অনুসন্ধিৎসু নজর মেলে বার বার এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলাম। কিন্তু দারুণভাবে হতাশ হতে হল। কোনো জাহাজের চিহ্নও চোখে পড়ল না।
তাই উপায়ান্তর না দেখে আমার ভাগ্য পরীক্ষার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে লাগলাম।
ঠিক তার পরই যে মর্মভেদী দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল, পরবর্তীকালে ঘটা কোনো ঘটনাই আমার স্মৃতি থেকে ধুয়ে মুছে নিতে পারবে না। আর যতদিন ধরে প্রাণের অস্তিত্ব থাকবে ততদিন সে ভয়ঙ্কর মর্মভেদি দৃশ্যের স্মৃতি আমার প্রতি মুহূর্তকে বিষময় করে রাখবে। এ কারণেই আমার কাহিনীর সে অংশটুকু যত সংক্ষেপে, যত শীঘ্র পারা যায় সেরে ফেলতে চাচ্ছি।
লটারির চিন্তা করা হল। আর তা করা হবে খড়টানার পদ্ধতিতে। বিভিন্ন মাপের চারটে খড়ের টুকরো একজন হাতের মুঠোয় ধরে রাখবে। যে সবচেয়ে ছোট টুকরোটা টেনে বের করবে সেই মৃত্যুবরণ করার অধিকার পাবে। আর এতে প্রত্যেকেই বেঁচে থাকার একটা সুযোগ পেতে পারবে।
আলোচনার মাধ্যমে এও সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, খড়ের টুকরোগুলো আমিই মুঠো করে ধরে রাখব। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, জাহাজে খড় কোথায় মিলবে? পাতিপাতি করে খুঁজে কোথাও খড় মিলল না। শেষপর্যন্ত কয়েকটা ছোট ছোট কাঠের টুকরো জোগাড় করা গেল।
আমি কাঠের টুকরোগুলোকে নিয়ে জাহাজের এক কোণে চলে গেলাম। আর অন্য কোণে, আমার দিকে পিছন ফিরে আমার সহযাত্রী বন্ধুরা দাঁড়াল।
ডার্ক পিটার্সের পালা এলো সবার আগে। সে আমার দিকে এগিয়ে এলো। আমি মুঠো করে ধরে থাকা কাঠের টুকরোসমেত হাতটা তার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। সে-ও নির্দিধায় ও নির্ভয়ে তা থেকে একটা টুকরো টেনে নিল। দেখা গেল, সে সবচেয়ে ছোট টুকরোটা টানেনি, ব্যস, সে প্রাণে বেঁচে গেল।
এবার এগিয়ে এলো অগাস্টাস। তার মুখেও ভয়ের চিহ্ন লক্ষিত হলো না। সে-ও সবচেয়ে ছোট টুকরোটা না টানায় বেঁচে গেল। এবারই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা নেওয়া হয়ে যাবে, আমার প্রাণরক্ষা হবে, নাকি প্রাণ দিতে হবে।
এবার ভাগ্য নির্ধারিত হবে পিটার্স আর আমার। ব্যস, তৎক্ষণাৎ আমার মধ্যে ক্রোধোন্মত্ত বাঘের হিংস্রতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। হতভাগা পার্কারের প্রতি আমার নির্মম-নিষ্ঠুর বিদ্বেষ যেন চড়চড় করে একেবারে তুঙ্গে উঠে গেল। তবে সে আর কতক্ষণ? ক্ষণিকের অনুভূতি মাত্র।
আমি এবার দুরুদুরু বুকে, ভীত-সন্ত্রস্ত মুখে আর চোখ দুটো বন্ধ করে অবশিষ্ট কাঠের টুকরো দুটো দিয়ে হাতটা তার দিকে এগিয়ে দিলাম।
