তবে আমার একান্ত আগ্রহ সেই রক্তমাখা মাংসের গর্তটার দিকে গুটি গুটি এগিয়ে গিয়ে আরও ভালো করে ব্যাপারটা দেখি,নিঃসন্দেহ হই।
না, আমার সে ইচ্ছাটাকে আর বাস্তবায়িত করা সম্ভব হলো না। পরমুহূর্তেই বুঝি আমার চৈতন্য, স্বাভাবিক বিচার-বুদ্ধি মাথা চাড়া দিয়ে উঠল।
যন্ত্রচালিতের মতো দ্রুত একটা লাফ দিয়ে ভয়ঙ্কর সে বস্তুটার কাছে চলে গেলাম। দুরু দুরু বুকে কাঁপা কাঁপা হাত দুটো দিয়ে সেটাকে এক হ্যাঁচকা টানে তুলে নিলাম। মুহূর্তমাত্র দেরি না করে সেটাকে উত্তাল-উদ্দাম সমুদ্রে ছুঁড়ে মারলাম। চোখের পলকে সেটা আমার দৃষ্টির বাইরে চলে গেল।
এই ভয়ঙ্কর বস্তুটা যে পচাগলা দেহ থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল সেটা দড়ির ঝুলন্ত অবস্থায় থাকার অন্য মাংস-খেকো পাখিটার ঠোঁটের টানাটানিতে সেটা অনায়াসেই বার বার দোল খেয়ে চলেছে। আর সেটাকে এ অবস্থায় দেখে তাকে জীবিত বলেই আমাদের মনে হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘসময় ধরে পাখিটা তার মাংস খুবলে খুবলে খেয়ে হালকা করে দিয়েছে। আর এরই ফলে এখন সেটা উলটে গেছে। এবার তার মুখটা পুরোপুরি আমাদের দিকে ঘুরে গেল। ফলে মুখের সবটুকুই আমরা দেখতে পেলাম। এক নজর দেখেই আমি চমকে উঠলাম। কোনো মুখ যে এমন কদর্য হতে পারে আমি স্বপ্নেও কোনোদিন ভাবিনি। না, কেবলমাত্র কদর্য বললে ঠিক বলা হবে না–ভয়ংকর বীভৎস।
আমি দুরুদুরু বুকে তার দিকে তাকালাম। তার চোখের কোটর দুটো শূন্য–মণি দুটো উধাও, মুখের চারদিকের মাংস হাফিস হয়ে গেছে। ফলে দাঁতের পাটি দুটো। বেরিয়ে পড়েছে।
তবে, তবে একটু আগে এ-হাসি দেখেই আমরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে আবেগে উচ্ছ্বাসে অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম? এ মুখ, এ হাসি দেখেই কি-না, এ প্রসঙ্গ এখন চাপা থাক।
আমাদের অবাক করে দিয়ে নবাগত জাহাজটা তিল তিল করে সরে যেতে লাগল। আমাদের হাসি-আনন্দ আর মুক্তির আশা ভরসাটুকুও ক্রমে দূরে সরে যেতে লাগল।
ক্ষণিকের জন্য দেখা দেওয়া, বুকে মুক্তির আনন্দ সঞ্চার করে, শেষমেশ আমাদের হতাশার সাগরে ভাসিয়ে ধীরে ধীরে সরে পড়ার কারণটা জানার জন্য আমি সে মুহূর্ত থেকেই ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছি।
জাহাজটার প্রসঙ্গে বলতে শুরু করেই আমি সেটার গঠন প্রকৃতি আর আকৃতির দেখে বাণিজ্য জাহাজ বলেই ধরে নিয়েছিলাম। ওলন্দাজ বনিকদের জাহাজ ভেবে নিঃসন্দেহ হয়েছিলাম।
সেই মুহূর্তে ব্যাপারটা আমার মাথায়ই আসেনি, প্রকৃতপক্ষে জাহাজটা কোন দেশের নইলে তার গায়ের লেখা দেখে এটা অনায়াসেই জেনে নেওয়া যেত। আসলে তখন আমার মধ্যে উত্তেজনা এমন প্রবল হয়ে উঠেছিল যে, অন্য কোনো দিকে নজর দেওয়ার মতো মানসিকতা আমার ছিল না।
