উল্লেখযোগ্য না হলেও একের পর এক ঘটনা-দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে এলো আটই জুলাইয়ের সকাল। পূব আকাশে সূর্য উঁকি দেওয়ার পর কিছুক্ষণের মধ্যেই পূব দিক থেকে মৃদুমন্দ বাতাস বয়ে আসতে লাগল।
মেট ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই জাহাজের মুখ দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ঘুরিয়ে দিল। পরের অবশ্য বোঝা গেল, পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে হাজির হওয়া। সে অঞ্চলের কোথাও জাহাজ নিয়ে গিয়ে লুঠপাটে মেতে যাওয়া; তার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেও নিগ্রো পাচক বা ডার্ক পিটার্স কেউ তাকে বাধা তো দিলই না এমনকি কোনো আপত্তিও করল না। আর তারা যদি কোনোরকম আপত্তি করেও থাকে তবে তা আমার বন্ধু অগাস্টাস অন্তত কিছু জানতে পারেনি। ঘটনা থেমে নেই, ঢিমে তালে হলেও গুটি গুটি এগিয়ে চলেছে।
আটই জুলাইয়ের রাত পেরিয়ে এলো নয়ই আগস্টের সকাল। পূব-আকাশ জুড়ে সূর্যের রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়েছে। মনোরম আবহাওয়ার মধ্য দিয়ে জাহাজটা দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে। কর্মীদের প্রায় সবাই জাহাজটাকে সারাই করার কাজে মেতে রয়েছে।
ডার্ক পিটার্স আবার আমার বন্ধু অগাস্টাসকে নিয়ে নিরালয় বসে জাহাজের পরিস্থিতি সম্বন্ধে দীর্ঘ আলোচনা করল। কথা প্রসঙ্গে নিজের মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে সে বলল–‘আমি কিছুতেই মেটের উদ্দেশ্যকে মেনে নিতে পারছি না, পারবও না কোনোদিন। আর একটু সুযোগ পেলেই তার হাত থেকে জাহাজটাকে ছি নিয়ে নেব, দেখে নিও।
অগাস্টাসনিষ্পলক চোখে তার দিকে তাকিয়ে কথাগুলো শুনতে লাগল।
ডার্ক পিটার্স এবার তাকে সরাসরিই জিজ্ঞাসা করল–‘তুমি মন খোলসা করে বল তো, যদি কোনোদিন তোমার সাহায্য-সহযোগিতা আমার দরকার হয়, তবে তুমি আমার পাশে দাঁড়াবে তো?
‘অবশ্যই। আমার সার্বিক সহযোগিতা তুমি অবশ্যই আশা করতে পার।’ ডার্ক পিটার্স তার কাছ থেকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পেয়ে খুশিমনে বিদায়নিল।
ডার্ক পিটার্স বিদায় নিয়ে চলে যাবার পর সারাদিন আর তার সঙ্গে অগাস্টাসের দেখা হয়নি। ডাক পিটার্স নতুন একটা কিছু করতে চলেছে জেনে তার মন-প্রাণ খুশিতে ভরপুর হয়ে উঠল।
.
