অগাস্টাস যখন চরম সঙ্কটজনক মুহূর্তে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে অক্ষম হয়ে মৃত্যুর হাতে আত্মসমর্পণ করতে চলেছে ঠিক তখন টাইগার তীব্র হুঙ্কার দিয়ে সরাসরি জোন্সের ওপর লাফিয়ে পড়ে তাকে একেবারে ধরাশায়ী করে দেয়।
বন্ধুবর অগাস্টাস আহত হয়েছে, রক্তক্ষরণ ঘটছে। কিন্তু সবকিছু বুঝেও আমার কিছুই করার ছিল না। কারণ আমি তখন আমার ছদ্মবেশ সামলাতে ব্যস্ত ছিলাম।
আমার ইয়া তাগড়া কুকুর টাইগার ইতিমধ্যেই দু-পায়ের থাবা দিয়ে জোন্সের গাল চেপে ধরেছে।
এদিকে ডার্ক পিটার্স একটা টুল টেনে নিয়ে বিদ্যুৎ গতিতে মাথার ওপর তুলে নিয়ে দুম করে গ্রীলির মাথা লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারল। ব্যস, চোখের পলকে তার মাথাটা একেবারে ঘেঁৎলে গেল। গল গল করে রক্ষক্ষরণ ঘটতে লাগল। টাইগার এবার হিক্সকে নিয়ে পড়ল। অনায়াসেই সে তার নিকেশ করে দিল। শেষ শত্রু হিকসও খতম হল।
এক-এক করে সব কয়টা শত্রু নিপাত করে আমরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। আমরাই এবার জাহাজটার মালিক হয়ে গেলাম। জাহাজটার মালিকানা পাওয়ায় আমাদের ডার্ক পিটার্স, বন্ধু অগাস্টাস আর আমার যে কী উল্লাস তা প্রত্যক্ষদর্শী ছাড়া কাউকে বুঝিয়ে বলা সম্ভব না।
আমরা, কেবল আমরা তিনজনই এতবড় একটা জাহাজের মালিকানা লাভ করলাম।
শত্রুপক্ষের মধ্যে একমাত্র রিচার্ড পার্কারের দেহে প্রাণের লক্ষণ রয়েছে। আমার পাম্পের হাতলের আগাতে সে সংজ্ঞা হারিয়ে দীর্ঘ সময় এলিয়ে পড়েছিল। তার মধ্যে প্রাণের অস্তিত্ব আছে কিনা নিঃসন্দেহ হবার জন্য ডার্ক পিটার্স জুতোর ডগা দিয়ে খুঁকে দেওয়া মাত্র সে বিশ্রি স্বরে গুঙিয়ে বার বার ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগল।
রিচার্ড পার্কারকে প্রাণে না মেরে শিকল দিয়ে পিছমোড়া করে বেঁধে রাখা হল।
আর আমার বীর কুকুর টাইগার তখনও জোন্সের বুকের ওপর গঁাট হয়ে বসে অনবরত গর্জে চলেছে। তার প্রাণবায়ু অনেক আগেই খাঁচাছাড়া হয়ে পরলোকের। উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। টাইগার কামড়ে কামড়েই তার দফা রফা করে দিয়েছে।
ইতিমধ্যে মাঝরাত পেরিয়ে রাত একটা বেজে গিয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব সমান তালেই চলেছে। আর জাহাজটার পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হয়ে পড়ছে। মাস্তুলটা সেই তখন থেকে ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করে চলেছে। এতক্ষণ টিকে রয়েছে। আর কতক্ষণ। নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারবে, কে জানে। ইতিমধ্যেই বার-কয়েক মড় মড় আওয় জে নিজের অক্ষমতার কথা ঘোষণা করেছে। যে কোনো মুহূর্তে সেটা হুড়মুড় করে পড়ে যেতে পারে।