আর ডেকের ওপরে পাশাপাশি গা ঘেঁষাঘেঁষি করে পড়ে থাকা নারী-পুরুষের পচা গলা দেহগুলো দেখে আমরা ধরেই নিয়েছিলাম ওগুলো পচে গলে যায়নি, পীতজ্বরের শিকার হয়ে তারা ধুকছে, সংজ্ঞা হারিয়ে মরার মতো পড়ে রয়েছে। আর তাই যদি সত্য হয় তবে তো আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে উঁকি দিয়ে ওঠা প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে।
তবে এটা অবশ্যই স্বীকার্য যে, একেবারেই আকস্মিকভাবে মৃত্যু এসে বেচারাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু এটাও তো সত্য যে, মহামারী যত মারাত্মকই হোক না কেন কখনই এমন আকস্মিকভাবে হানা দিয়েছে বলে শোনা যায়নি, হয়ওনি কোনোদিন।
চিন্তা ভাবনা করে এটাই মনে করা যেতে পারে, যুক্তিগ্রাহ্যও বটে সে, সমুদ্রযাত্রাকালে কোনো উপায়ে খাদ্যবস্তুতে বিষ প্রয়োগ করা হয় বা আপনা থাকতেই তা বিষাক্ত হয়ে যায়, আর এ যদি নাও হয় তবে কোনো না-জানা বিষাক্ত মাছ, কোনো সামুদ্রিক পাখি বা সামুদ্রিক প্রাণী সে বিষ বহন কওে নিয়ে আসে।
কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই যেখানে ভয়ানক এক রহস্যের প্রলেপে আবৃত এবং চিরকালই তা রহস্যাবৃতই রয়ে যাবে। সেখানে এরকম কোনো সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে বসা নিছকই বৃথা কালক্ষয়। অর্থাৎ সে রহস্য কোনোদিনই ভেদ করার তিলমাত্র সম্ভাবনা নেই তা নিয়ে অর্থহীন ভাবনা চিন্তা করা বুদ্ধিমানের কাজও নয়।
.
১১. ॥ একাদশ অধ্যায় ।
আমরা অপলক চোখে, হতাশায় বুক বেঁধে রহস্যের আধার জাহাজটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আর আকাশ পাতাল ভেবে চললাম। আমাদের হতাশা আর হাহাকারের মধ্যে সেটা ক্রমেই দূরে সরে যেতে লাগল।
আমাদের ছেড়ে-যাওয়া দূরগামী জাহাজটার দিকে তাকিয়ে থেকে থেকেই আমি সারাটা দিন কাটিয়ে দিলাম। আর দিনভর যুক্তিগ্রাহ্য ও অযৌক্তিক হাজারো চিন্তা ভাবনা আমার মাথায় একের পর এক চক্কর মারতে লাগল।
কোনো কাজই করতে পারলাম না, আসলে কিছু করার মতো মানসিকতাই আমার ছিল না।
তারপরই পুরনো সেই কষ্ট, ক্ষুধা-তৃষ্ণার কষ্টটা নতুন করে চাঙা হয়ে উঠল।
সমুদ্রের বুকে ক্রমে রাতের অন্ধকার নেমে এলো। অজানা সমুদ্র–সবকিছু অন্ধকার কালো ঘোমটার আড়ালে চলে গেল। আমাদের সামনে অবস্থান করছে কেবল অন্ধকার আর অন্ধকার–অন্ধকার যক্ষপূরী। আর আমরা সে অন্ধকারের মধ্যে বুক না মানা ক্ষুধা-তৃষ্ণার জ্বালায় নির্মমভাবে জ্বলেপুড়ে খাক হতে লাগলাম।
আমরা যতই হাই ফাঁই করি না কেন ভোরের আলো ফোঁটার আগে কিছুই যে আমাদের করার নেই।
রাত ক্রমে ক্রমে গম্ভীর হতে লাগল। আমরা সবাই একটু ঘুমিয় নেবার চেষ্টা করলাম।
