ব্যাপারটা তাকে যারপরনাই পীড়িত ও মর্মাহত করল। সে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হল–নির্ঘাৎ আমার ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে গেছে। ক্ষিদে তৃষ্ণায় কাহিল হয়ে আমি তিলে তিলে মৃত্যুর শিকার হয়েছি। অসহায় শিশুর মতো সে চাপাস্বরে কাঁদতে লাগল।
সে যখন আমার মৃত্যু সম্বন্ধে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নিয়ে আমার শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ার জোগাড় হয় ঠিক তখনই আমার বাঁকানো ছুরিটার ‘বিশ্রি আওয়াজটা তার কানে গেল।
ছুরির ফলার আওয়াজটা কানে যেতেই বন্ধু অগাস্টাস অতর্কিতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। উৎকর্ণ হয়ে শব্দটা এবং তার উৎসস্থলটা সম্বন্ধে ধারণা নেওয়ার চেষ্টা করল। সে নিঃসন্দেহ হল, অদ্ভুত আওয়াজটা আমরা কুঠরিটা থেকেই বেরোচ্ছে।
অগাস্টাস এবার মাত্রাতিরিক্ত উচ্ছ্বাস ও আবেগের জন্য বিপদের কথা ভুলে গিয়ে আমার নাম ধরে গলা ছেড়ে ডাকতে লাগল।
আমার জড়তা ইতিমধ্যে অনেকখানি কেটে গেছে। আমি তার কথার জবাব দিয়ে তার নাম ধরে ডাকতে শুরু করলাম।
আমার মৃত্যু হয়নি, ইহলোকেই আছি বুঝতে পেরে অফুরন্ত উৎসাহ এবং আসুরিক শক্তি প্রয়োগ করে যাবতীয় বাধা এক নিশ্বাসে দূর করে আমার কুঠরিটায় ঢুকে এলো। সে যখন আমার মুখোমুখি দাঁড়াল তখন সে রীতিমত ফোঁস ফোঁস শব্দ করে হাঁফাচ্ছে।
.
০৬. ॥ ষষ্ঠ অধ্যায় ॥
অগাস্টাস আমার শিয়রে দাঁড়িয়ে হাঁফাতে লাগল। মিনিট খানেক বিশ্রাম নেওয়ার পর সে কিছুটা প্রকৃতিস্থ হল।
অগাস্টাস স্বাভাবিকতা ফিরে পেয়ে আমার সঙ্গে পরিস্থিতিটার মোকাবিলা করার জন্য আলোচনায় লিপ্ত হল। দীর্ঘ আলোচনার পর আমরা উভয়েই স্থির করলাম, যে করেই হোক এ নরককুন্ড, অন্ধকার কুঠরিটা থেকে বেরোতেই হবে। এভাবে নরকযন্ত্রণা ভোগ করা আর সম্ভব নয়। আর এও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম, এখান থেকে বেরিয়ে আমি কোনো গোপন স্থানে লুকিয়ে থাকব।
আমাকে লুকিয়ে রেখে অগাস্টাস পালিয়ে যাবার পথ খুঁজে বের করার ধান্দায় থাকবে। সে হন্যে হয়ে খোঁজাখুঁজি করে পালাবার ফিকির একটা করতে পারবেই।
আর এও আলোচনা হল, আমাদের পালাবার পথ বের করা সম্ভব হলেও সমস্যা দেখা দেবে আমার প্রিয় কুকুর টাইগারকে নিয়ে। তার কি ব্যবস্থা করা হবে। অন্ধকার কুঠরিটার মধ্যে তাকে নির্মমভাবে ফেলে রেখে নিজেরা হাসিমুখে বাঁচব এ তো কিছুতেই সম্ভব নয়। আবার তাকে সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া তো সামান্য ব্যাপার?
