জাহাজটা আমাদের মধ্যে ব্যবধান কমাতে কমাতে যখন সিকি মাইলের মধ্যে চলে এসেছে, তখন তিনজন নাবিককে আমাদের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তাকিয়ে থাকতে দেখলাম। তাদের দুজন গলুইয়ের ওপর জড়ো করা পালের উপর বসে, আর তৃতীয়জন আমাদের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে। লোকটা কৃষ্ণকায়, দীর্ঘাকৃতি আর অমিত শক্তিধর বলেই মনে হল।
একটু পরেই জাহাজটা আরও কাছে এগিয়ে এলে দেখলাম, কৃষ্ণকায় দীর্ঘাকৃতি লোকটার মুখে হাসির ছোপ সুস্পষ্ট।
আমাদের বাঞ্ছিত জাহাজটা ক্রমে কাছে আমাদের আরও কাছে এগিয়ে এলো। এবার অতর্কিতে সে লোকটার মাথার লাল ফানেলের টুপিটা হাওয়ায় উড়ে সমুদ্রের পানিতে পড়ে গেল। এদিকে তার সামান্যতম খেয়ালও নেই। সে আগের মতো হেসে হেসে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করতে লাগল। বাস্তবিকই বিচিত্র কাণ্ড বটে।
জাহাজটা এগোতে এগোতে যত কাছে এগিয়ে আসতে লাগল আমাদের বুকের ভেতরের উথালি-পাথালি ভাবটা ততই বাড়তে লাগল।
ঠিক তখনই আমাদের একান্ত বাঞ্ছিত জাহাজটা থেকে কেমন যেন একটা উকট গন্ধ বাতাস বাহিত হয়ে আমাদের নাকে আসতে লাগল। এর তুল্য দুর্গন্ধ পৃথিবীতে অন্য কোনো কিছু থেকে নির্গত হয় বা হয়েছে বলে, জানা নেই। হয়তো বা একমাত্র নরকেই এমন শ্বাসরোধকারী উৎকট গন্ধ পাওয়া যায়–আমার ধারণা ভুলও হতে পারে।
আমি মুক্ত বাতাসে দম বন্ধ হয়ে আসার পরিস্থিতিটাকে সামাল দেবার চেষ্টা চালিয়ে যেতে যেতে আমার দুই সহযাত্রীর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। দেখলাম, তাদের মুখ চকের চেয়ে বেশি ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
তখন সে পরিস্থিতি তাতে কোনো চিন্তা করা বা প্রশ্ন করার মতো এতটুকুও ফুরসৎ নেই। জাহাজটা ধরতে গেলে হাতের নাগালের মধ্যে, প্রায় পঞ্চাশ ফুটের মধ্যে চলে এসেছে।
ব্যাপার দেখে মনে হল, আমাদের জাহাজ থেকে নামবার পথটার গায়েই আমাদের বাঞ্ছিত জাহাজটাকে দাঁড় করানো হবে। আমরা যেন নৌকার সাহায্য ছাড়াই এটা থেকে সে জাহাজটায় চলে যেতে পারি।
জাহাজটা খুবই ধীরগতিতে এগোতে এগোতে আমাদের বিশ ফুটের মধ্যে চলে এলো। এবার সম্পূর্ণ ডেকটাকে দেখা আমাদের পক্ষে সম্ভব হল।
আমি আচমকা নাকে হাত দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে দিলাম। আর প্রায় অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করলাম–‘কী বীভৎস! কী নরকীয় দৃশ্য রে বাবা!
