স্বীকার করছি, আমার বন্ধুবর অগাস্টাস যে আবার স্বাভাবিকতা ফিরে পাবে এরকম ধারণা আমার অন্তত ছিল না। সত্যি কথা বলতে কি, তার ধড়ে জীবনের কোনো লক্ষণই আমার নজরে পড়েনি।
গুটি গুটি এগিয়ে বন্ধুর কাছে গিয়ে, অনুসন্ধিৎসু নজরে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বুঝতে পারলাম, খুব বেশি পরিমাণে রক্তক্ষরণের ফলেই তার শারীরিক পরিস্থিতি এমন খারাপ হয়ে পড়েছে, সংজ্ঞা হারিয়ে এলিয়ে পড়েছে।
বন্ধুর হাতে একটা ব্যান্ডেজ করা ছিল। ক্রমাগত ঢেউয়ের ধাক্কা লেগে লেগে সেটা অনেক আগেই স্থানচ্যুত হয়ে পড়ে। আর সে যতটা দীর্ঘসময় ধরে নোনা পানির সংস্পর্শে থাকার ফলে পরিস্তিতি এমন হয়ে পড়েছে। তবে এও লক্ষ্য করলাম, তার শরীরের কোনো অংশের বাঁধনই চামড়া ও মাংস ভেদ করে বসে যায়নি।
আমরা দুজন তাকে ধরাধরি করে একটা শুকনো ফাঁকা জায়গায় শুইয়ে দিলাম।
আমি অনুসন্ধিৎসু চোখে তার এলিয়ে পড়ে থাকা সংজ্ঞাহীন দেহটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সমুদ্রের মুক্ত বাতাস পাওয়ায় কিছুক্ষণের মধ্যেই সে হৃত সংজ্ঞা ফিরে পেতে আরম্ভ করল। একটু পরেই সে প্রায় স্বাভাবিতা ফিরে পেয়ে ধীরে ধীরে উঠে বসল।
দড়িদড়ার বাঁধন ও দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে গিয়ে আমরা যে অবর্ণনীয় কষ্টের শিকার হয়েছিলাম তা থেকে মুক্ত হবার পর আমাদের যা-কিছু কষ্ট সবই ক্ষুধা ও তৃষ্ণাজনিত। কিন্তু হায়। যেদিকে, যতদুর নজর চলে কেবল পানি আর পানি। অকুল নোনা পানির ছড়াছড়ি। হাতের নাগালের মধ্যে এত পানি তবু পানি তৃষ্ণায় আমাদের ছাতি ফেটে যাবার উপক্রম হল। এতই নোনা যে এর এক ফোঁটাও মুখে তোলার উপায় নেই।
মানুষ যত কঠিন সমস্যা সম্মুখীন, হোক না কেন তবু আশা ছাড়তে পারে না। আমাদের অবস্থাও হলো ঠিক তাই। আশায় বুক বেঁধে প্রতীক্ষায় রইলাম, ভাবলাম, হয়তো অচিরেই কোনো জাহাজ আমাদের পরিস্থিতির কথা সহানুভূতির সঙ্গে বিচার করে এগিয়ে আসবে, আমাদের উদ্ধার করবে। আর পরম পিতার কাছে নতজানু হয়ে করজোড়ে প্রার্থনা জানালাম, তিনি যেন এ চরম সঙ্কটজনক পরিস্থিতি থেকে আমাদের উদ্ধার করেন। এমন পরিস্থিতিতে তাঁর কথাই যে অন্তঃস্থলে সবার আগে জেগে ওঠে।
ন্যারেটিভ আর্থার গর্ডন পাম – ১০
১০. ॥ দশম অধ্যায় ।
আমরা এগিয়ে চলেছি তো চলেইছি। এ-চলার শেষ যে কোথায় কে জানে? তবু স্রোতের টানে আমাদের যে না চলে উপায় নেই। এ ক্ষেত্রে তো আমাদের ইচ্ছাশক্তির কোনো দামই নেই।
পথ চলতে চলতে আমরা এমন এক ঘটনার সম্মুখীন হলাম যা আমার জীবনে খুবই উল্লেখযোগ্য বলে মনে করি। কারণ, সে ঘটনাটা প্রথমে আমাকে এক অনির্বচনীয় আনন্দের জোয়ারে ভাসিয়ে দিল আর তার পরেই আমার মনকে অন্তহীণ আনন্দে ভরিয়ে দিল।
