সত্যি কথা বলতে কি, তার কথা শুনে আমার মনেও আশার সঞ্চার হল। আমি ভাবতে উৎসাহি হলাম, আমরাও হয়তো ডার্ক পিটার্সের সার্বিক-সহযোগিতায় আবার এ-জাহাজটার দখল ফিরে পাব।
আমার এ আশার কথা সুযোগ বুঝে আমার বন্ধু অগাস্টাসের কাছেও না বলে পারলাম না।
আমার মুখ থেকে আশার কথা শুনে সে-ও সমর্থন করল। সে আশান্বিত হয়ে বলল–তোমার সঙ্গে আমি একমত। আমারও বিশ্বাস, ডার্ক পিটার্সের সহায়তায় আমরা আজ না হোক কাল জাহাজের দখল ফিরে পাব।
আমার চোখমুখে হাসির ঝিলিক ফুটে উঠল।
অগাস্টাস এবার বলল–একটা বিষয়ে আমাদের যথেষ্ট গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে আমাদের খুবই সাবধানে, আগে পিছু চিন্তা করে অগ্রসর হতে হবে।
‘হ্যাঁ, সে তো নিশ্চয়ই। তাড়াহুড়ো করতে গেলে সবকিছু বরবাদ হয়ে যাবে।
‘আরও আছে।
‘কী? কীসের কথা বলছ?
‘আরে একটা কথা তোমার মাথায় ঢুকছে না! সবার আগে ডার্ক পিটার্সের মতিগতি সম্বন্ধে নিশ্চিত ধারণা নিয়ে, তবে কাজে নামতে হবে। আসলে তার উদ্দেশ্যটাই তো আজ পর্যন্ত আমি তিলমাত্রও বুঝতে পারছি না। আর এ সঙ্কটজনক মুহূর্তে সে-ই তো আমাদের একমাত্র আশা ভরসা।
ঘণ্টা খানেক বাদে ডার্ক পিটার্স সে জায়গা ছেড়ে ওপরে উঠে গেল। দুপুরের দিকে একটা বেশ বড়সড় পোঁটলা নিয়ে আমাদের কাছে এলো। তাতে মাংস আর পুডিং রয়েছে। পোটলাটা আমার সামনে রেখেই সে আগের মতোই নীরবে ওপরে উঠে গেল।
বন্ধু অগাস্টাস আর আমি বহুদিন বাদে মুখোমুখি বসে পেট ভরে খেলাম।
খাওয়ার পাট মিটে গেলে আমি আবার বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে ওপরে উঠে গেলাম।
সারাদিন আর কেউ আসা তো দূরের ব্যাপার এমনকি কারো পায়ের শব্দও কানে এলো না। তাই আমি কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে আবার অগাস্টাসের ঘরে গুটিগুটি হাজির হলাম। মৌজ করে দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে শরীর ও মনটাকে যথাসম্ভব চাঙা করে নিলাম।
পূব-আকাশে তখনও ভোরের আলো ভালোভাবে ফুটতে পারেনি। একটু আগেই আমার ঘুম ভেঙে গেছে। আধো ঘুম আধো জাগরণের মধ্যে দিয়ে বিছানা আঁকড়ে পড়ে রয়েছি। হঠাৎ একটা চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুনে অগাস্টাস সজোরে একটা হেঁচকা টান দিয়ে একেবারে বসিয়ে দিল।
সে ওই হৈ হট্টগোলের দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। আমরা উভয়েই উকৰ্ণ হয়ে অবাঞ্ছিত আওয়াজটার উৎস ও কারণ সম্বন্ধে ধারণা করে নেওয়ার চেষ্টা করলাম। মোটামুটি অনুমান করলাম, ডেক থেকেই আওয়াজটা ভেসে আসছে।
আমি আর মুহূর্তমাত্রও দেরি না করে তার কামরা থেকে বেরিয়ে আমার আশ্রয়স্থল অন্ধকার গর্তটায় গিয়ে আশ্রয় নিলাম। এ পরিস্থিতিতে গা-ঢাকা দিয়ে থাকাই বাঁচার একমাত্র উপায়, আমার ভালোই জানা আছে।
