পার্কার পায়ের বুড়ো আঙুল জাহাজের পাটাতনে ঘষতে ঘষতে নীরবে আমার সব কথা শুনল।
এক সময় আমি নীরব হওয়ামাত্র সে মুখ খুলল–‘দেখ, তুমি যা-কিছু বললে সবই আমি জানি, আর যুক্তিসঙ্গতও বটে। কিন্তু এরকম ভয়ঙ্কর একটা বিকল্প পথ মানুষ কখন আঁকড়ে ধরতে উৎসাহি হয়, বল তো?’
আমি তার কথার কি জবাব দেব হঠাৎ করে গুছিয়ে উঠতে না পেরে মুখে কলুপ এঁটে দাঁড়িয়ে রইলাম।
সে এবার বলল–এমন ভয়ঙ্কর একটা বিকল্প পথ মানুষ একেবারে চরম মুহূর্তেই আঁকড়ে ধরতে উৎসাহি হয়, ঠিক কিনা? এ কথা তো মিথ্যে নয়, সব কষ্ট যতদিন সম্ভব দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করছি।
‘সবই বুঝলাম। কিন্তু—’
এর মধ্যে আর কোনো কিন্তু নয় বন্ধু, মাত্র একজনের জীবনদানের মাধ্যমে যদি বাকি কয়জনের প্রাণরক্ষা পায় তবে সবার মৃত্যু ঘটতে দেওয়া কখনই সঙ্গত নয়। এ নিয়ে তুমি মিছে পথ আগলে দাঁড়িয়ও না বন্ধু।
আমার পক্ষে তার প্রস্তাব এত সহজে মেনে নেওয়া কিছুতেই সম্ভব হলো না।
সে তবুও আমাকে বহুভাবে ব্যাপারটা বোঝাতে চেষ্টা করলে আমি উপায়ান্তর না দেখে তাকে জানালাম, সে যদি কিছুতেই তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে যেতে না চায় তবে সে অন্তত আর একটা দিন অপেক্ষা করে দেখুক। ইতিমধ্যে কোনো জাহাজ আমাদের উদ্ধার করতে এগিয়ে আসে কিনা।
আমার কথা শেষ হতে না হতেই পার্কার ব্যাপারটা সম্বন্ধে একেবারে চরম মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করে, আর চরমতম হতাশায় জর্জরিত হয়ে তবেই সে এ-পথ অবলম্বন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আর জীবনরক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই আরও একটা দিন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করলে খুব দেরি হয়ে যাবে। আর যা-ই হোক তার নিজের বেলায় তো অবশ্যই।
আমি যখন নিশ্চিত হলাম, তাকে কোনোভাবেই নিজের সিদ্ধান্ত থেকে টলানো যাবে না তখন নিতান্ত নিরূপায় হয়েই অন্য পথ অবলম্বন না করে পারলাম না।
আমি পার্কারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দৃঢ়কণ্ঠেই তাকে বললাম, বললাম বললে ভুল হবে সরাসরি ভয় দেখালাম। তাকে বললাম–শুনুন, এ মুহূর্তে আপনার চেয়ে, এমনকি আমার বন্ধু অগাস্টাস বা মি. ডার্ক পিটার্সের চেয়ে আমার শরীর অনেক, অনেক বেশি সবল। অতএব প্রয়োজনে আমি কিন্তু আমার শারীরিক শক্তি সামর্থ্যের সাহায্য নিতে বাধ্য হব।
পার্কার টু-শব্দটিও না করে লক্ষী ছেলের মতো আমার দিকে নীরবে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
ওষুধে কাজ হতে চলেছে অনুমান করে আমি আরও গলা চড়িয়ে দিয়ে বললাম– ‘আমার সাফ কথা শুনে নাও, তুমি যদি এ রক্তলোলুপ মাংসাশী পরিকল্পনার প্রস্তাবটা ভুলেও অন্য দুজনের কাছে পাড় তবে কিন্তু তোমাকে বলপূর্বক সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলে দিতে এতটুকুও দ্বিধা করব না মনে রেখো।