তবে উপায়? টাইগারের ব্যবস্থা কী করব? ঘাড় ঘুরিয়ে আমি বাঘার দিকে তাকালাম। দেখলাম, সে পা চারটি ছড়িয়ে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। নেশাখোরের মতো তার অবস্থা। তবে প্রাণে বেঁচে রয়েছে, সন্দেহ নেই।
যা করার যত শীঘ্র সম্ভব সেরে ফেলতে হবে। হাতে সময় খুবই কম। অগাস্টাস আমার সঙ্গে পরামর্শ না করেই ঘুমন্ত বাঘাকে পাজাকোলে করে দড়িদড়া আর লোহালক্করের স্তূপের ওপর দিয়ে সন্তর্পণে হাঁটতে লাগল। কেউ টের পেলে কেলেঙ্কারির চূড়ান্ত হয়ে যাবে।
অগাস্টাস বলেই কাজটা সম্ভব হচ্ছে। টাইগারকে কোলে নিয়ে দুর্বল শরীরে মালপত্রের পাহাড় ডিঙিয়ে নির্বিঘ্নে পথ পাড়ি দেওয়া কিছুতেই সম্ভব হত না।
বার কয়েক হোঁচট খেয়ে অগাস্টাসকে নীরবে অনুসরণ করে করে কোনোরকমে তার থাকার জায়গাটির ঠিক নিচে পৌঁছে যেতে পারলাম।
অগাস্টাস আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল–শোন, সামনের ওই অন্ধকার গর্তটার মধ্যে তোমাকে গুটিসুটি মেরে বসে থাকতে হবে, টু-শব্দটাও করা চলবে না, মনে থাকবে তো
আমি নীরবে ঘাড় কাৎ করে তার নির্দেশ পালন করার সম্মতি দিলাম।
এবার তার নিজের হাতে কাঠ কেটে কেটে তৈরি করা গর্তটার দিকে অঙুলি নির্দেশ করে বলল–আর শোন, সময়মত তোমার প্রয়োজনীয় খাবারদাবার ও পানীয় ওই গর্তটা দিয়ে নিয়মিত আমি যোগান দেব, ভেব না–
আমি ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বললাম–‘আমার আর ভাববার কি থাকতে পারে। আর আমি যখন ভেবে কিছুই করতে পারব না তখন মিছে নিজেকে কষ্ট দিয়ে লাভও তো কিছু নেই বন্ধু।
‘হ্যাঁ, তোমার যাবতীয় ভাবনা-চিন্তা আমার ওপর সঁপে দিয়ে নীরবে শুভক্ষণের প্রতীক্ষায় থাক। ব্যস, এটুকুই।
আমার বন্ধুটির বুদ্ধির তারিফ করতেই হয়। সে নিজের ঘরে ঢুকেই ঝটপট পায়ে দড়ির বাঁধন আর হাতে বেড়ি দুটো গলিয়েনিল।
ইতিমধ্যে বেলা অনেকই হয়ে গেছে। ফাঁক ফোকর দিয়ে অনেক আগে থেকেই ক্ষীণ আলো ঢুকতে শুরু করেছে।
আমাদের ভাগ্যের জোর আছে বটে। সময়মতই আমরা, অগাস্টাস আর আমি উভয়েই নিরাপদ আশ্রয়ে ঢুকে যেতে পেরেছি। কারণ, আমার বন্ধু তার কামরাটায় ঢুকে দড়ির বাঁধন আর হাতকড়া পরে নিতে না নিতেই প্রথম মেট ডার্ক পিটার্সনিগ্রো পাচককে সঙ্গে নিয়ে তার ঘরে ঢুকল।
চারজন মিলে দীর্ঘসময় ধরে বহু আলোচনা করল।
আমি নিচে থেকে উৎকর্ণ হয়ে তাদের কথাবার্তা লক্ষ্য করতে লাগলাম। তারা কেউই গলা নামিয়ে কথা বলেনি। ফলে প্রতিটা কথাই আমার কানে এলো। ডাউস অন্তরীপ থেকে যাত্রা করে আসছে, এমন একটা জাহাজের জন্য সবাই অপেক্ষা করছে।
মিনিট কয়েক পরেই প্রথম মেট এবংনিগ্রো পাচক অনুচ্চ কণ্ঠে কথা বলতে বলতে ওপরে উঠে এলো।
প্রথম মেট এতক্ষণ যে কাঠের বাক্সটার ওপরে বসেছিল সেখানে নিজে জায়গা থেকে উঠে এসে এবার বসল ডার্ক পিটার্স। তার নেশা ইতিমধ্যেই অনেকটা চটে গেছে, প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। সে বন্ধুর সঙ্গে চুটিয়ে গল্প জুড়ে দিয়েছে। সে কথা প্রসঙ্গে বলল, তার বাবাকে অবশ্যই কোনো-না-কোনো জাহাজের নাবিকরা দেখতে পেয়ে তুলে নিয়েছে। তার এমন আশা করার পিছনে কারণও আছে যথেষ্টই। তার বাবাকে সেদিন সমুদ্রের পানিতে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছিল সেদিনই সে সমুদ্রের বুকে পাঁচ পাঁচটা পাল দেখতে পেয়েছিল। এমন আরও বহু যুক্তির উল্লেখ করে সে তাকে প্রবোধ দিতে লাগল।
