আমার বন্ধু অগাস্টাসের মুখ সঙ্গে সঙ্গে খড়ির মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেল। একটা কথাও তার গলা দিয়ে বের হলো না।
তাকে নীরব দেখে মেটের ক্রোধ একেবারে পঞ্চমে চড়ে গেল। তিনি অগাস্টাসকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে সমুদ্রে ফেলে দেবার চেষ্টা করতেই ক্যাপ্টেনের সহৃদয়তা তাকে সে যাত্রার মতো রক্ষা করে দিল। নিতান্ত ভাগ্যের জোর না থাকলে মেটের হিংস্র থাবা থেকে কারো পক্ষে জানে বেঁচে যাওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়।
যা-ই হোক আমার বন্ধু আবার ফাঁদে আটকে পড়ল। আবার তার হাত-পায়ে বেড়ি পরিয়ে দেওয়া হল। এবার তাকে ধরাধরি করে জাহাজের হালের কাছে নিয়ে গিয়ে সেটার কাছাকাছি একটা বার্থে শুইয়ে দেওয়া হল। তাকেনিগ্রো পাচকটা বলে দিল–জাহাজটা যখন আর জাহাজ থাকবে না ততদিন সে যেন ভুলেও ডেকে যাওয়ার চেষ্টা না করে।
আসলেনিগ্রোটা যে কি বলতে চাচ্ছে তা বোঝা এত সহজ নয়। কথাটাকে নিছকই একটা হেঁয়ালি ছাড়া কিছু ভাবা যায় না।
তবে এও খুবই সত্য যে, শেষপর্যন্ত এ ব্যবস্থাটাই আমার প্রাণ রক্ষার সবচেয়ে বড় সহায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অন্যথায় আমার বরাতে কি যে ছিল তা ভাবলে আজও আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। সে বিবরণ পরে সময়মত তুলে ধরা যাবে। এ মুহূর্তে তা বলার আবশ্যকও মনে করছি না।
ন্যারেটিভ আর্থার গর্ডন পাম – ০৫
০৫. ॥ পঞ্চম অধ্যায় ॥
কালো গাট্টাগোট্টা পাচকটা অগাস্টাসকে সতর্ক করে দিয়ে চলে যাবার পর তার মনটা খুব দুর্বল হয়ে পড়ল। আর এটা তো হবারই কথা। প্রথমবার ভাগ্যের জোরে তার প্রাণ রক্ষা পেলেও দ্বিতীয়বার বন্দি হবার পর আর বাঁচার আশা মন থেকে নিঃশেষে মুছে গেল।
ফলে বাধ্য হয়েই মনস্থির করে ফেলল, এবার যে বা যারাই নিচে, তার কাছাকাছি আসবে তাকেই সে কেঁদে কেটে আমার অসহায় অবস্থার কথা বলবে। অন্ধকার খাঁচাটির ভেতরে থেকে একটু একটু নির্মম-নিষ্ঠুর মৃত্যুর শিকার হওয়ার চেয়ে আর কিছু না হোক বিদ্রোহীদের সঙ্গে প্রাণে বেঁচে থাকার মতো একটা না বোঝাপড়ায় তো আমি আসতেই পারব। এতে আমার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার হাত পায়ের বেড়ি। নইলে যে করেই হোক উপায় একটা যে করতেই পারত এতে তিলমাত্র সন্দেহই নেই।
গোড়ার দিকে তার ধারণা হয়, লোহার বেড়ি খোলার চেষ্টা নিতান্তই পাগলের। খেয়াল। কিন্তু বার কয়েক মোচড়া মুচড়ি আর টানাটানি করার পর সে বুঝল, হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেবার মতো ব্যাপার মোটেই নয়। যদিও ব্যাপারটা খুবই কষ্টসাধ্য তবুও জোর কদমে চেষ্টা চালিয়ে হাতটা চাপাচাপি করে হাত কড়াটার ভেতর দিয়ে কোনোরকমে গলিয়ে নেওয়া সম্ভব হতেও পারে। অতএব কাজটা নিছকই অবাস্তব কল্পনা নয়।
