প্রশান্ত মহাসাগর অভিযানে সম্বন্ধে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল সেটা এখনকার মতো বাতিল করা হবে। অবশ্য প্রশান্ত মহাসাগরের ব্যাপারে ডার্ক পিটাসই বেশি উৎসাহি ছিল। তবে পরিকল্পনাটাকে মাথা থেকে সে পুরোপুরি বাতিলও করে দিচ্ছে না। ভবিষ্যতে যদি কোনোদিন সুযোগ আসে তবে সেটাকে অবশ্যই বাস্তবায়িত করা হবে, এ সিদ্ধান্তও আলোচনার মাধ্যমে নেওয়া হল।
আমরা যখন গোপন বৈঠকে ব্যস্ত ঠিক তখনই তীব্র চিৎকার শোনা গেল ‘তাড়াতাড়ি। সবাই তাড়াতাড়ি পালের দড়িতে হাত লাগাও। সর্বশক্তি দিয়ে দড়িদড়া কষে ধর।
আমাদের পরিকল্পনা গ্রহণে ছেদ পড়ল। মুহূর্তের জন্য উত্তর্ণ হয়ে শুনেই ডার্ক পিটার্স আমার বন্ধুকে নিয়ে পড়ি কি মরি করে ওপরে উঠে গেল।
নাবিকরা গলা পর্যন্ত মদ গিলে একেবারে পাঁড় মাতাল বনে রয়েছে। কাঁপা কাঁপা পায়ে দাঁড়িয়ে এলোমোলা টানাটানি করে পালটাকে গুটিয়ে ফেলার আগেই প্রবল ঝড়ের তাণ্ডবে জাহাজটা আচমকা এক পাশে হেলে পড়ে আমাদের নাকানি চোবানি খাইয়ে দিল। সত্যি কথা বলতে কি মুহূর্ত আমাদের হাল একেবারে বেসামাল হয়ে পড়ল।
আমরা আকস্মিক পরিস্থিতিটা কোনোরকমে সামাল দিতে না দিতেই উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে তীব্র গর্জন করতে করতে প্রলয়ঙ্কর ঝড় ছুটে এসে আমাদের অসহায় জলযানটার ওপর আছড়ে পড়তে লাগল। বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়।
রাত যতই বাড়তে লাগল, ঝড় ততই রুদ্ররূপ ধারণ করতে লাগল। আর সে সঙ্গে সমুদ্রও রুদ্ররূপ ধারণ করল। রীতিমত খেপে গেল।
জাহাজের সবার মুখ শুকিয়ে একেবারে আমচুর হয়ে এলো। ফ্যাকাশে বিবর্ণ মুখে ডার্ক পিটার্স আমার বন্ধুটিকে নিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটতে ছুটতে গলুইয়ে হাজির হল।
ডার্ক পিটার্স আমাকে গলুইয়ের তলব করল। আমি আর নির্দেশে বন্ধু অগাস্টাসের সঙ্গে গলুইয়ে তার সামনে হাজির হলাম। এমন বিপদজনক পরিস্থিতিতেই সে আমাদের সঙ্গে গোপন আলোচনা শুরু করল।
ডার্ক পিটার্সের বক্তব্য সমর্থন না করে আমরা পারলাম না। আসলে তো জাহাজটার দখল নেওয়ার এর চেয়ে ভালো আর মিলবে না। তার বক্তব্যের পিছনে ‘যুক্তিও রয়েছে পুরোপুরি। অন্যান্য সবাই যখন নিশ্চিত ধ্বংসের কবল থেকে জাহাজটাকে রক্ষা করার জন্য শরীর ও মন উভয় দিক থেকে ব্যস্ত তখন আকস্মিক আঘাত হানলে তাদের পক্ষে যথাযথভাবে মোকাবিলা করা কিছুতেই সম্ভব হবে না। আসলে তো এরকম আশঙ্কাই কেউ করবে না।
