আমি উচ্ছ্বসিত আবেগের সঙ্গে বলে উঠলাম।–‘সুসংবাদ! সুসংবাদটা কি, জানতে পারি কী?
সে আবেগ-মধুর স্বরে বলল–‘অবশ্যই, অবশ্যই। ব্যাপারটা হচ্ছে, জাহাজের যে কোনো জায়গায়, যে কোনো সময় ঘোরাফেরা করার অনুমতি আমি পেয়েছি।
‘চমৎকার! চমৎকার!
‘আরও আছে, রাতে গলুইয়ের দিকে ঘুমাবার অনুমতিও আমাকে দেওয়া হয়েছে।
‘আরে বন্ধু, এ যে রীতিমত হাতে স্বর্গ পাওয়ার সামিল।
‘হ্যাঁ, ঠিক তাই।’
বন্ধু অগাস্টাস আমার জন্য ভালো ভালো রাতের খাবার আর পানীও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। জোর বন্দোবস্ত।
আমাদের নাবিকরা ডাউস অন্তরীপ থেকে আসা জাহাজটাকে তখনও হণ্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে। সমুদ্রের এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে এক সময় একটামাত্র পাশ চোখে পড়ল। ব্যাস, এ পর্যন্তই।
তারপর আট-আটটা দিন উল্লেখযোগ্য কোনো ঘটনাই ঘটেনি। আর আমার এ ঘটনার বিবরণের সঙ্গে তার কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্কও নেই। তা সত্ত্বেও সেগুলোকে কেটে হেঁটে একেবারে বাদ না দিয়ে একটা দিনলিপির মতো করে লিখলাম।
সেটা ছিল জুলাই মাসের তিন তারিখ। সেদিন বিকেলে অগাস্টাস আমার সঙ্গে দেখা করতে এলো। সঙ্গে করে আমার জন্য তিনটি কম্বল নিয়ে এসেছে। সেগুলো আমার হাতে তুলে দিল।
আমার লুকিয়ে থাকার জায়গায় সেগুলো দিয়ে আরামদায়ক একটা বিছানা করে ফেললাম। একেবারে তোফা বন্দোবস্ত।
আমার বন্ধুবর অগাস্টাস ছাড়া সারাদিনের মধ্যে কেউ-ই ভুলে নিচে আসে না। বাঘা বার্থেই থাকে। সেখানেই ঘুমায়।
রাতে ভয়ঙ্কর ঝড় উঠল। যাকে বলে একেবারে প্রলয়ঙ্কর কাণ্ড। তবে ভাগ্যগুণে বড় পালটা ছিঁড়ে ফেটে কয়েক টুকরো হওয়া ছাড়া জাহাজের আর কোনো অনিষ্ট হলো না।
আর এদিকে বন্ধু অগাস্টাসের প্রতি ডার্ক পিটার্স ক্রমেই সদয় হয়ে উঠছে। তার আচরণ উত্তরোত্তর ভালো হতে চলেছে। সময় সুযোগ পেলেই তাকে মুখোমুখি বসিয়ে সে তার সমুদ্রযাত্রার গল্প–প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে যে সব দ্বীপে সে গেছে সে সব গল্প রসিয়ে রসিয়ে গল্পাকারে শোনায়।
আবার কখনও বা ডার্ক পিটার্স গল্প থামিয়ে তাকে বলে–‘কি হে, দ্বীপগুলোর কথা শুনে চোখে দেখার জন্য মন চঞ্চল হয়ে উঠছে না? তুমি কি আমাদের সঙ্গে সে সব অঞ্চলে অভিযানে যেতে আগ্রহী।
আমার বন্ধুটি মুচকি হেসে নীরবে সম্মতি জানায়।
ডার্ক পিটার্স তাকে আরও জানায় দলের লোকজন ক্রমে মেটের দলের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। আর এরই ফলে তার পাল্লাই নাকি দিন দিন ভারী হচ্ছে।
