তিনি ডাক্তার টেম্পলটনের শরণাপন্ন হন। তিনি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সে উপসর্গটা হ্রাস করার জন্য সাধ্যমত চেষ্টা চালাতে লাগলেন। এ কাজে তিনি সংরক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করলেন। তার কপালে জোঁক বসিয়ে দেওয়া হল। খুবই কম সময়ের মধ্যেই তিনি মারা গেলেন। পরবর্তীকালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে দেখা গেল, জোঁকগুলোকে যে পাত্রটার মধ্যে রাখা হয়েছিল ভুলবশত তাতে এমনকিছু সংখ্যক বিষাক্ত জলজকীট ছিল যা কাছাকাছি পুকুরগুলোতে প্রায়ই চোখে পড়ে। এ জলজ প্রাণীটা তার কপালের দক্ষিণ দিকের এক ধমণীকে কামড়ে ঝুলেছিল। বিষাক্ত কীটটি দেখতে চিকিৎসা কাজে ব্যবহৃত জেঁকের মতো দেখতে বলেই এরকম একটা ভুল হয়ে যায়। তারপর খুবই দেরিতে সেটা বুঝা গেল। এত বেশি দেরি হয়ে গিয়েছিল যে, তখন আর কিছুই করার সুযোগ ছিল না। আগে, সময়মত ব্যাপারটা ধরা পড়লে হয়তো কিছু করার সুযোগ পাওয়া যেত।
বিশেষ লক্ষ্যণীয়, চিকিৎসার কাজে ব্যবহৃত চার্লোটেসভিল নামক এ বিষাক্ত জলজ কীটটা যে জোঁক নয় তা একটু ভালোভাবে লক্ষ্য করলে সহজেই বুঝা যায়। একে চিনতে পারা এমনকিছু কঠিন সমস্যা নয়। এর গায়ের রং কালো। আর এটি সাপের মতো এঁকে বেঁকে চলাফেরা করে। চলার কৌশল দেখে একে জেক থেকে আলাদা। করা যেতে পারে।
আমি ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনার জন্য পত্রিকার সম্পাদক সাহেবের সঙ্গে দেখা করলাম। কথা প্রসঙ্গে আমি তাঁর কাছে প্রশ্ন রাখলাম–একটা কথা জিজ্ঞেস করছি, নিহত লোকটার নাম ‘Bedlo’ লেখার কারণটা কি, জানতে পারি কী?
সম্পাদক সাহেব আমার প্রশ্নের কি জবাব দেবেন হঠাৎ করে ভাবতে না পেরে আমতা আমতা করতে লাগলেন।
আমি এবার বললাম আপনারা যেমন Bedlo’ লিখেছেন, ঠিক এ পদ্ধতিতে নামের বানান লেখার বিশেষ কোনো যুক্তি, মানে যুক্তিপূর্ণ পদ্ধতি নিশ্চয়ই আপনারা অনুসরণ করেন, কী বলেন?
