.
০৯. ॥ নবম অধ্যায় ॥
এমন বেসামাল পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার ভয় আমরা আগেভাগেই করেছিলাম। এটাকে আমাদের ভাগ্যের ব্যাপার বলেই মনে করা যেতে পারে। কারণ, রাতের অন্ধকার নেমে আসার আগেই আমরা চারজনই ডেকের ওপর চলে গিয়েছিলাম। ডেকের ওপর পড়ে থাকা চড়কি যন্ত্রটার ভাঙা অংশের সঙ্গে নিজেদের শক্ত করে বেঁধে রেখেছিলাম। ফলে আমরা জাহাজ থেকে গড়িয়ে সমুদ্রে পড়ে যাইনি। আমরা নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পেয়ে যাই। আমরা যদি আগেভাগে সতর্কতা অবলম্বন না করতাম তবে আমাদের মৃত্যু অনিবার্য ছিল।
জাহাজের পানি সরে গেল বটে। কিন্তু ইতিমধ্যে আমাদের জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে যাবার জোগাড় হল। আমিই সবার আগে সঙ্গিদের গলা ছেড়ে ডাকাডাকি করলাম।
আমার ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকিতে একমাত্র অগাস্টাসের গলা শোনা গেল– ‘আমাদের তো জীবন শেষ হতে চলেছে। ঈশ্বর আমাদের রক্ষা করুন।
পর মুহূর্তেই অন্য দুজনের গলাও কানে এলো–ভেঙে পপারো না। বুকে সাহস অবলম্বন কর। আশা এখনও আছে। হতাশ হবার কোনো কারণই নেই। এমন একটা জাহাজ কিছুতেই ডুবে যেতে পারে না। ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবের জন্য ব্যাপারটা আমার মাথা থেকে উবে গিয়েছিল।
নতুনতর আশার বশবর্তী হয়ে চড়কি যন্ত্রটার সঙ্গে নিজেকে আরও ভালো করে বেঁধে নিলাম।
আমার বাঁধাবাঁধি মিটতে না মিটতেই বুঝতে পারলাম, আমার সঙ্গিরাও চড়কি যন্ত্রটার সঙ্গে নিজেদের বাঁধতে শুরু করেছে।
চারিদিকে ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। আর অন্ধকারটা এত গাঢ় যে, নিজের হাত দুটোও দেখা যায় না। আর ঝড়ের তাণ্ডব আর ঢেউয়ের ক্রোধোন্মত্ততা পরিবেশটাকে এমন ভয়ঙ্কর করে তুলেছে যা ভাষায় ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
আমাদের জাহাজের ডেকটা সমুদ্রের পানির সমতল হয়ে এগিয়ে চলেছে। শুধু কি এই? উত্তাল-উদ্দাম সমুদ্রের ফেনারাশি থেকে থেকে জাহাজের ওপর উঠে আসছে, কখন বা কিছু অংশ আমাদের ওপর দিয়ে বয়ে যেতে লাগল।
এদিকে পরিস্থিতি এমন খারাপ হয়ে পড়ল যে, আমাদের মাথাগুলো প্রতি তিন সেকেণ্ডে মাত্র একটা সেকেণ্ডের বেশি সময় পানির ওপরে জেগে থাকছে না।
ব্যাপারটা বাস্তবিকই অদ্ভুত, একেবারে অবিশ্বাস্য, আমরা চারজন এত কাছাকাছি, বলতে গেলে গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে অবস্থান করছি তবুও কেবলমাত্র কণ্ঠস্বর শোনা ছাড়া কেউ, কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। আর সে জাহাজের ওপর আমরা থেকে থেকে আছাড় খেয়ে পড়ছি তাকেও চোখে দেখা সম্ভব হচ্ছে না।
রাতের অন্ধকার কেটে গিয়ে প্রকৃতির বুকে ভোরের আলো দেখা না দেওয়া পর্যন্ত ভয়ংকর অবস্থার মধ্যেই আমাদের প্রতিটা মুহূর্ত কাটাতে হল।
