কাজকর্মের কথা বিবেচনা করে একে হাতি কচ্ছপ নামে সম্বোধন হয়। আর এরা পনেরো শত পাউন্ড ওজন বিশিষ্ট গ্যালিপাগো কচ্ছপ দেখেছি। এরা অনেকটা মরুভূমির উটের মতো। স্বভাবও উটের মতোই বটে। গলার কাছে একটা করে থলে থাকে যাতে প্রচুর পরিমাণে পানি ধরে রাখতে পারে। আমরা সে কচ্ছপটাকে গুদাম থেকে বের করে আনলাম। তার ওজন পয়ষট্টি থেকে সত্তর পাউন্ডের মতো হবে, খুব বেশি বড় নয়। আর এটা মেয়ে-কচ্ছপ। পেটে প্রচুর চর্বি জমে গেছে।
আমাদের চরম বিপদের সময় এরকম একটা কচ্ছপ হাতে পাওয়া তো অমূল্য সম্পদ হাতে পাওয়ারই সামিল। এক কোয়ার্টের বেশি পানিও তুলে আনি।
আমরা তিনজনই একসঙ্গে নতজানু হয়ে পরম পিতাকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলাম। তাঁর কৃপা ছাড়া যে এমন অপ্রত্যাশিতভাবে একান্ত অপরিহার্য সম্পদ কিছুতেই হাতে পাওয়া যেত না।
.
১৩. ॥ ত্রয়োদশ অধ্যায় ।
চব্বিশে জুলাই। সকাল থেকেই আমরা অবিশ্বাস্য রকমের প্রফুল্লতা ও সতেজতা অনুভব করতে লাগলাম। ফলে আমাদের কাজের উৎসাহও অনেক গুণ বেড়ে গেল।
পনিভর্তি গুদামঘর থেকে আরও কিছু খাবার দাবার তুলে আনার জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগলাম। ঠিক তখনই বজ্রপাতসহ মুষলধারে কিছুক্ষণ বৃষ্টি হয়ে গেল।
আমরা আগের দিনের মতোই টিনটায় বৃষ্টির পানি ধরে রাখার চেষ্টা করতে যাব ঠিক তখনই আচমকা উত্তর দিক থেকে দমকা বাতাস বইতে শুরু করল।