অগাস্টাস এবার নিজের ভাবনাকে বাস্তবায়িত করার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাতে শুরু করল।
অগাস্টাস দাঁতে দাঁত চেপে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে কোনোরকমে ডান হাতটাকে হাতকড়াটা থেকে হাত বের করে ফেলল। এবার টানাটানি করে পায়ের বাঁধনটাকেও আলগা করেনিল।
হাত-পায়ের বাধন মুক্ত করতে না করতেই হঠাৎ কার যেন কণ্ঠস্বর কানে এলো। ব্যস, মুহূর্তমাত্র সময় নষ্ট না করে সে আবার ঝটপট হাতকড়াটা হাতে পরেনিল। আর দড়ি দিয়ে পা দুটোকেও বেঁধেনিল।
ডার্ক পিটার্স নিচে নেমে বাঘা নামধারী কুকুরটা তার সঙ্গেই রয়েছে।
বাঘার সঙ্গে আমার কি সম্পর্ক তা বন্ধু অগাস্টাসের তো আর অজানা নয়। এ জন্যই তো আমাকে অন্ধকার খুপরিটার মধ্যে আটকে রেখে সে সোজা আমাদের বাড়ি চলে যায়। বাঘাকে নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জাহাজে ফিরে আসে। বাঘাকে সবার চোখের আড়ালে লুকিয়ে রাখে।
ডার্ক পিটার্স বাঘাকে দেখতে পায়। সে তাড়াতাড়ি বাঘাকে নিয়ে আমার বন্ধুর কাছে পৌঁছে দিল।
পিটার্স বিদায় নিলে বন্ধু অগাস্টাস ব্যস্ততার সঙ্গে হাতের বেড়ি ও পায়ের বাঁধন খুলে ফেলে পকেট থেকে ছুরিটা বের করে তার তীক্ষ্ণতা পরীক্ষা করেনিল।
এবার সাধ্যমত নিঃশব্দে পাটাতনটা কাটতে মেতে গেল। সেটার নিচেই যে আমার অন্ধকার খাঁচাটা এ বিষয়ে সে সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ।
দিনভর আর কেউ আমার কুঠুরিতে ঢুকল না। অগাস্টাসও সারাদিন সরারাত এক নাগাড়ে কাজে লেগে থেকে পাটাতনের কাঠ কেটে আমার কাছে পৌঁছাবার কাজে মেতে রইল। কোনোক্রমে একটা ফাঁক বের করে ফেলল। এবার সেটা দিয়ে নিজেকে গলিয়ে দিয়ে নিচে নেমে এলো।
এখানে বলে রাখা দরকার, বিদ্রোহীরা ঘটনাগুলো ঘটাবার পর থেকে জাহাজের গলুইয়ের এদিকটায় রাতে কেউই ঘুমায় না। ক্যাপ্টেন বানার্ডের জন্য সঞ্চিত খাদ্য ও পানীয়ের সদ্ব্যবহার করে তারই কেবিনের ভেতরে ও বাইরে দরজার কাছে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রাত কাটায়।
অতএব এটা অগাস্টাস আর আমার পক্ষে হিতকরই হলো তা যদি না হত তবে এতগুলো লোকের নজর এড়িয়ে অগাস্টাসের পক্ষে কিছুতেই আমার কাছে আসা সম্ভব হত না।
যা-ই হোক, দড়ি, লোহালক্কড় ও অন্যান্য ভাঙাচারো যন্ত্রপাতির খাঁচা কোনোরকমে হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে ডিঙিয়ে বন্ধু অগাস্টাস আমার কাছে হাজির হতে পারল।
আমার অন্ধকার কুঠুরিটার দরজায় পৌঁছেই সে বুঝতে পারল, আমার প্রিয় বাঘা তাকে অনুসরণ করে এখানে পৌঁছে গেছে।
এদিকে ভোরের আলো ফুটতে চলেছে। চারদিক ফর্সা হবার আগেই তাকে এখান থেকে কেটে পড়তে হবে। চলে যেতে হবে তার নির্দিষ্ট জায়গায়। অতএব সে সিদ্ধান্ত নিয়েনিল কুঠুরি দরজাটা সামান্য ফাঁক করে আমার পরিস্থিতি সম্বন্ধে একটু আধটু ধারণা করে নিয়েই এখান থেকে দ্রুত চম্পট দেবে। আবার সুযোগ বুঝে রাতে আমার কাছে আসবে।