মুহূর্তের মধ্যে যে ভয়ঙ্কর দৃশ্য আমার চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠল তা কোনোদিনই আমার মন থেকে মুছে ফেলতে পারব না। একেবারেই অভাবনীয় অবিশ্বাস্য দৃশ্যটা হচ্ছে, ডেকের ওপরে পাশাপাশি গা-ঘেষাঘেষি করে পড়ে আছে পঁচিশ ত্রিশটা নারী-পুরুষের পচা গলা লাশ। আর সেই সঙ্গে উৎকট গন্ধ যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে।
নারকীয় দৃশ্যটা চোখে পড়তেই আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। বেশিক্ষণ চোখের সামনে যে ভয়ঙ্কর দৃশ্যটার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলাম না। তবু এটুকু সময়ের মধ্যেই আমি দেখতে পেলাম ওই লাশ কয়টা ছাড়া জীবিত কোনো মানুষই নেই।
সত্যি কথা বলতে কি, আমরা তখনও খুশিতে এমনই মশগুল যে, ওই প্রাণহীন পচা গলা মানুষগুলোর কাছেই চিৎকার করে সাহায্য ভিক্ষা করেই চললাম। বল্গাহীন খুশি আর হতাশায় আমাদের কাণ্ডজ্ঞান যে অনেক আগেই লোপ পেয়েছে। ফলে মরা মানুষের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা চলে সে বোধটুকু যে আমরা হারিয়ে বসেছি। মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটলে মানুষের পক্ষে যা করা সম্ভব আমরাও ঠিক সেরকম কাজেই মেতে গেলাম।
আমরা ভীত-সন্ত্রস্ত কণ্ঠে প্রথম চিৎকার করে সাহায্য ভিক্ষা করার সঙ্গে সঙ্গে নবাগত জাহাজটার মাস্তুলের কাছাকাছি অঞ্চল থেকে কোনো একটা অস্পষ্ট সাড়া ভেসে এলো। সে আওয়াজটার সঙ্গে মানুষের কণ্ঠস্বরের অবিকল মিল খুঁজে পেলাম।
উৎকর্ণ হয়ে কণ্ঠস্বরটা আবিষ্কার করতে চেষ্টা করলাম। আর তা করলামও। দীর্ঘকৃতি শক্তিধর সে লোকটা তখন জাহাজের রেলিং ধরে নিচের দিকে ঝুঁকে রয়েছে। কিন্তু তার মুখটা দেখতে পেলাম না। কারণ, সে ঘাড় ঘুরিয়ে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে রয়েছে।
অনুসন্ধিৎসু নজরে লক্ষ্য করে দেখলাম, তার হাত দুটো রেলিং-এর ওপর দিয়ে ঝুলিয়ে দেওয়া আর শক্ত দড়ি দিয়ে পা দুটো মাস্তুলের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে বেঁধে দেওয়া। আর তার পিঠের দিকের জামার ভেঁড়া অংশটার ওপরে একটা গণ্ড ছিল বসে ঠোঁটটাকে ভেতরে চালান করে দিয়ে পচা গলা মাংস ঠুকরে ঠুকরে পরম তৃপ্তিতে খেয়ে চলেছে। রক্তের ছোপ লেগে তার পালকগুলো লাল হয়ে গেছে।
ঢেউয়ের চাপে জাহাজটা একটু ঘুরে গেলে দৃশ্যটাকে আর ভালোভাবে দেখার সুযোগ পেলাম। পাখিটা এবার খুবই কষ্ট করে লোকটার দেহের ভেতর থেকে রক্তে জবজবে মাথাটাকে বের করে আনল। তারপর বার দু-তিনেক এদিক-ওদিক তাকাল। কি ভাবল, কি বুঝল, কে জানে। এবার সেটা হঠাৎ উড়ে এসে আমাদের ডেকের ওপর বার বার চক্কর মারতে লাগল।– পাখিটার ঠোঁটে কুণ্ডলী পাকানো লিভারের মতো কি যেন একটা বস্তুকে ঝুলতে দেখা গেল।
আমি অপলক চোখে উকণ্ঠার সঙ্গে ব্যাপারটার ওপর সজাগ দৃষ্টি রেখে চললাম। একেবারেই হঠাৎ একটা অভাবনীয় ব্যাপার ঘটে গেল। কুণ্ডলি পাকানো রক্তমাখা মাংসপিণ্ডটা আচমকা পাখিটার ঠোঁট থেকে খসে দুম্ করে পার্কারের পায়ের কাছে আছাড় খেয়ে পড়ল।
পরম পিতা আমাকে মার্জনা করুন। হঠাৎ-ই একটা চিন্তা আমার মাথায় খেলে গেল, তবে সে আকস্মিক চিন্তাটার কথা এখনই ফাঁস করার ইচ্ছা আমার আদৌ নেই, করবও না।
