আমাদের মতলবটাকে বাস্তবায়িত করা সুবিধার্থে আমাদের সামনে একটা সুযোগ এসে গেল।
আমরা হার্টম্যান রজার্সের লাশটার কাছে গিয়ে রীতিমত চমকে উঠলাম। তারনিষ্প্রাণ দেহটা ইতিমধ্যে এমন কুৎসিত, বিকৃত হয়ে উঠেছে যা অতীতে আমি অন্তত কোনো মৃতদেহের মধ্যে দেখিনি।
হার্টম্যান রজার্সের মৃতদেহটার ওপর চোখ বুলিয়ে দেখলাম, তার পেটটা ফুলে ফেঁপে কোলের মতো বললে কমিয়েই বলা হবে–জয়ঢাকের মতো হয়ে গেছে। চকের মতো সাদা মুখটা শুকিয়ে কুঁচকে এই এতটুকু হয়ে গেছে। হাত দুটো কিন্তু ফুলে-ফেঁপে প্রায় পেটটার আকৃতিই ধারণ করেছে।
আমরা অনুসন্ধিৎসু নজরে তার মুখটাকে দেখতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম, চকের মতো সাদা মুখটার এখানে ওখানে লাল লাল ছোপ। এগুলোই তার মুখটাকে আরও বেশি করে কদাকার করে তুলেছে। এমন বিকৃতদেহ ও মুখমণ্ডলধারী হার্টম্যান রজার্সকে যখন কেবিন থেকে বের করে সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার জন্য ডেকের ওপর নিয়ে আসা হয় ঠিক সে মুহূর্তেই তাকে দেখামাত্র নিজের কৃত অপরাধের অনুতাপ জ্বালায় জর্জরিত হয়েই হোক বা মৃতদেহটার ভয়ঙ্কর পরিণতি দেখে ভীত সন্ত্রস্ত হয়েই হোক মেট সঙ্গে সঙ্গে তার দলের লোকদের হুকুম দিল–লাশটাকে একটা বস্তার মধ্যে ভরে সামুদ্রিক সমাধির প্রথানুযায়ী অনুষ্ঠানাদির মাধ্যমে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা হোক।
হুকুম বাক্য উচ্চারণ করেই মেট লম্বা লম্বা পায়ে সেখানে থেকে কেটে পড়ল। হয়তো বা ভয়ঙ্কর সে দৃশ্যটা তার চোখ দুটো বেশি সময় বরদাস্ত করতে না পারার জন্যই নিতান্ত অনন্যোপায় হয়ে এ পথ বেছে নিয়েছে।
মেটের নির্দেশ অনুযায়ী লাশটার শেষকৃত্য সম্পন্ন করার জন্য যখন তোড়জোড় চলছে ঠিক সে মুহূর্তেই বুক-কাঁপানো গর্জন করতে করতে ঘূর্ণিঝড় ছুটে এসে জাহাজটার ওপর যেন তীব্র আক্রোশে আছাড় খেয়ে পড়ল। ঠিক তখনই ঘূর্ণিঝড়ের কবল থেকে জাহাজটাকে রক্ষা করার জন্য মেট গলা ছেড়ে সবাইকে ডাকাডাকি শুরু করে দিল; দড়িদড়া আলগা করে পাল নামানোর জন্য। এমন সংকটজনক মুহূর্তে পাল নামিয়ে নিতে না পারলে জাহাজের ধ্বংস অনিবার্য।
আমাদের প্রতিপক্ষের সবাই প্রলয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়ের কবল থেকে জাহাজটাকে রক্ষা করার কাজে মেতে গেল। আর এদিকে আমরা মওকাটাকে ব্যবহার করে উদ্দেশ্য সিদ্ধি। করার কাজে হাত দিলাম।
মুহূর্তমাত্রও সময় নষ্ট না করে ডার্ক পিটাস উদ্ধশ্বাসে ছুটতে ছুটতে ডেকের উপরে উঠে গেল।
তাকে দেখেই প্রহরারাত এ্যালেন তাকে ডাক দিল।