তবে একটা ব্যাপার আমাদের সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলল। কি সে সমস্যা, তাই না? আমাদের উভয় দলের শক্তির ফারাকটুকুর কথা বলতে চাইছি। কেবিনে রয়েছে। তারা পাঁচজন, আর আমরা মাত্র তিনজন। পাঁচের বিরুদ্ধে তিন–বিস্তর ফারাক। অবাস্তব সিদ্ধান্ত বটে । আরও আছে–অস্ত্রশস্ত্র যা-কিছু সবই রয়েছে তাদের জিম্মায়। আর ডার্ক পিটার্সের লুকিয়ে রাখা দুটোমাত্র পিস্তল আমাদের সম্বল। আর যা আছে তানিছকই পাজামার ফিতার সঙ্গে বেঁধে-রাখা নাবিকদের ছুরি। ব্যস, এটুকুই।
ডার্ক পিটার্স তবু আপন সিদ্ধান্তে অটল-অনড়। আর কাজ হাসিল করতে যা-কিছু করা দরকার, যতশীঘ্র সম্ভব সেরে ফেলতে হবে। তবে ঝুঁকি তো নিতেই হবে। ঝুঁকি ছাড়া বড় রকমের কোনো কাজ হাসিল করা যায় না।
জাহাজ দখলের পরিকল্পনাটাকে বাস্তবায়িত করার কাজে হাত দিয়েই ডার্ক পিটার্স বলল–‘চল, আমরা সবাই সোজা ডেকের ওপরে চলে যাই।’
অগাস্টাস বলল–‘কিন্তু সেখানে এ্যালেন প্রহরায় নিযুক্ত।
‘হোক গে।’ আমি গিয়ে তার সঙ্গে গল্প জমাব। তারপর মওকা বুঝে তাকে সজোরে এক ধাক্কা দিয়ে উত্তাল সমুদ্রের বুকে ফেলে দেব।
‘তারপর? তখন আমার আর আমার বন্ধুটির কাজ কী হবে? অগাস্টাস আগ্রহান্বিত হয়ে বলল।
‘তোমরা দুজন সুযোগ বুঝে সোজা ওপরে চলে যাবে। ব্যস্ত হাতে যা-কিছু অস্ত্রপাতি, হাতিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে নিয়ে সেখান থেকে কেটে পড়বে।
‘সে ও না হয় করা গেল। কিন্তু তারপর আমাদের করণীয় সম্বন্ধে কী ভেবেছ?
‘আমরা সশস্ত্র হয়ে তিনজনই ছুটে যাব। কেউ বাধা দেবার আগেই আমরা গলিপথটা আগলে দাঁড়িয়ে পড়ব। তবে সবই ঝটপট ও সতর্কতার সঙ্গে সেরে ফেলতে হবে, মনে থাকে যেন।
‘তোমরা প্রস্তাবটাকে আমরা উভয়েই সর্বাক্তকরণে গ্রহণ করলাম বটে। কিন্তু এমন একটা পরিকল্পনাকে কাজের রূপদান করা কি সহজ হবে, তুমি কী বল?’ সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্পূর্ণ সশস্ত্রদের বিরুদ্ধে প্রায় নিরস্ত্র তিনজনের লড়াই।
বন্ধু অগাস্টাসের মুখের কথাটা শেষ হবার আগেই আচমকা আমার মাথায় একটা মতলব উঁকি দিল। আশা করি স্মরণে আছে, জাহাজের প্রধান নাবিক হার্টম্যান রজার্সের সকালেই মৃত্যু হয়েছে। মেট-ই তাকে বিষ খাইয়ে খুন করেছে। ডার্ক পিটার্সের মনে এটাই দৃঢ় প্রত্যয় জন্মেছে। তার লাশটা এখনও ডেকের ওপর পড়ে রয়েছে। চেষ্টা চরিত্র করে কোনোক্রমে তার মধ্যে যদি আবার প্রাণের সঞ্চার ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় তবে কি মেটের অপরাধী বিবেকে ধাক্কা লাগবে না, কুসংস্কারাচ্ছন্ন মন সচকিত হয়ে উঠে সে নিজের প্রাণনাশে তৎপর উঠবে না। ভাবনাটা কি একেবারেই অমূলক, বাস্তবতায় পরিপূর্ণ হলেও অস্বাভাবিক কিছু না, ঠিক কিনা? আর এ কাজের মাধ্যমেই আমাদের চূড়ান্ত পরীক্ষা সম্পন্ন হবে। আর সে পরীক্ষা আমাদের দেওয়া চাই-ই চাই। কথায় তো আছেই, কর্মের মাধ্যমেই মানুষকে সাফল্য অর্জন করতে হয়।