আবার এক নতুন সমস্যা দেখা দিল। উন্মত্ত সমুদ্রের বল্গাহীন জলোচ্ছ্বাসের ফলে পানি ঢুকে ঢুকে জাহাজের খোলটা প্রায় ভর্তি হয়ে গেছে। এখনও সময় আছে, পানি সেঁচে বের করে দিতে পারলে তবেই জাহাজটাকে রক্ষা করা সম্ভব।
আমরা তিনজন ছাড়া জাহাজের পানি সেঁচে বের করার জন্য আরও লোক দরকার। তাই রিচার্ড পার্কার এর বাঁধন খুলে তাকেও পানি সেঁচার কাজে লাগিয়ে দেওয়া হল। একটা পাম্প মেশিনও সর্বক্ষণ চালু রাখা হল।
নিদারুণ উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে আমরা রাতটা কাটালাম। আর সে সঙ্গে দেহ ও মনের ক্লান্তি তো রয়েছেই।
পূব আকাশে রক্তিম ছাপ ফুটে উঠল। তবু ঝড়ের তাণ্ডব এতটুকুও কমল না। সমুদ্রও আগের মতোই রুদ্র রূপ ধরেই রইল। ঝড় কমে প্রকৃতি শান্ত হবার কোনো চিহ্নই নজরে পড়ল না।
আমাদের তো হাত পা গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। লাশ কয়টার গতি করা দরকার। সেগুলোকে টেনে হিঁচড়ে ডেকের ওপরে নিয়ে গিয়ে মরা জন্তু জানোয়ারের মতো উত্তাল-উদ্দাম সমুদ্রের বুকে ছুঁড়ে মারতে লাগলাম।
এবার সবার আগে যা করার দরকার তা হচ্ছে মাস্তুলটাকে নামিয়ে ফেলা কিন্তু। সেটাকে খুলে নামিয়ে আনা সম্ভব নয় বুঝে ডার্ক পিটার্স একটা কুড়াল দিয়ে কেটে সেটাকে ধপাস্ করে জলে ফেলে দিল।
মাস্তুলটা কেটে পানিতে ফেলা দেওয়ায় জাহাজের কোনো ক্ষতি হলো না। তবে আচমকা জাহাজটা একদিক অস্বাভাবিক কাৎ হয়ে পড়ায় জাহাজের খোলটা আবার পানিতে বোঝাই হয়ে গেল। তবে পাম্প করে পানি বাইরে ফেলে দেওয়া সম্ভব হলো না। এভাবে বেশিক্ষণ চললে জাহাজটাকে রক্ষা করাই সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। যে কোনো মুহূর্তে এটা ডুবতে আরম্ভ করবে। ক্রমে সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ল। তখন বিকেল চারটের কাছাকাছি। ঝড়ের তাণ্ডব কমল তো না-ই, বরং অনেকগুণ বেড়ে গেল। পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়াল যে, ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল।
ক্রমে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাতের অন্ধকার নেমে এলো। ঝড় আরও প্রলয়ঙ্কর রূপনিল। আমাদের অন্তরাত্মা শুকিয়ে যাওয়ার জোগাড় হল। সকল পর্যন্ত জাহাজটাকে রক্ষা করা সম্ভব হবে কিনা সে বিষয়ে আমরা সন্দিহান হয়ে পড়লাম।
মাঝ রাত। জাহাজের খোলে হাঁটুসমান পানি দাঁড়িয়ে গেল। পাম্প করে এত পানি সেঁচে বাইরে ফেলা কি করে সম্ভব। তবে দাঁতে দাঁত চেপে আমরা জাহাজটাকে রক্ষা করার প্রাণান্ত প্রয়াস চালাতে লাগলাম।
হঠাৎ হ্যাঁ, একেবারেই হঠাৎ একটা পর্বত প্রমাণ ঢেউ এসে তীব্র আক্রোশে আমাদের জাহাজটার ওপর আছাড় খেয়ে পড়ল। জাহাজটাকে সম্পূর্ণরূপে পানির তলায় নিয়ে চলে গেল। সে যে কী অভাবনীয় মর্মান্তিক পরিস্থিতি সে কথা ভাবলে আজও আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে, বুকের ভেতর ধুকপুকানি শুরু হয়ে যায়।
