অগাস্টাস ব্যস্ত হাতে আমার কুঠরির দরজাটা সামান্য ফাঁক করতেই বাঘার ছোঁক ছেকানি বেড়ে গেলে। সে দরজার ফাঁক দিয়ে নাকটা গলিয়ে দিয়ে বার কয়েক খুঁকেই অস্থির হয়ে পড়ল। মুখ দিয়ে প্রায় অবোধ্য কুৎ কুৎ আওয়াজ করতে লাগল। শুধু কি এই? সে উন্মাদের মতো দরজাটার গায়ে নখ দিয়ে আঁচড়াতে শুরু করল।
অগাস্টাসের মাথায় হঠাৎ একটা মতলব খেলে গেল। সে যদি বাঘার গায়ে কোনো চিঠি লিখে আমার কাছে পাঠায় তবে তা অনায়াসেই আমার হাতে পৌঁছতে পারে। অনেক ভেবে চিন্তে সে এ মতলবটাকেই আঁকড়ে ধরল। আর এতে সুবিধা হবে এ মুহূর্তে আমার সঙ্গে তার দেখা করার ঝুঁকি না নিলেও কাজ মিটে যাবে। এবার অগাস্টাসের সামনে নতুনতর একটা সমস্যা দেখা দিল। আমাকে চিঠি লিখতে হলে তো কাগজ-কলম দরকার। কোথায় মিলবে এসব অত্যাবশ্যক সামগ্রি? একটা সরু কাঠি দিয়ে না হয় কলমের কাজ মিটিয়ে নেওয়া হবে। জ্যাকেটের পকেট হাতড়ে একটা পুরনো চিঠি মিলে গেল। তার বিপরীত দিকটা ফাঁকা, লেখা যাবে, এবারের সমস্যা কালির ব্যবস্থা করা। এ সমস্যাটারও সমাধান করে ফেলল। ছুরি সুতীক্ষ্ণ ফলাটা দিয়ে বাঁ হাতের কিছুটা জায়গা চিড়ে ফেলল। রক্ত বেরিয়ে এলো।
চিঠি লেখার সমস্যা আর রইল না। আবছা অন্ধকারেই অগাস্টাস কোনোরকমে চিঠিটা লিখে ফেলল। সে এবার সাধ্যমত সংক্ষেপে জাহাজের পরিস্থিতিটার বর্ণনা দিতে গিয়ে আমাকে লিখল– ‘অতি সম্প্রতি জাহাজে একটা ভয়ঙ্কর বিদ্রোহ ঘটে গেল। বিদ্রোহীরা জাহাজের ক্যাপ্টেনকে উত্তাল-উদ্দাম সমুদ্রে ভাসিয়ে দিয়েছে। অনতিকালের মধ্যেই তোমার জন্য কিছু খাদ্য ও পানীয়ের ব্যবস্থা হতে পারে। খবরদার, তুমি নিজে থেকে কিছু করার চেষ্টা কোরো না। সব শেষে বিশেষ দ্রষ্টব্য হিসেবে লেখা হয়েছে–‘রক্তের অক্ষরে চিঠিটা লিখলাম, কাছাকাছি কোথাও তোমার ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকার ওপর তোমার বেঁচে থাকা নির্ভর করছে মনে রেখো।’
চিঠিটা নিয়ে বাঘা সোজা আমার কাছে চলে এলো। আর অগাস্টাস নিজে চলে গেল নিজের বার্থে। নিজের বার্থে ঢুকেই সে আগের মতোই পায়ে দড়ি বেঁধে আর হাতে হাতকড়া পরে চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর ভান করে শুয়ে পড়ল।
মিনিট খানেকের মধ্যেই ডার্ক পিটার্স মদের ঘোরে টলতে টলতে তার কাছে। হাজির হল। মদের ঝেকে সে তখন খুব মৌজে রয়েছে। সে আমার বন্ধু অগাস্টাসরে জন্য গোটা কয়েক সিদ্ধ আলু আর এক পাত্র পানি নিয়ে এসেছে।
সে হাতের পানির পাত্র আর আলু সিদ্ধর থলেটাকে মেঝের ওপর রেখে দিয়ে একটা বাক্সের ওপর আয়েশ করে বসে নিজে থেকেই জাহাজের পরিস্থিতি এবং প্রথম। মেটের ব্যাপার স্যাপার সম্বন্ধে অনেক কথাই বলল।
ডাক পিটার্সের মতিগতির আকস্মিক আমূল পরিবর্তন দেখে আমার বন্ধুটি রীতিমত ভড়কে গেল। ব্যাপারটা তো অবশ্যই অভাবনীয়।
