ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর নিরবচ্ছিন্ন হতাশা আর হাহাকারে অবসাদগ্রস্ত আমার দেহটা কখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল তা আমি বুঝতেই পারিনি।
সহযাত্রী বন্ধুরা ডাকাডাকি ও ঠেলাধাক্কা দিয়ে শেষমেশ আমার ঘুম ভাঙাল। চোখ খুলে দেখি, প্রকৃতির বুকে ভোরের আলো ফুটে উঠেছে।
বাতাসের তীব্রতা মোটেই নেই, ঢেউও কমতে কমতে একেবারেই শান্ত-স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। সমুদ্রবাহিত ঝিরঝিরে বাতাস খুবই মনোরম বোধ হচ্ছে। সবই আছে, কিন্তু কিছুই নেই। খাদ্য-পানীয় নেই, নেই বলতে কিছুই নেই। যাকে বলে সম্পূর্ণ নিঃস্বর-রিক্ত। থাকার মধ্যে আছে কেবল বুকভরা হতাশা আর হাহাকার।
বহু খোঁজাখুঁজি করে একটা বোতল পাওয়া গেল। তাতেই আমরা আনন্দে নাচানাচি জুড়ে দিলাম। সবার বরাতে একটা করে চুমুক জুটল। এটুকু দিয়ে গলাটা ভেজাতে পেরে আমরা যে কী আনন্দ লাভ করলাম, তা কাউকে বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু সে আনন্দ আর কতক্ষণ স্থায়ী হল? এ যে মরুভূমিতে এক বিন্দু বৃষ্টির সামিল।
আমাদের চোখের সামনে নিশ্চিত মৃত্যুর ছবি জ্বল জ্বল করছে। আমাদের মৃত্যু যে অনিবার্য তা আমরা অনেক আগেই বুঝে গেছি। এখন কেবল সে বিশেষ মুহূর্তটির জন্য অসহায়ভাবে প্রতীক্ষা করা। এ ছাড়া গত্যন্তরও কিছু নেই।
ক্ষুধায় জ্বালা বড় জ্বালা। এই জ্বালা যে কী ভয়ঙ্কর একমাত্র ভুক্তভোগী ছাড়া তা উপলব্ধি সম্ভব নয়। যে করেই হোক। এ জ্বালা মেটাবার একটা ফন্দি ফিকির বের করতেই হবে।
জ্যাকেটের পকেট হাতড়ে ছুরিটা বের করে একটা চামড়ার টুকরো কেটে চিবাতে লাগলাম। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও একটা টুকরোও উদরস্থ করতে পারলাম না। তার স্বাদ আর গন্ধ দুই উকট। বাধ্য হয়ে বিতৃষ্ণার সঙ্গে ফেলে দিতেই হল।
মাঝ রাত। আমি তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় অস্থিরভাবে এপাশ-ওপাশ করতে লাগলাম। হঠাৎ আমার সহযাত্রী বন্ধুদের চিৎকার চাচামেচিতে আমার তন্দ্রা টুটে গেল। সচকিত হয়ে উঠে বসে পড়লাম। দেখি, তারা কাতার স্বরে হাহাকার করছে। তাদের সর্বাঙ্গ অনবরত অভাবনীয়ভাবে কেঁপে চলেছে। তারপরই শুরু হলো বুক চাপড়ে কাদা। মরা কান্নাও বোধহয় এমন মর্মভেদী হয় না।
ছ-ছটা দিন হয়ে গেল, সেই এক বোতল মদ ছাড়া কারো পেটে একটা দানাও পড়েনি। মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছি, আর কয়টা দিন যদি এভাবে কাটে আরও কিছু সময় চলে তবে কারো প্রাণরক্ষার আশা তিলমাত্রও নেই।
আমার বন্ধু অগাস্টাস আর ডার্ক পিটার্সের অবস্থা আমার চেয়েও খারাপ। তারা উভয়েই শুকিয়ে একেবারে কাঠ হয়ে গেছে। তাদের দিকে চোখ পড়লেই বুকের ভেতরে হ্যাঁৎ করে ওঠে। সত্যি কথা বলতে কি তারা যে আমার পরিচিত, দিনের পর দিন একই সঙ্গে কাটাচ্ছি ভাবতেও উৎসাহ পাচ্ছি না। তাদের চোখ-মুখের গড়নই বদলে গেছে।