পার্কার মুহূর্তের জন্য আমার মুখের দিকে তাকিয়েই চোখ নামিয়েনিল। তারপর স্থবিরের মতো দাঁড়িয়ে রইল পুরো পাঁচটা মিনিট। এ সময়টুকুর মধ্যে আমি একটা বারের জন্যও তার মুখের দিকে চোখ তুলে তাকাইনি, আসলে তাকাতে পারিনি।
পাঁচ মিনিট ধরে ভেবে চিন্তে শেষমেষ পার্কার আমার হাত থেকে যন্ত্রচালিতের মতো দ্রুততার সঙ্গে একটা কাঠের টুকরো টেনেনিল।
ব্যস, লটারি খেলা শেষ হল, মিটে গেল ভাগ্যের পরীক্ষা।
আমি তখনও সম্পূর্ণ অন্ধকারে, আমার পাল্লা মৃত্যুর পথে, নাকি বিরুদ্ধে ঝুঁকেছে।
কেবলমাত্র আমারই নয়, কারো মুখে টু-শব্দটিও নেই।
আমার ভেতর থেকে নিজের হাতের দিকে তাকাবার মতো শক্তি নিঃশেষে উবে গেছে।
আমার চোখ দুটো আগের মতো বুজেই রইল। শেষপর্যন্ত ডার্ক পিটার্স দুম্ করে আমার হাতটা চেপে ধরতে আমি চোখ মেলে তাকালাম।
পার্কারের ফ্যাকাশে বিবর্ণ মুখের দিকে চোখ পড়তেই আমি বুঝে নিলাম, আমি বেঁচে গেছি, আর তার বরাতে নেমে এসেছে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু।
না, আর এক মুহূর্তও আমার পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হলো না। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হল। পর মুহূর্তেই আমি সংজ্ঞা হারিয়ে সেখানেই লুটিয়ে পড়লাম।
আমি সংজ্ঞা ফিরে পেতেই আমার চোখের সামনে সে বেচারার এক বিয়োগান্ত নাটক অনুষ্ঠিত হলো যার প্ররোচনায় সেই প্রধান চরিত্র। সে-ও বাধা না দিয়ে স্থবিরের মতো নিশ্চল-নিথরভাবে দাঁড়িয়েই রইল।
পিটার্স পিছন দিক থেকে আচমকা ছুরির ফলাটা তার পিঠে গিঁথে দিল। ব্যস, মুহূর্তে তার রক্তাপ্লুত দেহটা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। বারকয়েক হাত পা ছোঁড়াছুঁড়ি করেই সে নিশ্চল হয়ে গেল। ব্যস, পিটার্সের আত্মা দেহ–খাঁচা ছেড়ে গেল।
এবার যা ঘটল তা ভাষায় বর্ণনা করাঅন্য কারো পক্ষে সম্ভব হলেও অন্তত আমার পক্ষে তো কিছুতেই সম্ভব নয়।
কেবলমাত্র এটুকু বললেই হয়তো যথেষ্ট যে, আমরা সদ্য মৃতের রক্তে আমাদের শুকিয়ে-ওঠা কলজেটাকে ভিজিয়ে, দীর্ঘ দিনের পিপাসাকে মিটিয়ে নিলাম। তারপর সবার সম্মতি নিয়ে তার কাঠের মতো শুকনো হাত-পা, মাথা আর নাড়িভুড়িগুলো সমুদ্রে ফেলে দিলাম। তারপর তার মাংস দিয়ে পেটের জ্বালা নেভাতে মেতে গেলাম। আর তার মাংস খেয়ে আমরা মাসের ১৭, ১৮, ১৯ আর ২০-চারটি স্মরণীয় দিন দিব্যি চালিয়ে দিলাম।
১৯ তারিখ। সে দিন পনেরো ২০ মিনিটের জন্য রীতিমত প্রবল বর্ষণ হয়ে গেল। আমরা বুদ্ধি করে একটা কেনেস্তারা টিনে বৃষ্টির পানি ধরে রাখলাম। অনুমানে বুঝলাম আধ গ্যালনের বেশি পানি ধরা সম্ভব হয়নি।
আধ গ্যালন। হ্যাঁ আধ গ্যালন পানি জমা করতে পাড়ার ফলেই আমার শরীর ও মনের বল অনেকাংশে বেড়ে গেল। কম কথা, অন্তত দিন-কয়েকের জন্য তো নিশ্চিন্ত।
