চাপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ডার্ক পিটার্স বলল–‘কিন্তু, কিন্তু সে যে অনেক দেরি! সুযোগ আসতে আসতে যে আমি মরে হেজে যাব।
মিনিট কয়েক পরেই ডার্ক পিটার্সের কথা একেবারেই থেমে গেল। ফো-ফা কিছু শোনা গেল না। আমরা বাধ্য হয়ে নিঃসন্দেহ হলাম, তার মৃত্যু হয়েছে। সব দুঃখ যন্ত্রণা, হতাশা-হাহাকারের উর্ধে চলে গেছে।
এ-তো গেল গত রাতের ঘটনা। আজকের দিন পেরিয়ে নেমে এলো সন্ধ্যার অন্ধকার। সমুদ্রও অনেক শান্ত, ঝড়ও নেই বললেই চলে। জাহাজের খোলের ওপর দিয়ে ঢেউ বয়ে যাওয়া অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।
এদিকে সঙ্গিদের দিক থেকে কোনোরকম সাড়া শব্দ না পেয়ে আমি কণ্ঠস্বরে উকণ্ঠা প্রকাশ করে বন্ধু অগাস্টাসের নাম ধরে বার কয়েক ডাকাডাকি করলাম।
সে এমনই দুর্বল গলায় আমার ডাকে সাড়া দিল যা আমার কান পর্যন্ত পৌঁছল না।
অগাস্টাসের দিক থেকে সাড়া না পেয়ে আমার বুকের ভেতরে ধড়াস্ করে উঠল। আতঙ্কে গলা শুকিয়ে এলো। এবার কোনোরকমে ডার্ক পিটার্স আর পার্কারের নাম ধরে ডাকাডাকি করলাম। না, এবারও আমাকে হতাশ হতে হল।
একটু পরেই আমি যেন একটু একটু করে কেমন এক সংজ্ঞাহীনতার মধ্যে তলিয়ে যেতে লাগলাম। হতাশা বা হাহাকার নয়–আমার কল্পনায় বহু আনন্দোচ্ছল ছবি একের পর এক ফুটে উঠতে লাগল। সে মুহূর্তে মন চাঙা-করা যেসব দৃশ্য দেখেছিলাম তাদের মধ্যে মুখ্য ছিল–গতি।
অবচেতন ভাবটা কেটে গিয়ে যখন আমার মধ্যে স্বাভাবিকতা ফিরে এলো তার অনেক আগেই সূর্য উঠেছে।
চারদিকে সূর্যের ঝলমলে আলো ছড়িয়ে পড়লেও প্রকৃত পরিবেশটাকে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলাম না। আমার সামনে পিছনে–চারদিকে যা-কিছু রয়েছে সবই যেন অজানা অচেনা।
তখনও যেন বার বার আমার মনে হতে লাগল, আমি সেই জাহাজের খোলের অন্ধকার কুঠরিটার মধ্যেই রয়েছি। আর পার্কারের দেহটা আমার পোষা কুকুর টাইগার ছাড়া কিছু নয়। এ কী! এ কেমন দশা হলো আমার!