যুক্তি? যুক্তিপূর্ণ পদ্ধতি? আরে ভাই, এটা কোনো পদ্ধতির ব্যাপার নয়, নিছকই ছাপার ভুল। পৃথিবীর সবাইই জানে, Bedlo’ নামের বানান লেখাটার সময় শেষে একটা ‘e’ অবশ্যই বসানো চাই। এর অন্য কোনো বানান হয় বলে আমার অন্তত শোনা নেই। অবশ্য ছাপার ভুলের জন্যই এরকম প্রমাদ ঘটেছে।
সম্পাদকের দপ্তর থেকে বেরিয়ে আসার সময় আমি আপন মনেই বলতে লাগলাম–ব্যাপারটা তাহলে আর কিছুই না হোক অন্তত একটা ব্যাপাওে প্রকৃত উপন্যাসের চেয়েও অবাক হবার মতোই বটে। কারণ Bedlo’ নামটার শেষে ‘e ব্যবহার না করে লেখার মানে দাঁড়াচ্ছে, oldeb’ নামটাকেই ছাপার সময় ভুল করে হরফগুলোকে উলটেপাল্টা সাজানো হয়েছে। এ ছাড়া অন্য কিছু তো ভাবা যায় না। আর সম্পাদক সাহেবও তো বলেন ছাপার ভুলের জন্যই এ রকমটা ঘটেছে। কথাটা যুক্তিগ্রাহ্য, সন্দেহ নেই।
এ ডিসেন্ট ইন টু দ্য ম্যায়েস্ট্রোম্
পাহাড়ের চূড়া। আমরা ইতিমধ্যেই পাহাড়ের চূড়ায় হাজির হয়ে গেছি।
সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি দৃষ্টি ফিরিয়ে চারদিকের দৃশ্যাবলী দেখতে লাগলেন।
বার-কয়েক এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিয়ে শেষমেশ তিনি বললেন–কিছুদিন আগে হলে পরিস্থিতি এমনটা হতো না, অবশ্যই অন্যরকম হতো।
আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি মেলে তাকালাম। তিনি পূর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে বলে চললেন–হ্যাঁ, যদি আর কিছুদিন আগে হতো তবে আমার ছোট সন্তানটা আর তোমাকে অনায়াসেই এ রাতটা দেখিয়ে নিয়ে যেতে আমার পক্ষে কোসো বাধাই থাকত না।
আমি চোখের মণি দুটোকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারদিকের দৃশ্যাবলী দেখতে দেখতে প্রায় অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করলাম–হুম।
তিনি বলেই চললেন–কিস বছর তিনেক আগে আমার জীবনে এমন একটা ঘটনা ঘটে যায় যা আগে কোনোদিন কারো জীবনে ঘটেনি। আর যদি নিতান্তই ঘটে থাকে তবে এমন কথা বলার জন্য সে আর ইহলোকে থাকেনি।
শুধু কি এ-ই, তখন পুরো ছয়টা ঘণ্টা একনাগাড়ে যে ভয়ানক আতঙ্কের মধ্যে আমাকে কাটাতে হয়েছিল, তাতেই আমার দেহ-মন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ সে পরিস্থিতিটা সামাল দেওয়া আমার পক্ষে একেবারেই সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
মুহূর্তের জন্য থেমে একটু দম নিয়ে তিনি আবার মুখ খুললেন–তোমার ধারণা, আমি বুড়ো মানুষ, তাই না? আসলে কিন্তু আমি মোটেই তা নই। যৌবন থেকে বার্ধক্যে পৌঁছতে পুরো একটা দিনও কিন্তু আমার লাগেনি।
আমি যন্ত্রচালিতের মতো মুখ তুলে তাঁর দিকে সবিস্ময়ে তাকালাম।
আমার মুখের বিস্ময়ের ছাপটুকু তাঁর নজর এড়াল না। ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে তিনি এবার বললেন–হ্যাঁ ঠিকই বলছি, পুরো একটা দিনও লাগেনি। বুড়ো হতে, মানে মাথার কুচকুচোলো চুলকে সাদা করতে আমার শক্ত সাবুদ হাত-পা-কে দুর্বল করে তুলে আর স্নায়ুগুলোকে আমি অল্পসময়ে এবং অল্পায়াসেই শিথিল করে তুলতে পেরেছিলাম।
এবার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মুখের স্লান হাসিটুকু অব্যাহত রেখেই তিনি এবার বললেন–কি হে, আমাকে দেখে কী একজন জবুথবু বুড়ো মানুষ বলে মনে হচ্ছে না?
আমি মুহূর্তের মধ্যে তার আপাদমস্তক চোখ বুলিয়ে নিয়ে নীরবে মুচকি হাসলাম।
তিনি পূর্ব প্রসঙ্গের জের টেনে বলতে লাগলেন–বিশ্বাস কর, আজ আমি বুড়ো মানুষের মতোই সামান্য হাঁটাচলা করলে, কায়িক পরিশ্রম করলে রীতিমত হাঁপাতে থাকি, আর শরীর থর থর করে কাঁপতে থাকে। এমনকি একটা ছায়াকে দেখলেও ভয়ে জড়সড় হয়ে যাই।