ডার্ক পিটার্স অন্যমনষ্কতার ভান করে কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল। আচমকা হাত দুটো বাড়িয়ে তার গলাটা শক্ত করে চেপে ধরল, সে মুখ খোলার আগেই ক্রোধোস্মত্ত সমুদ্রের বুকে ছুঁড়ে দিল। ব্যস সব শেষ।
ডার্ক পিটার্সের ডাকে আমি আর অগাস্টাস হন্তদন্ত হয়ে উপরে উঠে গেলাম। কিন্তু ভাগ্য মন্দ। পাম্প করে জাহাজের খোল থেকে পানি বের করে দেওয়ার দুটো পাম্পের। হাতল ছাড়া কোনো অস্ত্রশস্ত্রই পেলাম না।
উপায়ান্তর না দেখে আমরা দুজনে পাম্পের হাতল দুটোই হাতে তুলে নিলাম।
এবার অগাস্টাস আর আমি ব্যস্ত-হাতে মৃতদেহটার গা থেকে জামাটা খুলে নিলাম। অগাস্টাসকে ডেকে দাঁড় করিয়ে রেখে ডার্ক পিটার্স আর আমি যত দ্রুত সম্ভব সিঁড়ি-বেয়ে নিচে নেমে গেলাম। এ্যালেন যে জায়গায় প্রহরায় নিযুক্ত ছিল ঠিক সে জায়গায়ই অগাস্টাস দাঁড়িয়ে পড়ল। উদ্দেশ্য হঠাৎ কেউ এসে পড়লে ভাববে এ্যালেন বুঝি প্রহরায় নিযুক্ত।
আমার বন্ধু অগাস্টাস তো এ্যালেন ভূমিকায় অভিনয়ে নিজেকে লিপ্ত করল। আর আমি নিচে নেমেই নিজেকে আর্টান রজার্সের সাজে সাজিয়ে, ছদ্মবেশ ধারণ করতে ব্যস্ত হলাম। আমাকে দেখেই যাতে সবাই ভেবে নেয় সে-ই বুঝি দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার গা থেকে যে জামাটা খুলে নিয়েছিলাম সেটাকে গায়ে চাপিয়ে নিলাম। এবার মৃতদেহটার ফুলে ফেঁপে ওঠা আকৃতিটাকে তুলে ধরার জন্য বিছানার চাদর জড়িয়ে পেটটাকে ঢাকের মতো করে তোলোম। তারপর পশমের সাদা মোজা হাতে গলিয়ে হাত দুটোকেও যথেষ্ট ফুলিয়ে নিতে অসুবিধা হচ্ছে না। সব শেষে মুখটাকে ফ্যাকাসে বিবর্ণ করে নেওয়ার কাজে ডার্ক পিটার্স রঙ-তুলির টান দিয়ে আমাকে সাহায্য করে। তারপর নিজের একটা আঙুল কেটে সে রক্ত দিয়ে সাদা রঙের ওপর লাল লাল ছোপ এঁকে দিল। অন্য যে কেউ তো অবশ্যই, এমনকি আমি নিজের যদি নিজের মুখটা দেখতাম তবে আতঙ্কে শিউরে না উঠে উপায় ছিল না। আমাকে দেখে কে বলবে যে, আমিই হার্টম্যান রজার্স নই?
.
০৮. ॥ অষ্টম অধ্যায় ॥
আমি নিজেকে হার্টম্যান রজার্সের ছদ্মবেশ ধারণ করার পর কেমন মা নিয়েছে তা পরখ করে দেখার জন্য কেবিনেরে দেওয়াল আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই বুকের ভেতরে আচমকা ধড়া করে উঠল।
না, অহেতুক আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নষ্ট করার মতো একটা মুহূর্তও আমার নেই। মাথার ওপর গুরুদায়িত্ব রয়েছে। অভিষ্টসিদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত এতটুকুও স্বস্তি নেই।
ডার্ক পিটার্স আর আমি গুটি গুটি ডেকে উঠে গেলাম। জাহাজের অন্যান্য সবাই তো ঝড়ের কবল থেকে জাহাজটাকে রক্ষা করতে প্রাণান্ত প্রয়াস চালাচ্ছে। ফলে আমাদের দিকে নজর দেওয়ার মতো সময় ও মন কারোরই নেই, থাকার কথাও নয়।