শেষমেশ যখন আমার অবচেতন ভাবটা পুরোপুরি কেটে গেল, স্বাভাবিকতা ফিরে পেলাম, তখন সমুদ্র উন্মাদনা হারিয়ে স্বাভাবিক হয়ে এসেছে আর বাতাসের গতিও স্বাভাবিক।
দীর্ঘ নিরবচ্ছিন্ন অস্থিরতায় আমার বাঁ হাতের বাঁধন ঢিলে হতে হতে পুরোপুরি খুলেই গেছে। তবে কনুইয়ের কাছে বেশ কিছুটা কেটে গেছে, চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়েই চলেছে। আর ডান হাতটা চেতনা হারিয়ে ফেলেছে। দড়ি চেপে বসে থাকায় কবজি– পুরো হাতটাই ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। হাত দুটোর দিকে নজর যেতেই আমি চমকে উঠলাম।
এবার চারিদিক তাকিয়ে আমাদের বর্তমান পরিস্থিতিটা সম্বন্ধে ধারণা করে নেওয়া চেষ্টা করলাম। দেখলাম ডার্ক পিটার্সের মধ্যে তখনও প্রাণের লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে। কিন্তু তার কোমরটা ঘিরে এমন পুরু একটা দাগ নজরে পড়ছে যা হঠাৎ করে দেখলে
স্পষ্ট মনে হচ্ছে কেউ যেন সেখান থেকে কেটে শরীরটাকে দুটুকরো করে দিয়েছে। তার অবস্থা দেখে আমি নিজের ব্যথা-বেদনার কথা ভুলে গেলাম।
আমাকে নড়াচড়া করতে দেখে ডার্ক পিটার্স অঙ্গুলি-নির্দেশ করে তার কোমরটা আমাকে দেখাল। আর সে সঙ্গে তীব্র যন্ত্রণার কথাও বুঝিয়ে দিল।
এদিকে বন্ধু অগাস্টাসের দিকে চোখ পড়তেই আমি সচকিত হয়ে তার দিকে। সাধ্যমত ঝুঁকলাম। আমার মধ্যে প্রাণের কোনো অস্তিত্বই আমার নজরে পড়ল না। সে ভাঙা চড়কি যন্ত্রটার সঙ্গে একেবারে জড়াজড়ি করে পড়ে রয়েছে।
খুবই ক্ষীণকণ্ঠে পার্কার আমাকে বলল–‘আমাকে এ কঠিন পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করার কোনোরকম শক্তি সামর্থ্য তোমার আছে কী?
আমি তার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললাম–মনকে শক্ত করে বাঁধুন। ধৈর্য্য ধরুন, সাহস অবলম্বন করুন। আমার দিক থেকে চেষ্টার কিছুমাত্রও ত্রুটি হবে না, কথা দিচ্ছি। তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে পাজামার পকেটে হাতটা চালান করে দিয়ে ছোট ছুরিটা বের করে আনলাম।
দুর্বল হাত দুটো দিয়ে বার-কয়েক চেষ্টা করার পর তার সুতীক্ষ ফলাটা খুলতে পারলাম। এবার বাঁ হাতে ডান হাতে এবং অন্য দড়ি দড়ার বাঁধন খুলে কেটে ফেললাম।
হায়! আমার একী শোচনীয় অবস্থা হল। পা দুটো অবশ হয়ে গেছে। দাঁড়াবার মতো শক্তি-সামর্থ্যটুকু যে হারিয়ে বসেছি। আবার ডান হাতটাকেও নাড়াতে চাড়াতে পারছি না।
আমার অবস্থার কথা পার্কারকে বললাম। সে ধৈর্য্য ধরে সবকিছু শুনে ক্ষীণকণ্ঠে আমাকে উপদেশ দিল–এক কাজ কর। হাত-পা ছড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ পড়ে থাক। শরীরের রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তারপর দেখবে হাত-পায়ের হৃত বল অনেকাংশে ফিরে পেয়েছ।
তার পরামর্শ মতো কাজ করে ফল কিছুটা পেলাম বটে। সত্যি সত্যি কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বাভাবিকতা ফিরে পেলাম।
এবার হাতের ছুরিটাকে মুঠো করে ধরে হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে, প্রায় বুকে হেঁটে পার্কারের দিকে এগোতে লাগলাম। তার কাছে পৌঁছেই ব্যস্ত হাতে তার যাবতীয় বাঁধন কাটতে আরম্ভ করলাম। বাঁধনমুক্ত হবার পর মিনিট কয়েকের মধ্যেই পার্কার হৃত শারীরিক বল ফিরে পেতে আরম্ভ করল।
তার কোমরে দড়ির বাধন এমনভাবে চেপে গেছে যে অনবরত চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত ঝরছে। দড়িটা ছিল জামা আর পাজামার ওপর দিয়ে, তাতেই এরকম ভয়ঙ্কর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। নইলে তার শরীরটাই হয়তো বা দুটুকরো হয়ে যেত।