অগাস্টাস ক্ষিধের জ্বালার সঙ্গে কিছুতেই বোঝাপড়া করতে না পেরে শেষমেষ চামড়ার টুকরো চিবিয়ে গেলার জন্য কয়েকবার মরিয়া হয়ে চেষ্টা করে ব্যর্থ হল।
তাদের খারাপ অবস্থা দেখে আমি পরামর্শ দিলাম, চামড়ার টুকরো চিবিয়ে চিবিয়ে থ্যাতো করে কষটা খেলে কিছুটা অন্তত স্বস্তি পাওয়া যাবে।
আমার পরামর্শটাকে তারা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উড়িয়ে না দিলেও সেই মতো কাজ করতে পারল না। আসলে তারা এতই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে, চামড়া চিবোনোর মতো জোরটুকুও হারিয়ে ফেলেছে।
আবার! আবার আর একটা জাহাজের পাল আমাদের দৃষ্টিতে ধরা পড়ল। বার কয়েক এদিক-ওদিক কাৎ হয়ে অনুসন্ধিৎসু নজরে দেখে নিয়ে নিঃসন্দেহ হল, জাহাজই বটে।
আমাদের সবার মধ্যে আবার নতুন করে বাঁচার প্রেরণা দেখা দিল।
কিন্তু হায়! আমাদের চোখের সামনে দিয়েই আমাদের নতুন আশার উৎস জাহাজটার মুখ হঠাৎ অন্যদিকে ঘুরে গেল। ক্রমে দূরে হতাশার সাগরে ডুবিয়ে দিয়ে দিগন্তে মিলিয়ে গেল।
অপলক চোখে দীর্ঘ সময় একই দিকে তাকিয়ে থেকে পার্কার হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে এমন চোখ করে আমার দিকে তাকাল যে, আতঙ্কে আমার বুকটা কেঁপে উঠল।
সে মুখ কোলার আগেই চোখের ভাষায় আমাকে বুঝিয়ে দিল সে কি বলতে চাইছে।
পার্কার সংক্ষেপে প্রস্তাব করল–‘শোন, আমাদের বাঁচার একটা মতলব আমার মাথায় এসেছে।
আমি অত্যুগ্র প্রকাশ করে বললাম–‘বাঁচার উপায়? কী সে উপায়?
‘উপায় একটাই, অন্য সবার জীবন রক্ষা করতে আমাদের মধ্যে একজনকে প্রাণ দিতেই হবে।
আমি আর টু-শব্দটিও করতে পারলাম না। চোখে-মুখে হতাশার ছাপ এঁকে আমি দিগন্ত রেখার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে স্থবিরের মতো দাঁড়িয়েই রইলাম।
.
১২. ॥ দ্বাদশ অধ্যায় ॥
সত্যি কথা বলতে কি, সর্বশেষ ভয়ঙ্কর বিপদজনক পথটার কথা দিন কয়েক আগে আমার মনেও জেগেছিল। আর আমি একান্ত গোপনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি, যে কোনো উপায়ে যে কোনো পথে এবং যে কোনো মুহূর্তেই মৃত্যু এসে সামনে দাঁড়াক না কেন তাকে হাসিমুখে বুক পেতে নেব। তবুও এ-পথ অবলম্বন করব না। কিছুতেই না।
বুঝলাম, পার্কারের ভয়ঙ্কর প্রস্তাবটা এখনও সে অগাস্টাস এবং ডার্ক পিটার্সের কাছে পাড়েনি।
সুযোগ বুঝে আমি পার্কারকে টানতে টানতে একান্তে নিয়ে গেলাম। তাকে বহু বোঝালাম। বহুভাবে মিনতি জানালাম, চরম এ-বিকল্প পথটার কথা সে যেন মন থেকে ধুয়ে মুছে সাফ সুতরো করে ফেলে। ভুলেও যেন সে অন্য দুজনের কাছে কথাটা না। পাড়ে, কিছুতেই না।