অন্ধকার কেটে গিয়ে দিনের আলো ফোঁটার পর ভয়ঙ্কর অবস্থাটা আরও অনেক বেশি ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে দেখা দিল। আমাদের জাহাজটা অবান্দিওতের মতো, এক টুকরো কাঠের পর মুহূর্তে আবার আছাড় খেয়ে নিচে পড়ছে। হয়তো একমাত্র ভাগ্যের জোরেই আমরা এখনও সমুদ্রের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাইনি।
ঝড়ের তাণ্ডব কমা তো দূরের কথা, বরং উন্মত্ততা উত্তরোত্তর বেড়েই চলল।
ঘূর্ণিঝড়। এটা যথার্থই ঘূর্ণিঝড়। এর কবল থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো আশাই নেই। তবে যতক্ষণ পিতৃদত্ত জীবনটাকে টিকিয়ে রাখতে পারি, এই যা।
আরও কয়েকটা ঘণ্টা সম্পূর্ণ নীরবতার মধ্যেই আমরা কাটিয়ে দিলাম। প্রতিটা মুহূর্তেই আমাদের ভয় এই বুঝি দড়িদড়া ছিঁড়ে গেল, চড়কি যন্ত্রটা বুঝি জাহাজের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলল। আর আকাশ-ছোঁয়া ঢেউগুলো ক্রোধে তর্জন গর্জন করতে করতে আচমকা আমাদের পানির এত তলায় নিয়ে চলে যাবে যেখান থেকে আর কোনোদিন উঠে আসতে পারব না। দম বন্ধ হয়ে আমাদের ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে। হায় ঈশ্বর! এ কী মহাসঙ্কটের মুখে ফেললে!
আর যা-ই হোক, ঈশ্বরের অসীম দয়ায় সে মহাসঙ্কট থেকে আমরানিষ্কৃতি পেয়ে গেলাম। ঝড়ের তাণ্ডব অনেক কমে গেছে। দুপুরের দিকে সূর্যের কিরণে চারদিক ঝলমল করতে লাগল।
সমুদ্রও অনেকাংশে শান্ত হয়ে এসেছে। তার সে ক্রোধোন্মত্ত ভাব স্তিমিত হতে হতে প্রায় স্বাভাবিকতা ফিরে এসেছে। প্রায়-শান্ত সমুদ্রের বুকে সূর্যের সোনালি আলো পড়ে যেন এক অনিবৰ্চনীয় শোভা ধারণ করেছে। সত্যি এ যেন এক অভাবনীয়, একেবারে ব্যাপার।
এর আগের সন্ধ্যায় অগাস্টাস তার পাশে অবস্থানরত ডার্ক পিটার্সের কাছে বলল–‘আচ্ছা, আপনার কি মনে হয়, আমাদের জীবন রক্ষা পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে, নাকি মৃত্যু অবধারিত?
ডার্ক পিটার্সের দিক থেকে হ্যাঁ বা না কোনো জবাব না পেয়ে নিঃসন্দেহই হলাম, লোকটা ডুবেই মরেছে।
অগাস্টাস আৎকে উঠে আবারও তার নাম ধরে বার-কয়েক ডাকল।
এবার দুর্বল, খুবই ক্ষীণকণ্ঠে সে কোনোরকমে সাড়া দিল। তার দিক থেকে সাড়া পাওয়ায় আমাদের মন যে কী আনন্দে নেচে উঠল তা আর বলার নয়।
দুর্বল গলায় কোনোরকমে সে বলল–‘দড়িগুলো আমার পেটের ওপর এমন আঁট হয়ে বসে গেছে যে, যন্ত্রণা সহ্য করাই দায় হয়ে পড়েছে! যদি পার আমার দড়ির বাধন আগা করে দাও, নইলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাকে শেষ করে দেবার ব্যবস্থা কর।’
তার পরিস্থিতি খারাপ বুঝেও সে মুহূর্তে আমাদের পক্ষে কিছুই করা সম্ভব হলো । তাকে সাহায্য করতে না পেরে অগাস্টাস সমবেদনা প্রকাশ করে বলল–‘মি. পিটার্স, পরিস্থিতি তো বুঝতেই পারছেন। ধৈর্য্য ধরে, দাঁতে দাঁত চেপে পরিস্থিতির মোকাবিলা করা ছাড়া কোনো উপায়ই নেই, অনুগ্রহ করে আর একটু ধৈর্য্য ধরুন। সামান্যমাত্র মওকা পেলেই আমরা আপনাকে অবশ্যই সাহায্য করব, জীবনরক্ষার জন্য যা-কিছু করণীয় কোনোকিছুরই ত্রুটি রাখব না, নিঃসন্দেহ হতে পারেন।