আমরা সকালের দিকে ডেকে শুয়ে সময় কাটাচ্ছি। আমি হঠাৎ পাশ ফিরতেই অগাস্টাসের দিকে নজর গেল। আমি সচকিত হয়ে ব্যাপারটাকে অনুসন্ধিৎসু নজরে নিরীক্ষণ করার চেষ্টা করলাম। না, দেখার ভুল অবশ্যই নয়। আমি দেখলাম, অগাস্টাসের মুখটা চকের মতো, মরা মানুষের মতো ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। আর ঠোঁট দুটো অনবরত তির তির করে কাঁপছে।
তার মুখের দিকে চোখ পড়তেই আমার বুকের ভেতরে ঢিবঢিবানি শুরু হয়ে গেল অস্বাভাবিক ভয় পেয়ে ক্ষীণ ও কাঁপা কাঁপা গলায় তার নাম ধরে বার কয়েক ডাকলাম। কিন্তু তার দিকে থেকে কোনো সাড়াই পেলাম না।
অগাস্টাসের কাছে গিয়ে, তার মুখের ওপর ঝুঁকে আর ভালো করে লক্ষ্য করার পর ধরেই নিলাম, সে হঠাৎ কোনো মারাত্মক ঝামেলার শিকার হয়েছে। তার চোখ দুটোর দিকে অনুসন্ধিৎসু নজরে তাকিয়ে স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, আমার পিছন দিককার একটা কিছুর দিকে সে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রয়েছে। অকস্মাৎ ঘাড় ফিরিয়ে তাকানো মাত্র আমার শরীর ও মন এমন এক অবর্ণনীয় রোমাঞ্চে ভরপুর হয়ে গেল, সে আনন্দানুভূতি জাগল তা কোনোদিন মুহূর্তের জন্যও মন থেকে মুছে যাবে না। কি? কি দেখলাম, তাই না? আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম, বড় বড় একটা পালতোলা জাহাজ আমাদের দিকে দ্রুত ছুটে আসছে। আমাদের থেকে সেটার ব্যবধান মাত্র মাইল দুই।
আমি যন্ত্রচালিতের মতো অতর্কিতে লাফিয়ে সোজাভাবে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ডান হাতটা সেটার দিকে উঁচু করে নিশ্চল-নিথর পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলাম।
আমার সঙ্গে সঙ্গে ডার্ক পিটার্সও তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। সে উন্মাদের মতো ডেকময় লাফালাফি নাচানাচি জুড়ে দিল।
আমাদের দুজনের কার মধ্যে যে আনন্দের সঞ্চার বেশি তা বলা খুব মুশকিল। আর মাত্রাতিরিক্ত আনন্দ সহ্য করতে না পেরে পার্কার বিলাপ পেড়ে কাঁদতেই শুরু করল, শিশুর মতো হাপুস নয়নে অনবরত কেঁদেই চলল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাজটা আমাদের মোটামুটি কাছাকাছি চলে এলো। এবার সেটাকে আরও ভালোভাবে দেখার সুযোগ পেলাম। বুঝলাম, জাহাজটা খুবই বড়। হল্যান্ডে নির্মিত। আর চারিদিক কালো রঙের প্রলেপ দেওয়া।
ভালোভাবে লক্ষ্য করে বুঝতে পারলাম, ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবে ওই জাহাজটারও খুবই ক্ষতি হয়েছে।
বাতাস ক্রমে পড়তে পড়তে খুবই পড়ে গেল। পালে খুব বেশি বাতাস না লাগায় জাহাজটা এখন ধীরগতিতে চলতে শুরু করেছে।
জাহাজটার গতি মন্থর হয়ে পড়ায় আমরা যারপরনাই উল্কণ্ঠায় ভুগতে লাগলাম। অনন্যোপায় হয়ে সাধ্যমত গলা চড়িয়ে ডাকাডাকি শুরু করে দিলাম।