লক্ষ্য করলাম, টাইগার ইতিমধ্যেই বেশ চাঙা হয়ে উঠেছে। জলাতঙ্কের কোনো লক্ষণই তার মধ্যে নজরে পড়ল না।
আমি তার জলাতঙ্ক রোগ সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হবার জন্য তার সামনে পানি-ভর্তি একটা পাত্র এগিয়ে দিলাম। আতঙ্কে সরে যাওয়া বা কোনোরকম অনীহাই তার আচরণে প্রকাশ পেল না। বরং সে আগ্রহের সঙ্গে এগিয়ে গিয়ে জিভ দিয়ে চেটে চেটে, চপ চপ আওয়াজ করে সবটুকু পানি সাবাড় করে দিল।
ভাগ্য ভালো যে, সময়মত বাঘাকে অন্ধকার খুপড়িটা থেকে বের করে এনেছিলাম। আর মাত্র দু-একদিন সেখানে থাকলে সে হয়তো পরপারেই পাড়ি জমাত।
ত্রিশে জুনের ঘটনাটা এখানে তুলে ধরলাম। ন্যান্টাকেট বন্দর থেকে জাহাজটা ছেড়ে আসার পর আজ ত্রিশতম দিন চলছে। আগামীকাল জুলাই মাস পড়বে।
জুলাইয়ের এক তারিখে বলার মতো তেমন কোনো ঘটনা ঘটল না।
জুলাইয়ের দুই তারিখের সকাল হল। বেলা একটু বাড়তেই প্রথম মেট আবার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। সকালেই গলা পর্যন্ত মদ চাপিয়েছে। মদের ঘোরে একেবারে কুঁদ হয়ে যাবার জোগাড়। মদের নেশায় তার মেজাজ রীতিমত শরীফ।
প্রথম মেট কাটা-মারা বুটে গুরুগম্ভীর আওয়াজ তুলে আমার বন্ধুর ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকেই মুখে খুশির ছাপ ফুটিয়ে তুলে বলল।
‘একটা কথা তোমার মুখ থেকে আমি শুনতে চাই।’
কপালের চামড়ায় বিস্ময়ের ছাপ একে বন্ধুটি হাসিখুশি মেজাজের প্রথম মেটের দিকে তাকাল। প্রথম মেট মুখে হাসির প্রলেপটুকু অক্ষুণ্ণ রেখেই বলল–‘শোনো, তুমি যদি আমাকে কথা দাও যে, এবার থেকে ভালোভাবে চলবে তবে তোমার জন্য আমি কিছু ভাবনা-চিন্তা করব, ভাবছি।’
আমার বন্ধু অগাস্টাস মুখ খোলার আগেই সে এবার সস্নেহে একটা মৃদু চাপড় দিয়ে বলল ‘আমি বলতে চাইছি, তোমাকে কথা দিতে হবে ভবিষ্যতে আর কোনোদিনই কেবিনে পা দেবে না, রাজি?’
বন্ধু ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে, নীরবে ঘাড় কাৎ করে তার বক্তব্যে সম্মতি জানাল।
হতচ্ছাড়াটা সন্তুষ্ট হয়ে তার পায়ের বাঁধন আর হাত থেকে হাত কড়া খুলে দিয়ে আমার বন্ধুকে মুক্ত করে দিল। তার দিলদরিয়া ভাব দেখলে মনে হয় আমার বন্ধুর ওপর খুবই প্রীত। আরও আছে, জ্যাকেটের পকেট থেকে রামের বোতল বের করে। তার হাতে গুঁজে দিয়ে বলল–‘গলাটা একটু ভিজিয়ে চাঙা করে নাও।
একটু বাদে তারা দুজনেই সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। ধীর পায়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে গেল। তিন ঘণ্টা পর আবার সেখানে ফিরে এলো।
ফিরে এসে অগাস্টাস আমাকে বলল–একটা দারুণ সুসংবাদ আছে বন্ধু।