আমার মুখের কথা শেষ হতে না হতেই পার্কার চোখের পলকে পকেট থেকে ছুরিটা বের করে নিল, অন্য হাতে আমার গলাটা চেপে ধরে ছুরির ফলাটা আমার পেটে গেঁথে দেবার জন্য বার কয়েক ব্যর্থ চেষ্টা চালাল।
আমিও হাত-পা গুটিয়ে নিশ্চেষ্ট হয়ে তার কাছে আত্মসমর্পণ করলাম না। বরং রেগে আগুন হয়ে গিয়ে তাকে টেনে হিঁচড়ে একেবারে জাহাজের রেলিংয়ের কাছে নিয়ে হাজির করলাম। এমন ভাব দেখালাম, তাকে সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তবেই ক্ষান্ত হব। ঠিক সেই মুহূর্তেই ডার্ক পিটার্স হঠাৎ ছুটে এসে আমাকে ক্ষান্ত করল। তাকে জোর বাঁচান বাঁচিয়ে দিল। আমি দাঁড়িয়ে রাগে ফুঁসতে লাগলাম।
ডার্ক পিটার্স ব্যাপারটা দেখে তো রীতিমতো হকচকিয়ে গেল। আমার কাছে এর কারণ জানতে চাইল।
আমি মুখ খোলার আগেই পার্কার পুরো ব্যাপারটা তার কাছে খোলাখুলিভাবে ব্যক্ত করল।
ডার্ক পিটার্স সবকিছু শুনে তখনকার মতো গুম হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। বুঝলাম, ব্যাপারটা তার মধ্যে ভীষণ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে চলেছে।
কিন্তু পার্কারের বক্তব্যের পরিণাম যে এতখানি ভয়ঙ্কর রূপ নেবে তা আমি ঘুণাক্ষরেও অনুমাণ করতে পারিনি। আমি ধরেই নিলাম, ডার্ক পিটার্স আর অগাস্টাসও এমন একটা ধারণার কথা মনে মনে ভাবছে। এতদিন প্রকাশ করতে পারেনি।
এবার ডার্ক পিটার্স আর অগাস্টাসও পার্কারের পক্ষ অবলম্বন করল। তারপর তাদের মতলবটাকে বাস্তবায়িত করার জন্য পীড়াপীড়ি করতে লাগল।
আমি ভেবে দেখলাম, আমার পথ সঠিক নয়, বোকামিই করছি। তারা সংখ্যায় তিনজন, আর আমি একদম একা। তাদের তিনজনের মতে বিরুদ্ধাচারণ করতে যাওয়ার অর্থ চরম বোকামি করা। এতে আমার নিজের সর্বনাশের আশঙ্কা যথেষ্টই রয়েছে।
শেষপর্যন্ত নিতান্তই নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের কাছে বক্তব্য রাখতে বাধ্য হলাম। আমি বললাম–‘শোন, তোমাদের প্রস্তাবে আমি সম্মতি দিচ্ছি, তবে আরও একটা ঘণ্টা অপেক্ষা করার জন্য অনুরোধ রাখছি।
তারা তিনজনই চোখে জিজ্ঞাসার ছাপ এঁকে নীরবে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
আমি এবার বললাম–‘অনুরোধটা করছি এজন্য যে, একটু অপেক্ষা করে দেখা যাক, কুয়াশার আস্তরণটা সরে গেলে ইতিমধ্যে কোনো জাহাজ নজরে পড়ে কিনা।
হতাশার জ্বরে যারা ভুগছে তাদের কি এত সহজে পরিকল্পনাচ্যুত করা সম্ভব! শেষপর্যন্ত বহুভাবে বুঝিয়ে, অনুরোধ উপরোধ করে তবে আমার কথাটা বাস্তবায়িত করতে পারলাম।
আমাদের কথা শেষ হবার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই কুয়াশার গাঢ় আস্তরণটা ক্রমে সরে যেতে যেতে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। সমুদ্র-আকাশ স্বচ্ছ হয়ে উঠল।
