ডেকের ওপর পৌঁছে দেখলাম, সবকিছুই ঠিক আছে। আমরা তিনজনই কিছুটা পথ হামাগুড়ি দিয়ে পাড়ি দিয়ে সরু পথটা পেরিয়ে গেলাম। এবার দরজার ফাঁক দিয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ভেতরের পরিস্থিতিটা সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হয়ে নেবার চেষ্টা করলাম।
না, যা ভেবেছিলাম তা নয়। দেখলাম, সবাই বেশ সজাগই আছে। একজন মাত্র গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সে বন্দুকটাকে পাশে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে।
আর বাকি সবাই মেঝেতে বসে কথাবার্তায় মগ্ন। হাবভাব দেখে মনে হলো তারা কেউ-ই মদ গিলে পাড় মাতাল হয়ে পড়েনি। সবাই হাতেই রয়েছে একটা করে চকচকে ঝকঝকে ছুরি। এমনকি দু-একজনের কোমরে পিস্তলও গোঁজা দেখলাম। আর বার্থের ওপরে বেশ কয়েকটি বন্দুকও সাজিয়ে রাখা হয়েছে।
আমি মুহূর্তের জন্য দাঁড়িয়ে পরিস্থিতিটা সম্বন্ধে আঁচ নিয়ে নেবার চেষ্টা করলাম। ইতিমধ্যে আমার সঙ্গি দুজন বুকে সাহস সঞ্চয় করে ভেতরে ঢুকে যেতে লাগল।
তারা ভেতরে ঢুকে যাওয়ার পর ডার্ক পিটার্স দরজাটাকে বন্ধ করে আগের মতোই পরিবেশ তৈরি করেনিল।
মেট তাদের সঙ্গে সহৃদয় ব্যবহারই করল।
মেট মুখে হাসির প্রলেপ এঁকে আন্তরিকতার সঙ্গে অগাস্টাসকে বলল–শোন, ইদানিং তুমি ভালো ব্যবহার করছ লক্ষ্য করে তোমাকে এখন থেকে এ কেবিনে নামার অনুমতি দিচ্ছি। আর ভবিষ্যতে আমাদের দলেও তোমাকে টেনে নিতে পারি।
আমি তার সব কথা পরিষ্কার শুনতে পেলাম।
পাম্পের একটা হাতল আমার হাতে মুঠো করে ধরে রাখা আছে। এটাকে হাত থেকে নামালাম না। বলা যায় না, যে কোনো মুহূর্তে ব্যবহার করতে হতে পারে।
পূর্ব পরিকল্পনামাফিক আমি তৈরি হয়েই অপেক্ষা করতে লাগলাম। ডার্ক পিটার্সের নির্দেশ পেলেই ক্রোধোন্মত্ত বাঘের মতো শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।
ইতিমধ্যেই ডার্ক পিটার্স বিদ্রোহের রক্তাক্ত কাণ্ডকারখানার দিকে আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দিল। আর নাবিকরাও হরেক রকম কুসংস্কারের কাহিনী উল্লেখ করে গল্প ফেঁদে বসল। আবার কখনও বা তাদের মধ্যে উত্তেজনার জোয়ার বইতে লাগল। মেটকেই সবচেয়ে উত্তেজিত হতে দেখা গেল।
নাবিকদের মধ্যে একজন হার্টম্যান রজার্সের বিকৃত দেহ, বিশেষ করে মুখটার প্রসঙ্গ পাড়ল।
তাদের কথার মাঝখানেই ডার্ক পিটার্স প্রস্তাব দিল–‘ওই বিদঘুঁটে লাশটাকে আর মিছে জাহাজে রেখে দিয়ে ফায়দা কি হতে পারে আমার মাথায় ঢুকছে না। তার চেয়ে ওটাকে সাগরে ফেলে দেওয়াই উচিত।
ডার্ক পিটার্সের প্রস্তাব শুনে নচ্ছার মেট শয়তানের মতো পিট পিট করে নাবিকদের দিকে তাকাতে লাগল। সে মুখে কিছু বলল না, ইঙ্গিতে বুঝিয় দিল, লাশটাকে সাগরের পানিতে ছুঁড়ে ফেলে দাও।
কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার তার ইঙ্গিতটাকে বাস্তবায়িত করতে কেউ উঠে যাওয়া তো দূরের ব্যাপার এমনকি সামান্যতম নড়াচড়াও করল না।
নাবিকদের নিরুৎসাহ ভাবটা দেখে আমি স্পষ্টই অনুমান করলাম, পুরো দলটাই মানসিক উত্তেজনার শিকার হয়ে পড়েছে। আর সে উত্তেজনা রীতিমত পঞ্চমে চড়ে গেছে। ঠিক সে মুহূর্তেই আমি ডার্ক পিটার্সের সংকেত পেয়ে আচমকা একেবারে তাদের দলের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম।
আমাকে দেখেই তারা ধরেই নিল অকস্মাৎ প্রেতাত্মার আবির্ভাব ঘটেছে।
ওরে ব্যস, চোখের সামনে ভুত! এ যে একেবারেই ভয়ঙ্কর, অপ্রত্যাশিত এক কাণ্ড।
আমার দিকে চোখ পড়তেই মেট অস্পষ্ট স্বরে আর্তনাদ করে তড়াক করে লাফিয়ে সোজাভাবে দাঁড়িয়ে পড়ল। কেবল বিকৃত স্বরে দু-তিনবার গোঙানো ছাড়া আর কিছুই বলতে পারল না। পর মুহূর্তেই বিকট স্বরে আর্তনাদ করে ডেকের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। ব্যস, একদম ঠাণ্ডা। তার প্রাণহীন দেহটা জাহাজের দোলায় বারবার ওদিক এদিক গড়াতে লাগল।
আর বাকি চারজন বজ্রাহতের মতো অপলক চোখে তাকিয়ে নিশ্চল-নিথর পাথরের মূর্তির মতো ঠায় বসেই রইল। এখন কারো মুখে টু-শব্দটিও নেই। কেবলমাত্র আতঙ্কের শিকার হয়ে যে মানুষ এমন পৌনে মরা হয়ে পড়তে পারে আমি ইতিপূর্বে আর কোনোদিন দেখিনি, শুনিও নি কারো মুখে।
এরই মধ্যে রিচার্ড পার্কার এবং জন হান্ট রুখে দাঁড়াবার চেষ্টা করল। কিন্তু ফল হলো বিপরীত। পিটার্সের পিস্তলের গুলিতে দুজনেই নির্মমভাবে প্রাণ দিল।
এবার আমি পাম্প মেশিনের হাতলটা দিয়ে উন্মাদের মতো পার্কারের মাথায় সজোরে আঘাত হানলাম।
আমার আগেই সুচতুর ও কৃতী বন্ধুবর অগাস্টাস একটা বন্দুক টেনে নিয়ে উইলসনের বুকে একটা তপ্ত গুলি গেঁথে দিল।
আর বাকি তিনজন বিদ্রোহী মদের ঝোঁকটুকু কোনোক্রমে কাটিয়ে প্রাণান্ত লড়াইয়ে মেতে গেল।
তুমুল লড়াই শুরু হয়ে গেল। সত্যি কথা বলতে কি অমিত শক্তিধর পিটার না থাকলে বিদ্রোহীদের জয় অবশ্যম্ভাবী ছিল।
যে তিনজন বিদ্রোহীর কথা বললাম তারা হচ্ছে এবসালাম হিক্স, গ্রালি আর জোন্স।
মুহূর্তের মধ্যেই প্রচণ্ড ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল। জোন্স আচমকা এক ধাক্কা দিয়ে আমার বন্ধু অগাস্টাসকে মেঝেতে ফেলে দিয়ে দ্রুততার সঙ্গে তার ডান বাহুতে ছুরির আচড় ও ঘা বসাতে লাগল। তাকে হয়তো খতমই করে দিত। আমরা টেরও পেতাম না।
কারণ ডার্ক পিটার্স আর আমি অন্য বিদ্রোহী শত্রুদের মোকাবিলায় ব্যস্ত। আমাদের অন্য হিতাকাঙ্খীটি যদি না থাকত তবে হয়তো আজ আর আমাদের মধ্যে অগাস্টাসকে পেতাম না। আমাদের এ হিতকরী বন্ধুটি আর কেউ নয় আমার প্রিয় কুকুর টাইগার।