জুলাইয়ের চার তারিখ। যে জাহাজটার একটামাত্র পাল নজরে পড়েছিল সেটা লিভারপুল বন্দর থেকে ছেড়ে আসছে। জাহাজটাকে চিনতে পেরে বিনা আক্রমণেই সেটাকে রেহাই দিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অগাস্টাস এখন দিনের একটা বড় অংশই ডেকের ওপর থাকে। তার উদ্দেশ্য খবরাখবর সংগ্রহ করা। বিদ্রোহীরা প্রায়ই নিজেদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা, কলহে লিপ্ত হয়।
বিদ্রোহীরা নিজেদের মধ্যে মতবিরোধের ফলস্বরূপ জিন বোনার নামে এক হারপুন নিক্ষেপকারীকে তো মারধোর করতে করতে জাহাজ থেকে ঠেলে ধাক্কা মেরে সমুদ্রে ফেলে দিয়েছে। বেচারা ছিল নিগ্রো। পাঁচকের দলের লোক। ডার্ক পিটার্সও তাদেরই দলের। একের পর এক এমন ছোটখাট ঘটনা ঘটেই চলল।
পাঁচই জুলাইয়ের সকাল। ভোরের আলো ভালো করে ফুটতে না ফুটতেই পশ্চিম দিকের সমুদ্রের বুক থেকে দমকা বাতাস উঠে এলো। সেটা ক্রমেই প্রবল থেকে প্রবলতর হতে হতে দুপুরের দিকে প্রলয়ঙ্কর ঝড়ের রূপনিল।
নিগ্রো পাঁচকের দলের সিমস নামক আর এক নাবিক সামনের দিককার বড় পালটার দড়িদড়া খুলে নামিয়ে আনার সময় মদের ঝোঁকে নিজেকে সামলাতে না পেরে আচমকা সমুদ্রে পড়ে গেল। ব্যস, চোখের পলকে একেবারে বেপাত্তা হয়ে গেল। সত্যি কথা বলতে কি, তাকে উদ্ধার করার কোনো চেষ্টাই হলো না।
এখন জাহাজের মোট লোকের সংখ্যা দাঁড়াল তের জন। তারা হচ্ছেনিগ্রো পাচক, সেমুর, ডার্ক পিটার্স, রোজার্স, জোন্স, হার্টম্যান, গ্রীলি আর উইলিয়াম এ্যালেন– এরানিগ্রো পাঁচকের দলভুক্ত; আর প্রথম মেটটার নামটা কিছুতেই আমার পক্ষে জানা সম্ভব হয়নি, রিচার্ড পার্কার, এবং সালস্ হিকস, জন হান্ট এবং উইলসন–এরা সবাই প্রথম মেটের অধীনস্থ –আর আছি আমি ও বন্ধুবর অগাস্টাস। এভাবেই দুটো দল পৃথক পৃথক দলভুক্ত হয়ে একই জাহাজের যাত্রী হয়ে সমুদ্রে পাড়ি দিয়ে চলেছে।
দেখতে দেখতে এসে গেল সাতই জুলাই। সমুদ্র দিনভর রুদ্ররূপ ধারণ করেই রইল। যাকে বলে রীতিমত উত্তাল-উদ্দাম সমুদ্র। জাহাজের অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে দাঁড়াল। মোচার খোলার মতো জাহাজটা অনবরত দোল খাচ্ছে। তোলপাড় হচ্ছে। টালমাটাল অবস্থায় পড়ে ওপরে-নিচের জিনিসপত্রে দুমদাম আছড়ে পড়ছে, ভেঙেচুরে টুকরো টুকরো হচ্ছে।
আমার দশা একেবারে বেহাল হয়ে পড়েছে। সামুদ্রিক পীড়ায় আমি একেবারে কাহিল হয়ে পড়লাম। ঘন ঘন বমিতে আমার প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে পড়ার উপক্রম হল।
এদিকে ডার্ক পিটার্সের সঙ্গে আমার বন্ধুবর অগাস্টাসের দীর্ঘ আলোচনা হল। ডার্ক পিটার্সের কথার মাধ্যমে সে জানতে পারল, এলোন আর গ্রালি তার দল ছেড়ে। মেটের দলে ভিড়েছে। ব্যাপারটা তাকে ভাবিয়ে তুলেছে। আর অগাস্টাসকে সে এও বলল; মেট আর তার দলের সবাই জলদস্যুবৃত্তি গ্রহণ করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সমুদ্রগামী জাহাজ আক্রমণ করে লুঠপাটে মেতে ওঠার জন্য তারা আদাজল খেয়ে লেগেছে।