০৭. ॥ সপ্তম অধ্যায় ॥
দশই জুলাইয়ের সকাল। ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই অগাস্টাস লক্ষ্য করছে। আবহাওয়া যেন হঠাৎ কেমন বদলে গেছে। আগের দিন যে মনোরম আবহাওয়া ছিল তা একরাতের মধ্যেই আমুল পরিবর্তন ঘটে বাতাস পূর্বদিকে থেকে বইছে আর তা খুবই উল্টাপাল্টা, কখন সে কেমন রূপ ধারণ করছে তা স্পষ্ট করে বোঝার উপায় নেই।
হার্টম্যান রোজার্স পরলোকে পাড়ি জমিয়েছে। মদই তার মৃত্যুর কারণ। আটই জুলাই ঠাণ্ডা মদ গলা পর্যন্ত খেয়েছে। ঠাণ্ডা মদ পেটে পড়তেই তার শরীর ক্রমে ঝিমিয়ে পড়তে থাকে। তারপরই শুরু হয়নিদারুণ অস্বস্তি অস্বাভাবিক কাঁপুনি আর খিচুনি। সে যে কী খিচুনি আর অবর্ণনীয় কষ্ট তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না।
সদ্য মৃত হার্টম্যান রোজার্সও ছিলনিগ্রো পাঁচকের দলের লোক।
হার্টম্যান রোজার্স-এর মৃত্যুর কারণ সম্বন্ধে বলতে গিয়ে ডার্ক পিটার্স অগাস্টার্সকে বলেছে মেট-ই তাকে গোপনে বিষ খাইয়ে হত্যা করেছে। সে এও বলেছে, চারদিক চোখ কান খোলা না রাখলে সে তাকেও যে কোনো সময় বিষ খাইয়ে মেরে ফেলতে পারে।
বর্তমানে সে নিজে, নিগ্রোপাচক, আর জোন্স, তার দলে রয়েছে–কেবলমাত্র এ তিনজন। আর বিপক্ষ দলে রয়েছে পাঁচজন।
বিকেলের দিকে জানা গেল নিগ্রো পাচকও তার দলে ভিড়ে গেছে। সে জোন্স। পিটার্সের সঙ্গে প্রথমে কথা কাটাকাটি তারপর তুমুল ঝগড়া করে সটকে পড়েছে।
সত্যি কথা বলতে কি, হাতে সময় খুবই কম। সময় নেই বললেই চলে।
ডার্ক পিটার্স কথা প্রসঙ্গে আমার বন্ধুর কাছে সরাসরি প্রস্তাব রাখল-শোন, তুমি যদি মনে-প্রাণে আমার পাশে দাঁড়াও সার্বিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দাও তবে আমি একবার চেষ্টা করে দেখতে চাই।’
বন্ধু অগাস্টাস স্লান হেসে বলল–‘চেষ্টা? কীসের চেষ্টার কথা বলছ? আমার দিক থেকে সাহায্যের এতটুকু ঘাটতি হবে না, প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।
‘জাহাজ দখলের চেষ্টার কথা বলছি। তোমার সাহায্য পেলে ঝুঁকিটা নেব ভাবছি।
বন্ধু আবারও তাকে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিল। আর মওকা বুঝে জাহাজে আমার উপস্থিতির কথাও তার কানে দিয়ে দিল।
জাহাজে আমার উপস্থিতির কথা শুনে ডার্ক পিটার্স ক্রোধান্বিত বা বিস্মিত হওয়ার চেয়ে অনেক অনেক বেশি খুশি হল। আসলে তার দলটা যে ভারী হলো এতে তো কোনো সন্দেহই নেই।
আমার উপস্থিতির কথা জানতে পারামাত্র ডার্ক পিটার্স লম্বা-লম্বা পায়ে সিঁড়ি-বেয়ে নিচে নেমে গেল।
জাহাজে আমার উপস্থিতির কথা জানতে পেরে ডার্ক পিটার্স অখুশি না হয়ে বরং খুশি হওয়ায় বন্ধু অগাস্টাস আমাকে তার কাছে নিয়ে গেল। আমার সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিল। সে উল্লসিত হয়ে আমার সঙ্গে করমর্দন করল।
দীর্ঘ সময় ধরে জাহাজের পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ কর্তব্য সম্বন্ধে আমাদের তিনজনের মধ্যে গোপন আলোচনা হল। শেষপর্যন্ত স্থির হলো, সংকট বুঝে আমরা জাহাজটার দখল নিয়ে নেব।
যদি কোনোদিন আমার জাহাজটার দখল নিতে পারি তবে হাতের কাছে যে বন্দরই পাই না কেন সেখানেই জাহাজ ভেড়াব। তারপর বন্দর-কর্তৃপক্ষের হাতে জাহাজটাকে তুলে দিয়ে কর্তব্য পালন করব।