শুধু কি এ-ই? পরদিন আমার বন্ধুর জন্য রাতের খাবার নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সে তখনকার মতো বিদায় নিল।
কালো গাট্টগোট্টানিগ্রো পাচকটা দিনের বেলায় দুজন হারপুননিক্ষেপকারীকে সঙ্গে করে আমার কাছে এলো। তিনজনই নেশায় একেবারে কুঁদ হয়ে রয়েছে। পা দুটো রীতিমতো টলছে। এমনকি কথা পর্যন্ত জড়িয়ে আসছে।
তাদের কথাবার্তা থেকে আমি যেটুকু হৃদয়ঙ্গম করতে পারলাম তা হচ্ছে, জাহাজের কর্মীরা পরিষ্কার দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। তাদের একটা দলের মাতব্বরনিগ্রো পাচক আর অন্য দলটাকে পরিচালনা করছেন প্রথম মেট।
প্রথম মেটের একান্ত ইচ্ছা, যে কোনো একটা জাহাজ দখল করে জলদস্যুদের মতো লুঠপাটে মেতে উঠবে, আরনিগ্রো পাচক ও তার দলের সবার একান্ত ইচ্ছা, তারা
যে কাজের জন্য যাত্রা করেছে অর্থাৎ দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে পৌঁছে তিমি শিকারেই। নিজেদের লিপ্ত করবে। আর তা যদি সম্ভব না-ই হয় তবে জায়গামত গিয়ে পরিস্থিতি
অনুযায়ী অন্য কোনো কাজে হাত দেবে। পিটার্স বহুবার এসব অঞ্চল দিয়ে যাতায়াত করেছে। তাই তার মুখে বহু রোমাঞ্চকর আনন্দ ফুর্তির অভিযানের কথা শুনে সবাই আনন্দে আপ্লুত হয়ে তার খাতায়ই নাম লিখিয়েছে।
নিগ্রো পাচক ও তার সহগামী নাবিক দুজন দীর্ঘসময় ধরে প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় বহু কথা নিয়ে দীর্ঘসময় ধরে বকবক করার পর এক সময় ধীরে ধীরে সেখান থেকে সরে পড়ল।
ক্রমে সারাটা দিন পেরিয়ে গেল। আমার বন্ধুর ঘরে বা তার দরজার ধারেকাছেও কেউই আসেনি।
অগাস্টাস সারাদিন, রাতে পর্যন্ত হতাশা-হাহাকারের মধ্যে শুয়ে বসে কাটিয়ে দিল।
রাতের অন্ধকার নেমে আসার বেশ কিছুক্ষণ পরে সে হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দু পকেট ভর্তি করে সিদ্ধ আলু আর পানির পাত্রটা নিয়ে তৈরি হয়ে পড়ল। আলোর ব্যবস্থা যা হোক কিছু করতেই হবে। কিন্তু উপায়? অদূরে একটা চর্বির বাতি দেখতে পেয়ে সে যেন হাতে স্বর্গ পেয়ে গেল। জ্যাকেটের পকেটে তো একটা ফসফরাসের দেশলাই আছেই, চিন্তা কি?
অগাস্টাস এবার চর্বির বাতিটাকে খুবই ক্ষীণ আলো দানের মতো পলতে বের করে দেশলাই দিয়ে সেটাকে ধরিয়ে যাত্রা করার জন্য তৈরি করেনিল।
আমার অন্ধকার খুপরিটার কাছে অগাস্টাস গুটিগুটি হাজির হল। সাধ্যমত গলা নামিয়ে সে আমার নাম ধরে বার-কয়েক ডাকাডাকি করল। তার কণ্ঠস্বর আমার কানে ঠিকই পৌঁছাল। কিন্তু সে মুহূর্তে শারীরিক ও মানসিক উভয় জড়তার জন্য শতচেষ্টা করেও তার ডাকের উত্তর কিছুতেই আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব হলো না।
